

মুহিবুল্লাহ ছিলেন রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের পক্ষের জনপ্রিয় নেতা। তাকে হত্যার ফলে রোহিঙ্গাদের ভেতর প্রত্যাবাসনের পক্ষের কণ্ঠ দুর্বল হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি তাদের আশঙ্কা, এমন একজন পরিচিত নেতার হত্যার পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিজেদের মধ্যে সংঘাত আরও বাড়তে পারে। এতে প্রত্যাবাসনের পক্ষের অন্যরা অনিরাপদ হয়ে পড়বেন এবং প্রত্যাবাসনবিরোধীরা শক্তি পাবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে জোরালোভাবে সক্রিয় হওয়া।
মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিশনগুলোর প্রতিক্রিয়ার প্রতি নজর রাখছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গত ৪৮ মাসে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘাতে ২২৬ জন নিহত হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছে ৩৫৪ জন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে জানানো হয়, হতাহতদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ছোট ছোট গ্রুপের একাধিক নেতাও রয়েছেন।
প্রত্যাবাসনের পক্ষে ছিলেন মুহিবুল্লাহ :মিয়ানমারের মংডু এলাকার লংডাছড়া গ্রামের মৌলভি ফজল আহমদের ছেলে মুহিবুল্লাহ ১৯৯২ সালে প্রথম মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। এর পর থেকে তিনি কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতে থাকেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০০ সালের শুরুতে ১৫ জন সদস্য নিয়ে মুহিবুল্লাহ গড়ে তোলেন 'আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস'(এআরএসপিএইচ) নামে একটি সংগঠন। এ সংগঠনের কাজে তিনি কক্সবাজার থেকে রাখাইনে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এক পর্যায়ে তিনি রাখাইনে বসবাস শুরু করেন। তবে কক্সবাজারে নিয়মিত আসতেন। এর পর ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও জাতিগত নিধন অভিযান শুরু হলে আবারও বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন মুহিবুল্লাহ এবং আশ্রয় নেন উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। এর পর তার সংগঠন এআরএসপিএইচের কার্যক্রম আরও জোরদার হয়।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের একটি প্রতিবেদনে মুহিবুল্লাহর সংগঠনে ৩০০ জন সক্রিয় সদস্য ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের পর মুহিবুল্লাহর সাংগঠনিক কার্যক্রম গতি পেলে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের নজরে আসেন। কারণ রোহিঙ্গাদের অন্য নেতাদের তুলনায় মুহিবুল্লাহ অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত এবং ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন। রোহিঙ্গাদের ভেতরে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এবং সেখানে নাগরিকত্বসহ অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করার পক্ষে জনমত তৈরির ক্ষেত্রেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন। এ সময় তার সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ পরিচালিত আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। জাতিসংঘ মহাসচিবসহ পশ্চিমা বিশ্বের যত নেতা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গেছেন, তাদের সবার সঙ্গেই সাক্ষাৎ করেন মুহিবুল্লাহ। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ১৭টি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ২৭ জন নেতা সাক্ষাৎ করেন। সেই ২৭ জনের মধ্যে মুহিবুল্লাহও ছিলেন।
ওই বছরই মুহিবুল্লাহ বড় চমক সৃষ্টি করেন ২২ আগস্ট কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মহাসমাবেশের ডাক দিয়ে। ওই মহাসমাবেশ অনুষ্ঠানের পর দেশ-বিদেশে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে আসেন মুহিবুল্লাহ। ওই সমাবেশে তিনি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পক্ষে জেরালো দাবি তোলেন। এর পর প্রতিটি বিবৃতি ও বক্তব্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে তার এবং তার সংগঠনের শক্ত অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি ২০১৭ সালে রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের পক্ষেও বিভিন্ন সময়ে মত দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ সমকালকে বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে সংঘাত প্রবল মাত্রায় আছে। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হলে এ সংঘাত বাড়বে। নিরাপত্তার শঙ্কাও প্রবল হবে। এ কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি না দিয়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন বিষয়ে জোর দেওয়া জরুরি।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আরও বলেন, মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের নেতা নিজেই হয়ে উঠেছিলেন। তিনি নির্বাচিত নেতা ছিলেন না। তিনি একটি গ্রুপের নেতা ছিলেন; সার্বিকভাবে পুরো রোহিঙ্গাদের নেতা ছিলেন না। ফলে একজন নির্বাচিত নেতার জন্য যে ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়, তার জন্য তা করার বাস্তবতা ছিল না। তার সঙ্গে পশ্চিমাদের যোগাযোগের বিষয়টি সবার মোটামুটি জানাই ছিল। এখন তার হত্যার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের সেই সংঘাত বেড়ে যাওয়া ও নিরাপত্তার উদ্বেগের বিষয়টিই জোরালো হয়ে উঠল। বাংলাদেশ বারবার বলেছে, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হলে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অতএব এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়েই সক্রিয় হতে হবে। এ সংকট সমাধানে আর কোনো বিকল্প নেই।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্নেষক হুমায়ুন কবীর সমকালকে বলেন, মুহিবুল্লাহ প্রত্যাবাসনের পক্ষের নেতা ছিলেন। তার এ হত্যাকাণ্ডের ফলে প্রত্যাবাসনের পক্ষে রোহিঙ্গাদের ভেতরের কণ্ঠটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। কারণ মুহিবুল্লাহর অনুসারী এবং প্রত্যাবাসনের পক্ষের অন্য নেতারা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন। তাই প্রত্যাবাসনের পক্ষের নেতাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি এখন বিবেচনা করা দরকার। এ ছাড়া মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের ফলে রোহিঙ্গাদের ভেতরে প্রতিশোধমূলক সংঘাত আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে। ফলে এ হত্যাকাণ্ড নিরাপত্তার জন্য একটা বড় উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এ কারণে মুহিবুল্লাহকে কারা হত্যা করেছে, তা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে বের করে তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা উচিত। সুত্র: সমকাল