হুমায়ুন কবির জুশান, উখিয়া নিউজ ডটকম:: [caption id="attachment_89765" align="alignleft" width="1000"]
সীমান্ত শহর টেকনাফ মেরিন সিটি হসপিটাল[/caption]
মা ডাকটি খুব ছোট, কিন্তু মধুর।পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম এই ডাকটি শোনার জন্য কত মা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান।অথচ একটু সচেতনতাই পারে এসব মায়েদের অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে। আধুনিক এই যুগেও আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীই তাদের অধিকার ও সেবা থেকে বঞ্চিত। এর একদিকে আছে অপ্রতুল চিকিৎসাসেবা, অন্যদিকে রয়েছে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থা। আমি অনেক গর্রভবতী মাকে দেখেছি, যারা সীমান্ত শহর টেকনাফ থেকে কক্সবাজারে যাওয়ার পথে সন্তান প্রসবকালীন জটিলতায় মারা গেছেন। উন্নত চিকিৎসা সেবার অভাবে। তাই একজন সচেতন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার স্বপ্ন ছিল মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সেবায় মানব কল্যাণে একটি মানসম্মত হাসপাতাল তৈরি করার। হাসপাতালের এমডি আলহাজ্ব নুরুজ্জামান ভায়ের অক্লান্ত প্রচেষ্টা, হসপিটালের শেয়ার হোল্ডারদের আন্তরিকতা ও সাবেক সাংসদ আলহাজ্ব আব্দুর রহমান বদির সার্রবিক সহযোগিতায় আল্লাহ পাকের অশেষ দয়ায় আজ পরিপূর্রণ একটি হাসপাতাল করতে পেরেছি। কথাগুলো বলছিলেন টেকনাফ মেরিন সিটি হসপিটালের চেয়ারম্যান কোহিনুর কাউন্সিলর। গতকাল সরেজমিনে গিয়ে ও হাসপাতালের এমডি আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের সাথে কথা বলে জানা গেছে, টেকনাফ মেরিন সিটি হসপিটালটি অত্যাধুনিক সুবিধা সম্বলিত একটি পূর্রণাঙ্গ হাসপাতাল। ২৪ ঘন্টা পুরুষ ও মহিলা ডাক্তারদের তত্তাবধান।বিশেষঞ্জ চিকিৎসক প্যানেল দ্বারা চিকিৎসা সেবা। রোগীদের সেবা নিশ্চিতকরণে কাস্টমার কেয়ার সার্রভিস। ফার্রমেসী থেকে ২৪ ঘন্টা সকল ওষুধ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। সব সময় অ্যাম্বুলেন্স সার্রভিস ও অক্সিজেন সাপ্লাই। গাড়ী পার্রকিং এর সুবিধা ও স্ট্যান্টবাই জেনারেটর। যানজটমুক্ত এলাকা, নিরিবিলি পরিবেশ ও আন্তরিক সেবা। কম খরচে প্যাথলজি, রেডিওলজিসহ সব ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অসংখ্য বিশেষঞ্জ চিকিৎসক ও সার্রজন অনকলে রোগী দেখেন এবং অপারেশন করেন। ২৪ ঘন্টা ইমার্রজেন্সী ও আউটডোর। সার্রজারী বিভাগে রয়েছে, ল্যাপারস্কোপিক সার্রজারী সুবিধাসহ ৩টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার, যেখানে জেনারেল সার্রজারী, অর্রথোপেডিক ও স্পাইন সার্রজারী, ইউরোলজি-প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড, মূত্রথলি, মূত্রনালী, পিত্রথলি ও পিত্রনালীর পাথর অপারেশন, গাইনী ও শিশু সার্রজারী, ব্রেস্ট সার্রজারী, কলোরেক্টার সার্রজারী, নাক-কান-গলার সাধারণ ও মাইক্রো সার্রজারী, প্লাস্টিক ও কসমেটিক সার্রজারী, হাইড্রোসিল, হার্রনিয়া, এপেন্ডিক্স মুসলমানীসহ সব ধরণের অপারেশন করার সু-ব্যবস্থা।তাছাড়া কমমূল্যে নরমাল ডেলিভারী ও সিজারিয়ান অপারেশনের সুবিধা। নবজাত শিশুদের জন্য স্পেশাল কেয়ার ইউনিট ও ব্রেস্টফিডিং কর্রণার।