কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্প অধ্যুষিত আশেপাশের এলাকার ফার্মেসী সমুহ রীতিমত মিনি হাসপাতালে পরিণত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফার্মেসীর পিছনে বড় পরিসরে রোম নিয়ে একাধিক বেড বসিয়ে মিনি হাসাপাতালে রুপান্তরিত করা হয়েছে। ফার্মেসী সংশ্লিষ্ট এসব মিনি হাসপাতালে কর্মচারীদের দিয়ে রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে বলে জানাগেছে। ফার্মেসীর পেছনে স্থাপিত মিনি হাসপাতালের অবজারভেশন বেড সমুহে রোগী ধরে রেখে ওপিডি এবং আইপিডি স্টাইলে দিবারাত্রি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা টাওয়ার এলাকাস্থ ষ্টেশনের রহমান মোস্তফা সুপার মার্কেটে মেসার্স বর্ণ মেডিকো নামের তেমনি একটি ফার্মেসী রয়েছে। সাইন বোর্ডে স্পষ্ট উল্লেখ আছে উক্ত ফার্মেসীতে সকল প্রকার ডাক্তারী ঔষুধ পাওয়া যায়। তবে ওই ফার্মেসীতে পরিক্ষীত শর্মা নামের এক ব্যাক্তি দীর্ঘদিন ধরে সর্ব রোগের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। স্থানীয় লোকজন ও রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, জটিল এবং কঠিন রোগের চিকিৎসা করেন ডাক্তার পরিক্ষীত শর্মা। তাদের মতে চিকিৎসার নামে এই পরিক্ষীত শর্মা দীর্ঘ সময় ধরে গলাকাটা বাণিজ্য চালিয়ে আসছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, চিকিৎসা ক্ষেত্রে তার কোন নূন্যতম একাডেমীক যোগ্যতা না থাকলেও সে কিন্তু বর্ণ মেডিকোতে বসে সর্ব রোগের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন। তার অপচিকিৎসায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয়দের অনেকে প্রতিনিয়ত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। পরিক্ষীতের ভুল চিকিৎসার কারণে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্থ হলেও নিজেদের অজ্ঞতার কারণে সরলমনা গ্রামীণ এই মানুষগুলো স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে পারেনি। ভুল চিকিৎসায় স্থানীয় নারীসহ অনেকের মৃত্যু ঘটেছে বলে জানাগেছে। স্থানীয় এক ভুক্তভোগী সংবাদ মাধ্যমকে জানান, পরিক্ষীতের কারণেই আমার মেয়েকে অকালে জীবন দিতে হয়েছে। তার ভুয়া চিকিৎসার কারণে আমার একমাত্র মেয়েটি মারা যান। অকালে মরে যাওয়া মেয়েকে নিয়ে সে সময়ে আমি কিচ্ছু করতে চায়নি। বর্তমানে তিনিও তার পরিবার এবং স্বজনসহ আশেপাশের লোকজন ভুয়া ডাক্তার পরিক্ষীত শর্মার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী লোকজন প্রতারক এবং ভুয়া চিকিৎসক পরিক্ষীত শর্মার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। আর স্থানীয় সিভিল সোসাইটির লোকজন জরুরী ভিত্তিতে অপচিকিৎসা থেকে লোকজনকে বাঁচাতে ভুয়া ডাক্তার পরিক্ষীত শর্মার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এদিকে স্থানীয় লোকজন ও রোহিঙ্গাদের অহরহ অভিযোগের প্রেক্ষিতে লেদা টাওয়ারস্থ রহমান মোস্তফা সুপার মার্কেটের বর্ণ মেডিকোতে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়। দোকানের সামনের অংশে ফার্মেসী। যেখানে লোকজন লাইন ধরে ঔষুধ কিনছেন। ক্রেতারা জানান, ফার্মেসীতে মাত্রাতিরিক্ত ঔষুধের মুল্য নেওয়া হচ্ছে। ঔষুধ বিক্রিতে কোন প্রকার ক্যাশ মেমোও দেওয়া হচ্ছেনা। পাশাপাশি বর্ণ মেডিকোর পিছনে স্তুপ করা আছে অবৈধ ড্রাগ। ঔষুধ প্রশাসনের “দি বেঙ্গল ড্রাগস রুলস”্ ১৯৪৬ইং মতে এসব সম্পূর্ণ অবৈধ। দেখা গেছে, দোকানের মাঝখানে ডাক্তার বেশে একজন লোক বসে আছেন। তিনিই নাকি ডাক্তার পরিক্ষীত শর্মা। তার ডানে এবং পিছনে রোগীর জন্য বেড বসানো হয়েছে। কাইয়ুম নামের এক রোহিঙ্গা ছেলে (দোকানের কর্মচারী) শিশু রোগীকে ইনজেকশন পুশ করছেন। শিশুর মা জানালেন কাইয়ুমরাই আমাদের এবং অন্যান্য রোগীদের ইনজেকশন মারেন ও স্যালাইন পুশ করেন। রোগীর এটেন্ডেন্টের সাথে কথা বলার ফাঁকে ডাক্তার বেশা লোক (পরিক্ষীত শর্মা) রহস্যজনকভাবে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। দেখা যায়, ফার্মেসীর পেছনে রয়েছে বিশাল একটি গেইট। যেটি রোগী চলাচলের করিডোর হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ওই গেইট দিয়ে দিবারাত্রী রোগীরা আসছেন এবং যাচ্ছেন। