দেশে মাদক পাচার ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বরং দিন দিন বাড়ছে মাদকের চোরাচালান। বর্তমানে দেশের ১৮টি জেলার শতাধিক রুট দিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রবেশ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ইয়াবা ও আইসের (ক্রিস্টাল মেথ) ব্যবহার। এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে।
সম্প্রতি প্রতিবেদনটি সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে পাঠানো হয়েছে। এতে মাদক চোরাচালানের প্রধান রুট, চোরাচালান বৃদ্ধির কারণ এবং তা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় করণীয় তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে শতাধিক প্রধান রুট দিয়ে নিয়মিত মাদক চোরাচালান হচ্ছে। তবে ছোট-বড় মিলিয়ে সক্রিয় রুটের সংখ্যা প্রায় দেড় শতাধিক। এর মধ্যে শতাধিক রুটকে ‘মেজর রুট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে অধিদফতর, কারণ এসব পথ দিয়ে প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে মাদক পাচার হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রেই এসব রুট সম্পর্কে অবগত। কিন্তু জনসচেতনতার অভাব, স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধীদের সহযোগিতা, তথ্য গোপন এবং মাদক কারবারিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের কারণে কার্যকরভাবে চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক সময় অভিযানের আগেই তথ্য পেয়ে যায় কারবারিরা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর দেশের চোরাচালান রুটগুলোকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করেছে— পশ্চিমাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮টি জেলা দিয়ে সবচেয়ে বেশি মাদক প্রবেশ করছে, সেগুলো হলো—সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা এবং কক্সবাজার।
পশ্চিমাঞ্চল সীমান্তে সাতক্ষীরার কলারোয়া, দেবহাটা, ভোমরা, কাকডাঙ্গা ও পলাশপুর; যশোরের বেনাপোল, পুটখালী, চৌগাছা, নারায়ণপুর ও শার্শা; চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গা, দর্শনা ও জীবননগর; মেহেরপুরের দাড়িয়াপুর ও বুড়িপোতা; রাজশাহীর মণিগ্রাম, চারঘাট, সারদা, ইউসুফপুর, বেলপুকুর, হরিপুর, গোদাগাড়ী, বাঘা ও সদর; চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট, শাহবাজপুর, বিনোদপুর, সোনামসজিদ স্থলবন্দর ও কানসাট; জয়পুরহাটের পাঁচবিবি; দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, হিলি, হাকিমপুর, কামালপুর, বিরল, আশকরপুর, খানপুর, দাইনুর, মালিগ্রাম ও বানতারা; সিলেটের জকিগঞ্জ, চুনারুঘাট ও মাধবপুর; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার করিমপুর, কসবা, আখাউড়া, সিঙ্গারবিল, পাহাড়পুর ও বিজয়নগর; কুমিল্লার জগন্নাথদিঘি, চৌদ্দগ্রাম, গোলাপশাহ, কালিকাপুর, জগন্নাথপুর, রাজাপুর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও বিবিরবাজার; এবং ফেনীর ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম দিয়ে নিয়মিত মাদক চোরাচালান হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে— কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী, রৌমারী, ভুরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, বাঁশজানি, বালারহাট, বালাটারী, কুটি চন্দ্রখানা, পাথরডুবি ও নাগরগঞ্জ; লালমনিরহাটের সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, পাটগ্রাম ও বুড়িমারী; শেরপুরের ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী; ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া; এবং নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কমলাকান্দা।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলা কক্সবাজার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলার টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন, সাবরাং, হোয়াইক্যং, হ্নীলা, উখিয়া, বালুখালী, কাটাখালী, কাটাপাহাড়সহ মোট ১৯টি পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করছে। পরে এসব মাদক ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। মাছ, শুটকি ও অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহনের আড়ালেও মাদক পরিবহন করা হচ্ছে।
মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার হয়ে আসে বেশি মাদক
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রতিবেদনে ইয়াবা ও আইসের (ক্রিস্টাল মেথ) উৎপাদনকেন্দ্র এবং বাংলাদেশে প্রবেশের পথও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ ইয়াবা চীন-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী শান ও কাচিন রাজ্যের সংলগ্ন এলাকায় এবং মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি গোপন পরীক্ষাগারে উৎপাদিত হয়। নাফ নদী ও উপকূলীয় এলাকা এসব মাদকের অন্যতম প্রধান উৎসপথ। ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত, বিশেষ করে কক্সবাজার সীমান্ত, ইয়াবা প্রবেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ করিডোর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
দেশের শতাধিক সীমান্তপথ দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাদক চোরাচালান হয়। বাংলাদেশে মাদক উৎপাদন না হওয়ায় প্রায় সব মাদকই প্রতিবেশী দেশ থেকে চোরাপথে আসে। পরে সংঘবদ্ধ চক্র সেগুলো কৌশলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেয়।
—একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন পরিচালক
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন পরিচালক ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রতিবেদনটির তথ্য বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন। সাম্প্রতিক সময়ে মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করা না যাওয়ায় বিষয়টি বার্ষিক প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে।
তার মতে, দেশের শতাধিক সীমান্তপথ দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাদক চোরাচালান হয়। বাংলাদেশে মাদক উৎপাদন না হওয়ায় প্রায় সব মাদকই প্রতিবেশী দেশ থেকে চোরাপথে আসে। পরে সংঘবদ্ধ চক্র সেগুলো কৌশলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেয়।
ইয়াবার পাশাপাশি বাড়ছে আইসের ব্যবহার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ইয়াবার পাশাপাশি আইসের ব্যবহারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। জব্দকৃত মাদকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে প্রথমবারের মতো আইস জব্দ করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে ১৮৬ দশমিক ৬৩২ কেজি, ২০২৪ সালে ১১২ দশমিক ৩৪৪ কেজি এবং ২০২৫ সালে ২০ দশমিক ৪৪২ কেজি আইস জব্দ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকাতেও মাদকের অপব্যবহার এখন দৃশ্যমান। সীমান্তবর্তী ৩২টি জেলা বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মাদকের বিস্তারে সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ইয়াবা সেবনের প্রবণতা বাড়ছে। সচ্ছল পরিবারের কিছু বিপথগামী তরুণ নতুন ও উচ্চমাত্রার মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে এসব মাদক সহজে সংগ্রহ করা যাচ্ছে।
তবে দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক এখনও গাঁজা। এর পরের অবস্থানে রয়েছে মেথামফেটামিন, হেরোইন এবং কোডিনভিত্তিক সিরাপ।
মাদকের সবচেয়ে বড় বাজার ঢাকা
২০২৫ সালে জব্দ করা মাদকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে বড় মাদকবাজার ঢাকা। এছাড়া সবচেয়ে বেশি মাদকপ্রবণ জেলার তালিকায় রয়েছে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, ফরিদপুর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা। সৌজন্যে ঢাকা মেইল