সাশ্রয়ী মূল্যে ভিআইপি, এসি, নন-এসি কেবিন ও সাধারণ বেড। আলাদা পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্রড এবং ২৪ ঘন্টা অভিঞ্জ ও দক্ষ নার্রসিং টিমের সেবা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পোস্ট অপারেটিভ সু-ব্যবস্থাসহ আন্তরিক সেবা। সেবা নিতে আসা জুলফিকার আলী ভূট্রো নামের এক রোগীর সাথে কথা হয়, তিনি জানান, আমি একজন প্রবাসী। ২২ বছর পর একেবারে দেশে চলে আসলাম। আমার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা ও ডাক্তার দেখাতে এখানে এসছি। মেরিন সিটি হসপিটালের চিকিৎসা সেবা আমার খুব ভালো লেগেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমাদের দেশের দরিদ্র মায়েরা নিরাপদ মাতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয় অভাব আর অশিক্ষার জন্য। আর টাকাওয়ালা ও সম্পদশালী অনেক পরিবারের মায়েরা বঞ্চিত হয় সামান্য কিছু অচেতনতার অভাবে। যেমন-দীর্রঘদিন থেকে হয়তো দুই পা ফুলে গেছে। বাসার সবাই মনে করছেন যে, গর্রভাবস্থায় পা ফুলতেই পারে। এটা দুচিন্তার কিছু না। তাই অবহেলা করে চিকিৎসকের পরামর্রশ নেয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। কিন্তু এমন ধারণা ভীষণ হুমকিস্বরুপ। বিশেষঞ্জদের মতে, পা ফুলে যাওয়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, দেহ থেকে প্রোটিন বের হয়ে যাওয়া, কিডনির অসুখ (কোন কোন ক্ষেত্রে ) বা কিছু ওষুধের পার্রশ প্রতিক্রিয়ারও সম্পর্রক থাকতে পারে। আবার অধিকাংশ মায়ের রক্তে এই সময়ে চিনির মাত্রা বেড়ে যায়। অনেকের ধারণা, গর্রভাবস্থায় রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে যাওয়াটা তেমন ভয়ের কিছুই না।
টেকনাফ মেরিন সিটি হাসপাতালের ডাক্তার নুসরাত ইসলাম বলেন, আমাদের দেশে সন্তান নেয়ার আগে দম্পত্তিরা স্ত্রীরোগ বিশেষঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগ করেন না বললেই চলে। তাই গভর্রধারণের সময় নানা রকম জটিলতা দেখা দেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অথর্রনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারী সন্তান নেয়ার বিষয়ে নিজস্ব মতামত জানাতে পারলেও অল্পবয়সী ও অথর্রনৈতিকভাবে পরনিভর্ররশীল নারীদের এ ব্যাপারে তেমন কোনো ভূমিকা থাকে না বললেই চলে। স্বামী কিংবা শশুরবাড়ির ইচ্ছাতেই বাচ্ছা নিতে বাধ্য হয় মেয়েরা। আবার অনেক সময় দেখা যায়, মেয়ের নিজের পরিবার থেকেও চাপ দেয় দ্রুত বিয়ে করে বাচ্ছা নিতে। তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বে বাচ্ছা নেয়ার আগে দম্পতিকে নানা রকম প্রস্তুতি নিতে দেখা গেলেও আমাদের দেশে তা বিরল। লালনপালনসহ তার মৌলিক চাহিদা পূরণের সামর্রথ না থাকলেও একজন দম্পতিকে সামাজিক চাপের মুখে পড়ে এক বা একের বেশি সন্তান নিতে হয়। গর্রভবতী মায়ের চিকিৎসা সম্পর্রেক তিনি বলেন, একজন গর্রভবতী মাকে সবর্রনিম্ন চারটি চেকআপ নিতে হবে। তাহলে গর্রভাবস্থায় তার কোন ঝুঁকি থাকলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে। এ চেকআপগুলো শুধু যে বড় বড় হাসপাতালে আছে তা না, একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চনগুলোতেও আছে। বর্রতমান সরকারের যে আস্থা ব্যবস্থা সেখানে কমিউনিটি ক্লিনিক , উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরিবার পরিকল্পনা কার্রযালয়ে গিয়েও এ চেকআপটা করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই গর্রভবতীর পরিবারকে উদ্যোগ নিতে হবে। অবশ্যই নিকটবর্রতী গাইনি ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। তবেই অকাল মাতৃমৃত্যু রোধ সম্ভব।