কখনো বিলাসবহুল প্রাইভেটকার, কখনো সুন্দরী নারী, কখনো পেটের ভেতর, কখনো শরীরের বিভিন্ন অংশে, আবার কখনো গাড়ির তেলের ট্যাংক, ইঞ্জিন কিংবা বিশেষভাবে তৈরি গোপন চেম্বারে লুকিয়ে ইয়াবা পাচার করা হচ্ছে।
মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে ইয়াবা পাচারের কৌশল। মাদক কারবারিদের এসব অভিনব পদ্ধতি শনাক্ত করতে গিয়ে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা প্রবেশের পর তা বিভিন্ন ধাপে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বিলাসবহুল গাড়ি, মোটরসাইকেল, আন্তঃজেলা বাস, মাইক্রোবাস এমনকি সাধারণ যাত্রীবাহী যানবাহনও।
সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযানে তেলের ট্যাংক, গাড়ির ইঞ্জিন, বাম্পার, সিটের নিচে তৈরি গোপন প্রকোষ্ঠ এবং বিভিন্ন কৌশলে লুকিয়ে রাখা ইয়াবার চালান উদ্ধার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উখিয়ার বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করেই দামি ও বিলাসবহুল গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব গাড়ির একটি অংশ ব্যবহার করছে একটি উদীয়মান তরুণ সিন্ডিকেট। দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা বা বৈধ আয়ের উৎস না থাকলেও রাতারাতি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে যাওয়া কিছু তরুণ সীমান্তভিত্তিক মাদক চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়ছে। তারা নিজেদের ব্যবসায়ী বা পর্যটক পরিচয়ে অবাধে চলাচল করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহ এড়ানোর চেষ্টা করে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে পাচারের অন্যতম ট্রানজিট হিসেবে। সীমান্তের ওপার থেকে আসা ইয়াবার চালান প্রথমে বিভিন্ন গোপন স্থানে মজুত করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে নারী, তরুণ কিংবা ভাড়াটে বাহকের মাধ্যমে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে নারী বাহক ব্যবহার, শরীরের ভেতরে ইয়াবা বহন, ব্যক্তিগত লাগেজ, শিশুদের ব্যবহার এবং গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশে বিশেষ কায়দায় ইয়াবা লুকিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানে উঠে এসেছে।
মাদকবিরোধী কার্যক্রম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচলিত তল্লাশির পাশাপাশি এখন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ছাড়া এই ধরনের পাচার প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যানবাহন স্ক্যানার, উন্নত গোয়েন্দা নজরদারি, সীমান্তে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংঘবদ্ধ চক্রের অর্থের উৎস শনাক্ত করা জরুরি।
এ বিষয়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, মাদক কারবারিরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। কখনো গাড়ির গোপন প্রকোষ্ঠ, কখনো নারী বা অন্যান্য বাহক ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে পুলিশও বসে নেই। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, চেকপোস্টে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে এবং তথ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যে কৌশলেই মাদক পাচারের চেষ্টা করা হোক না কেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কক্সবাজারকে মাদকমুক্ত করতে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কেবল বাহক বা ছোটখাটো কারবারিদের গ্রেপ্তার করলেই ইয়াবা পাচার বন্ধ হবে না। সীমান্তভিত্তিক মূল হোতা, অর্থের জোগানদাতা এবং সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বিত অভিযান জোরদার করলেই ইয়াবা পাচার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব