দীপক শর্মা দীপু ::
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ইসিএ এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে সৈকতের বালিয়াড়িতে বিচরণ করা লাল কাঁকড়া, সামুদ্রিক কাছিম, শামুক ঝিনুকসহ উপকুলীয় বিভিন্ন প্রাণির উপর চালানো হচ্ছে গাড়ি। সমুদ্র সৈকতে গাড়ি চালানোর কারণে প্রতিদিন অসংখ্য কাঁকড়া বীচের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে, ডিম পাড়তে আসা কাছিম মরছে, কাছিমের সদ্য বাচ্চা সমুদ্রে ফিরতে গিয়ে মারা পড়ছে। গাড়ি চাপায় মারা যাচ্ছে শামুক ঝিনুকসহ বিভিন্ন প্রাণী। গাড়ি ড্রাইভ করার ফলে সৈকতের কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক, জলচরপাখিসহ বিভিন্ন প্রকার অমেরুদন্ডী প্রাণির আবাস্থল ও বিচরন স্থান ক্ষতিগস্থ হচ্ছে। কাঁকড়া বীচ রেজু খালের মোহনা পর্যন্ত সমুদ্র সৈকত এলাকা সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার স্থান। কিন্তু শব্দ দূষন, অমসৃন সৈকত ও রাত্রি বেলার আলোকছটার কারনে কাছিম ডিম পাড়তে বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। এতে করে সৈকতের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ- প্রতিবেশ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে ঝাউবাগানের ভিতরেও চলাচল করছে বিভিন্ন যানবাহন। এতে করে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ঝাউগাছ। ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছে বাগান।
সরেজমিনে জানা যায়, রামু উপজেলার পেঁচারদ্বীপ সৈকত ও হিমছড়ি পাড়ার ব্লক এলাকার কাঁকড়া বিচ সমুদ্র সৈকত এলাকায় অনুমোদনহীনভাবে বীচ বাইক, জীপ ও কার গাড়ি ড্রাইভ করা হয়। ফলে সৈকতের কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক, জলচরপাখিসহ বিভিন্ন প্রকার অমেরুদন্ডী প্রাণির প্রজনন, আবাসস্থল ও বিচরণ স্থান ক্ষতিগস্থ হচ্ছে। ঝাউ বনের ভিতর দিয়ে গাড়ি চালানোর কারনে বনের গাছপালা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাছাড়া উক্ত এলাকায় রাতে লাই্ট জ্বালানো ও গাড়ী চালানোর কারণে প্রতি বারের মত এখন পর্যন্ত কোন সামুদ্রিক কচ্ছপ ডিম পাড়তে আসেনি।
হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানের হিমছড়ি সহ-ব্যবস্থাপনা নির্বাহী কমিটির সদস্য সচিব রেঞ্জ কর্মকর্তা সমীর রঞ্জণ সাহা জানান, সৈকতে গাড়ি চালানো কাজে সম্পৃক্ত রয়েছেন পেঁচারদ্বীপ এলাকায় আদম তমিজী হক সহ হক কোাম্পানীর স্বত্তাধিকারী পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণ এবং হিমছড়ি পাড়ায় কক্সবাজার বীচ বাইক মালিক সমবায় সমিতি। উক্ত কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মৌখিকভাবে আইনের কথা জানিয়ে দেওয়ার পরও তারা যথারীতি গাড়ি চালাচ্ছে ও আইন অমান্য করে যাচ্ছেন। হিমছড়ি পাড়ার কাঁকড়া বীচ ও পেঁচার দ্বীপ সমুদ্র সৈকত এলাকায় বিচ বাইক, জীপ ও কার গাড়ি চলাচলের পাশাপাশি রাতে জ্বালানো হয় আগুন।
হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানের সহ-ব্যবস্থাপনা নির্বাহী কমিটির সভাপতি এড. আয়াছুর রহমান জানান, কক্সবাজারের রামু উপজেলায় খুনিয়াপালং ইউনিয়নের পেচারদ্বীপ ও হিমছড়ি পাড়ার কাঁকড়াবীচ এলাকা সামুদিক কাছিম, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক, জলচর পাখিসহ বিভিন্ন প্রকার অমেরুদন্ডী প্রাণির প্রজনন্, আবাস্থল ও বিচরণ স্থান। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত,২০১০) অনুযায়ী কক্সবাজার -টেকনাফ পেনিনস্যূলাকে ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া(ইসিএ) হিসেবে ঘোষনা করা হয়। উক্ত আইন অনুযায়ী এই এলাকায় সামুদ্রিক প্রাণির ক্ষতি হয় এমন কোন প্রকার কাজ করা (যানবাহন পরিবহন) নিষিদ্ধ। এছাড়া বাংলাদেশ বন্যপ্রাণি(সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী বন্যপ্রাণির আবাস্থল সংরক্ষণ জরুরী। পেঁচারদ্বীপ ও হিমছড়ি পাড়ার কাঁকড়া বীচ এলাকা পরিবেশ প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার জন্য দু্রত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এমন ঘটনার প্রেক্ষিতে সামুদিক কাছিম, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক, পাখিসহ বিভিন্ন প্রকার অমেরুদন্ডী প্রাণির প্রজনন, আবাসস্থল ও বিচরণ স্থান সংরক্ষণের লক্ষ্যে হিমছড়ি সমুদ্র সৈকতের সৈকতে বীচ বাইক ও গাড়ী চলাচল বন্ধ করার জন্য জেলা প্রশাসক, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করেছেন হিমছড়ি সহ ব্যবস্থাপনা কমিটি।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সারোয়ার আলম জানান, ঝাউবাগান ও সৈকতে কিছু যানবাহন চলাচলের খবর পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নেয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো: মুরাদ ইসলাম জানান, সমদ্র সৈকতের কলাতলী পয়েন্ট থেকে দরিয়ানগর পর্যন্ত বীচ বাইক চালানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া অন্য যে কোন সৈকত পয়েন্টে বীচ বাইকসহ যে কোন যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। সৈকতে অবৈধভাবে বীচ বাইক বা যে কোন যান চলাচলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। সৈকতের পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। ১২০ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধ স্থাপনা হয়েছে। সৈকতের উপর দিয়ে হ্যাচারির দুষিত বজর্য যাচ্ছে সমুদ্রে, বিভিন্ন হোটেলের বজ্য ফেলা হচ্ছে সৈকতে।