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ভুয়া ডাক্তার পরিক্ষীত সরে গেলেও সেখানে ওসমান, হামিদ, কাইয়ুম ও বায়তুল্লাহ নামের ৪জন রোহিঙ্গা রোগীদের সাথে কথা বলছেন ও চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। পরে সাংবাদিকদের চিনতে পেরে পিছনের গেইট বন্ধ করে দিয়ে ওই চার রোহিঙ্গাও পালিয়ে গেছেন। পাশ^বর্তী লোকজন উপস্থিত সাংবাদিকদের জানালেন, রোহিঙ্গা যুবকদের দিয়েই ক্যাম্পে ও ক্যাম্পের বাইরে বর্ণ মেডিকোতে বড় বড় ডাক্তার আসছেন মর্মে অপপ্রচার চালিয়ে রোগীদের ডেকে আনেন। কিন্তু এখানে কোন কালে কোন সময়ে প্রশিক্ষিত কোন ডাক্তার বসেননি। বসেছেন কেবল ভুয়া ডাক্তার পরিক্ষীত শর্মা তার সহকারী ওসমান, হামিদ, কাইয়ুম ও বায়তুল্লাহ নামের রোহিঙ্গা ডাক্তার। অভিযুক্ত ভুয়া ডাক্তার পরিক্ষীত শর্মার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনুমতি না থাকলেও আমরা প্রাথমিকভাবে করছি আর কি। তবে দুই বছর আগে ঔষধ প্রশাসনের লোকজন ফার্মেসী পরিদর্শন করার এসব বেড দেখেছেন। ওই সময় তারা কিছু তো বলেননি বলে ভুয়া ডাক্তার পরিক্ষীতের দাবী। নিউজ এজেন্সী বয়েজ সেভেন ও বাংলা পোষ্টের প্রতিনিধি স্থানীয় সংবাদকর্মী ফরিদুল আলম জানান, ভুয়া ডাক্তার পরিক্ষীত শর্মা চিকিৎসার নামে লোকজনের সাথে দীর্ঘ বছর ধরে প্রতারণা করে আসছেন। ল্যাব টেষ্টের নাম ভাঙ্গিয়ে টাকা পয়সা নিয়েই নিজের টেবিলে বসে সে মনগড়া রিপোর্ট তৈরী করেন। বর্ণ মেডিকোতে বসে পরিক্ষীত সর্ব রোগের চিকিৎসা কিভাবে দেন এমন প্রশ্ন জানিয়ে সড়কের পাশে সার্টিফিকেট বিহীন একজন ভুয়া ডাক্তার চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা দিয়ে আসছেন কেমনে? তা তাঁকেসহ স্থানীয় সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলছেন। তিনি ফার্মেসীর পিছনে গড়ে উঠা অঘোষিত মিনি হাসপাতাল কেন্দ্রীক অপচিকিৎসা কেন্দ্র বন্ধে সিভিল সার্জন ও টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
খুচরা ড্রাগ লাইসেন্স হিসেবে অনুমোদিত বর্ণ মেডিকো নামের ফার্মেসীতে ৩/৪টি অবজারভেশন বেড বসিয়ে রোগী দেখার বিষয়ে জানার জন্য কক্সবাজার ঔষধ প্রশাসনের ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক কাজী ফরহাদের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার রিং করা হয়। পরে তার ব্যবহ্নত ওয়াটসআপ নাম্বারেও ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত কোন ধরণের রেসপন্স না পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডাক্তার মুহাম্মদ এনামুল হক জানান, চিকিৎসা সেবার নামে লোকজনের সাথে প্রতারণার কোন সুযোগ নেই। কখনো এসব কাজে ছাড় দিতে নেই জানিয়ে তিনি বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন। জানতে চাইলে কক্সবাজার সিভিল সার্জন ডাক্তার মুহাম্মদ ছাবের বলেন,ফার্মেসীতে রোগী দেখার আদৌ কোন সুযোগ নেই। এছাড়া ফার্মেসীর পিছনে বা সামনে বেড বসিয়ে রোগী ভর্তি করে, চিকিৎসা দিবে, স্যালাইন দিবে এ বিষয় গুলো মোটেও নিরাপদ নয়। উক্ত বিষয়ের জন্য কোন অনুমোদন নেই জানিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন বলে জানিয়েছেন।