বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছিল। এর অংশ হিসেবে গত ১ মে থেকে সারা দেশে শুরু হয় বিশেষ অভিযান। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযানে গত ১ মে থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সাড়ে তিন মাসে সারা দেশে ৪৮ হাজার ৩৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৪ হাজার ৪২৩ জনই মাদক ও চোরাকারবারি, যা মোট গ্রেপ্তারের প্রায় ৭১ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া প্রতি ১০ জনের অন্তত ৭ জনই মাদক ও চোরাচালানে অভিযুক্ত।
তবে যারা ধরা পড়ছে তারা সবাই মাঠপর্যায়ের বাহক মাত্র। অধরাই থেকে যাচ্ছে তাদের হর্তাকর্তারা।
বিশেষ অভিযানের ইউনিটভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মাদক ও চোরাকারবারি গ্রেপ্তারের সংখ্যা অন্য সব অপরাধের শ্রেণিকে ছাড়িয়ে গেছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শ্রেণিতে রয়েছেন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী, পরিকল্পনাকারী ও সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া ৬ হাজার ৯৬১ জন। ছিনতাইকারী, দস্যু ও ডাকাত হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪ হাজার ৭৯৪ জন। চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী হিসেবে ১ হাজার ৩৬৪ এবং অবৈধ অস্ত্রধারী বা অস্ত্র-সংক্রান্ত অপরাধে ৮০৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। সব মিলিয়ে গ্রেপ্তার ৪৮ হাজার ৩৪৮ জন।
পুলিশ বলছে, মাদক ও চোরাকারবারিতে রেঞ্জ ও মহানগর মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার হয়েছেন ঢাকা রেঞ্জ ও ঢাকা মহানগর এলাকায়। ঢাকা রেঞ্জে সাড়ে তিন মাসে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৭ হাজার ২০০ জন। আর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) গ্রেপ্তার করেছে ৪ হাজার ৫৩৯ জন। সব চেয়ে কম বরিশাল রেঞ্জে, ১ হাজার ২৬৩ ও সিলেট মেট্রোপলিটনে গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৪৪ জন।
বিশেষ অভিযানে প্রায় ১ কোটি ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৮৯টি ইয়াবা, ১৫ হাজার ২৩৭ দশমিক ৬৬ গ্রাম হেরোইন, ২৭ হাজার ৯৮২ বোতল ফেনসিডিল এবং ১২ হাজার ২৬৭ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া অভিযানে ৩৯ হাজার ৫৯ লিটার দেশি মদ এবং ১৬ হাজার ৬৭২ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মাদকাসক্তি সমাজের প্রায় সব স্তরেই প্রভাব ফেলছে।
তবে ১৬-৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক প্রতিবেদনে।
এদিকে স্থলপথের পাশাপাশি সমুদ্রপথ, নদীপথে দেদার আসছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা, আইস, ট্যাপেন্টাডল, কোকেনের মতো ভয়াবহ সব মাদক। এ ছাড়া আকাশপথ ব্যবহার করেও মাদক পরিবহন করা হচ্ছে এখন। এসবের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন মাদক বিতরণ ও পাচারের নতুন মাধ্যম হয়ে উঠেছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নজরদারি আরও কঠিন করে তুলছে। শুধু নাম জানা এসব মাদকই নয়, নতুন নতুন সিনথেটিক মাদকের দিকে ঝুঁকছে দেশের তরুণ-তরুণীরা। যাদের বেশিরভাগই আবার ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। এলএসডি, এমডিএমএ, কুশ, খাথসহ পশ্চিমা দেশ থেকে আসা এসব মাদকে ক্রমেই আসক্তি বাড়ছে তাদের।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে যে পরিমাণ মাদক ঢুকছে এর ৮৮ শতাংশ আসছে ভারত থেকে। আর মিয়ানমার থেকে ৮ এবং ৪ শতাংশ আসছে অন্য দেশ থেকে। দেশে ঢোকা মোট মাদকের ১৭ শতাংশ ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকায় আসছে। আর বাকি ৮৩ শতাংশ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। অল্প সময়ে বিপুল টাকা উপার্জনের প্রবণতা থেকে অনেকে মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছেন।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, গত ছয় মাসে সীমান্তে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১ হাজার ৯৭ কোটি ৫৮ লাখ ৬৫ হাজার টাকা মূল্যের বিপুল মাদক ও চোরাচালান পণ্য জব্দ করেছে তারা।
এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ছয় বছরে সংস্থাটি ১ লাখ ৫১ হাজার ৯৯৭টি মামলা করেছে। যাতে আসামি করা হয়েছে, ১ লাখ ৬২ হাজার ১৮১ জনকে।
