১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইংরেজি তারিখ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি কেবল একটি নির্বাচনের দিন নয়, বরং রাষ্ট্র মেরামতের এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমান্তরালে এদিন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি 'জাতীয় গণভোট'। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের স্বপ্নকে একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক ভিত্তি দিতেই এই আয়োজন। মূলত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর প্রস্তাবনাগুলোকে আইনি বৈধতা দিয়ে এক ব্যক্তির শাসন বা স্বৈরতন্ত্রের পথ চিরতরে বন্ধ করাই এই গণভোটের মূল লক্ষ্য।
এই গণভোটের প্রাণভোমরা হলো 'জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫'। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে তৈরি এই সনদ কেবল কিছু সংস্কার প্রস্তাব নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক চুক্তি। এই সনদে রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিতামূলক করার জন্য ৩০টিরও বেশি মৌলিক পরিবর্তনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো—যিনিই ক্ষমতায় আসুন না কেন, রাষ্ট্র যেন আর কখনোই কোনো ব্যক্তি বা দলের পকেটে চলে না যায়।
গণভোটের মাধ্যমে নাগরিকরা সরাসরি সিদ্ধান্ত নেবেন তারা এমন একটি বাংলাদেশ চান কি না যেখানে:
*তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করবে।
*সরকারি দল ইচ্ছেমতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না।
*সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান চালু হবে।
*বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিসমূহের সভাপতি নির্বাচিত হবেন।
*যত মেয়াদই হোক, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
*সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ক্রমে বাড়বে।
*ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য পার্লামেন্টে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
*দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
*আপনার মৌলিক অধিকারের সংখ্যা (যেমন: ইন্টারনেট সেবা কখনও বন্ধ করা যাবে না) বাড়বে।
*দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছেমতো ক্ষমা করতে পারবেন না।
*রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকবে।
বিগত দশকগুলোতে সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকা অসীম ক্ষমতা স্বৈরাচারী শাসনের পথ প্রশস্ত করেছে। জুলাই সনদে এই একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ’ (Bicameral Parliament) ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সদস্যদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ‘উচ্চকক্ষ’ থাকবে। এটি সরকারের যেকোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত বা বিতর্কিত আইন পাসের ক্ষেত্রে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ হিসেবে কাজ করবে।
ব্যালট পেপারে আপনার একটি রায় নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশের গতিপথ। মনে রাখবেন, "হ্যাঁ" ভোট দিলে উপরে উল্লিখিত সকল পরিবর্তন ও সংস্কারগুলো নিশ্চিত হবে। অন্যদিকে "না" ভোট দেওয়ার অর্থ হলো বর্তমানের ভঙ্গুর ও ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা বহাল রাখা, যা ভবিষ্যতে আবারও ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
অতএব ১২ ফেব্রুয়ারির এই গণভোট কোনো দলীয় জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দেওয়ার সুযোগ।একটি জবাবদিহিতামূলক বাংলাদেশ গড়তে আমাদের রায় হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তনের চাবি এখন আপনারই হাতে। আপনার একটি ভোটই নিশ্চিত করবে—ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কি শাসকের খেয়ালখুশিতে চলবে, নাকি জনগণের সম্মতিতে আইনের শাসনে?
লেখক,
জিয়াউর রহমান মুকুল,
মানবাধিকার ও উন্নয়ন কর্মী।