শিক্ষিকা আনজুমান আরা বেগম বলেন, টেকনাফ মেরিন সিটি হসপিটালে আমি আমার মেয়ে ফারিয়া ফারহা নিশিকে নিয়ে আসি। এখানকার ডাক্তারদের অমায়িক ব্যবহার ও অত্যন্ত যত্নসহকারে দেখা এবং সেবা দেয়ায় আমি মুগ্ধ হয়েছি। এ প্রতিবেদক চলে আসার সময়ে হসপিটালের এমডি নুরুজ্জামান আরো বলেন, আমরা সব সময় রোগীদের সেবা দিতে প্রস্তুত থাকি। বিশেষ করে
নিরাপদ মাতৃত্ব প্রতিটি মায়ের অধিকার। সুস্থ-সবল শিশু দেশের অমূল্য সম্পদ। মায়ের গর্রভকালীন সুস্থতাই পারে একটি সুস্থ শিশু জন্ম দিতে। এর জন্য নিরাপদ মাতৃত্ব অপরিহার্রয। গর্রভবতী মায়ের যে কোন সময় জটিলতা দেখা দিতে পারে- এই ব্যাপারটি পরিবারের জানা এবং সচেতন থাকা খুবই গুরুত্বপূর্রণ। একজন মা শত-সহস্র যন্ত্রণা সহ্য করে, নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে, ১০ মাস ১০ দিন শিশুটিকে নিজের মধ্যে ধারণ করে পৃথিবীর মুখ দেখান। কিন্তু জন্মদানের ক্ষেত্রে আমরা মায়েদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারছি সেটা ভাবার বিষয়। আমাদের দেশে মেয়েমাত্রই মা হওয়ার বাসনা লালন করে থাকেন। কিন্তু মা হওয়ার জন্য কি ধরনের প্রস্তুতি বা সতর্রকতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, তা তাদের জন্যে নেই। আমাদের দেশে বেশির ভাগ মা জানেন না, মা হওয়ার পূর্রবপ্রস্তুতি এবং গর্রভকালীন করণীয় সম্পর্রকে। বিশেষ করে অসচেতন মায়েরাই মাতৃত্বকালীন নানা জটিলতায় ভোগেন। তারা এ বিষয়ে আলাদা করে কোনো চিন্তা করেন না। মাতৃত্বকালীন জটিলতায় অসচেতন মায়েদের মৃত্যু ঘটে বেশি। মা ও শিশু স্বাস্থের ওপরই সুস্থ জাতি গড়ে ওঠা নির্রভর করে। জাতিসংঘ প্রণীত সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষমাত্রায় মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষে যে ৮ টি লক্ষমাত্রা অর্রজনের কথা বলা হয়েছে, তার তিনটিতেই মা ও শিশু স্বাস্থের উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩০-৩২ লাখ মা গর্রভধারণ করেন। তাদের মধ্যে প্রতি হাজারে ১৫ জন মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়া, আমাদের দেশে ১৫ বছর বা এর সমবয়সী মায়েদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাদের মৃত্যুকালীন ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে আশার কথা এই, আগের তুলনায় বাংলাদেশে মাতৃত্ব সেবার উন্নতি হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি চারজন নারীর মধ্যে তিনজন গর্রভকালীন সেবা অর্রথাৎ এন্টিনেটাল কেয়ারের আওতায় চলে এসেছেন। কিন্তু এক চতুর্রথাংশ নারী এখনো চিকিৎসা সেবার আওতায় নেই। তাই গর্রভবতী নারীর সঠিক সংখ্যা নির্রধারণ করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। গর্রভধারণ, প্রসবকাল এবং প্রসবের পর মায়েদের যদি মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার সুযোগ থাকে তাহলে গর্রভধারণ ও প্রসবজনিত অনেক বিপদ এড়ানো সম্ভব। মূলত সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা ও সচেতনতাই পারে মা এবং নিরাপদ মাতৃত্ব ও শিশুর প্রাথমিক বিকাশ নিশ্চিত করতে।