সাড়ে তিন মাসে ৩৪ হাজার ৪২৩ জন মাদক ও চোরাকারবারি গ্রেপ্তার হওয়া নিছক একটি সংখ্যা নয়। এটি দেশের অপরাধ পরিস্থিতিতে মাদক ও চোরাচালানের গভীর বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। মাদকের বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে শুধু গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে স্থায়ী ফল পাওয়া সম্ভব নয়। গ্রেপ্তার মূলত একটি সাময়িক বা ‘কিউরেটিভ মেজার’ ব্যবস্থা। অথচ মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন ‘প্রিভেন্টিভ মেজার’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। অর্থাৎ মাদকের মূল উৎস, সীমান্তবর্তী চ্যানেল ও পুরো সাপ্লাই চেইন বন্ধ করা। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সদিচ্ছা প্রয়োজন। কারণ মাদকের পেছনে বড় ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। এই স্বার্থের বলয় ভাঙতে সরকার কতটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত, সেটিই মূল বিষয়।
তিনি বলেছেন, মাদকের মূল সোর্স বা উৎসের জায়গায় হাত না দিয়ে শুধু শহরকেন্দ্রিক গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ানো হলে তা অনেকটা জনতুষ্টির চেষ্টা হয়ে দাঁড়ায়। এতে অপরাধ দমনের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয় না।
তার ভাষায়, মাদকের পেছনে বড় ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ বা ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি’ কাজ করে। এই অর্থনৈতিক বলয় ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভাঙতে হলে দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুলিশের রাজনৈতিক নির্ভরতা, পেশাদারিত্বের ঘাটতি ও অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি দূর করার দায়িত্বও সরকারের। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান নয়; সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছায় মাদকের উৎস ও সাপ্লাই চেইন কতটা বন্ধ করা যাচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।
তিনি আরও বললেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে ছোট অপরাধী। যারা বেশি দিন কারাগারে থাকেন না, জামিনে বেরিয়ে যান। ফলে অপরাধীদের একটি চক্র তৈরি হয়, যেখানে একই অপরাধী বারবার গ্রেপ্তার হলেও অপরাধপ্রবণতা কমে না।
শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পুরো চিত্র পাওয়া যায় না বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। মাদক ও চোরাকারবারিদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি বড় উদ্বেগ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী, পরিকল্পনাকারী ও সহযোগী।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ দমনে অভিযান জরুরি হলেও এর পাশাপাশি অপরাধের উৎস, অর্থের জোগান, মাদক সরবরাহের চেইন, চোরাচালানের রুট, অস্ত্রের উৎস এবং অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতার জায়গাগুলো শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। না হলে একদল গ্রেপ্তার হলেও তাদের জায়গা নিতে নতুন অপরাধী তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী আইনজীবী সাইদুর রহমান বলেছেন, মাদক ও অনলাইন জুয়া এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; পুরো সমাজের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব থেকে কোনো পরিবারই নিরাপদ নয়। তাই মাদক ও জুয়া নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও রাষ্ট্রকে প্রধান দায়িত্ব নিতে হবে। তবে বিশেষ অভিযান পরিচালনার সময় যাচাই-বাছাই ছাড়া নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একজন মাদকসেবী বা চোরাকারবারির পাশাপাশি নিরপরাধ ব্যক্তিও গ্রেপ্তার হতে পারেন, যা মানবাধিকারের দৃষ্টিতে অত্যন্ত অন্যায় এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এ ছাড়া বিপুল মানুষ গ্রেপ্তার হলেও তাদের রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা আদালত ও কারাগারে নেই। ফলে সকালে আদালতে পাঠানো একজন আসামি বিকালেই জামিনে বেরিয়ে আসছেন। এতে গ্রেপ্তার অভিযান অনেক ক্ষেত্রে একটি চক্রের মধ্যে আটকে যাচ্ছে, অপরাধের মূল উৎসে আঘাত করা যাচ্ছে না।