রিয়াজুল হাসান খোকন, টেকনাফ, বাহারছড়া::
কক্সবাজারের টেকনাফের পাহাড়ী জনপদ গুলো যেন হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয় স্থল। স্থানীয়দের মতে টেকনাফের পাহাড় এবং পাহাড়ী জনপদ এখন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দখলে। তারা তাদের সুবিধা মত এই জনপদে ভাল আর মন্দ যেই কাজটি করতে চাই কোনো বাধা ছাড়া সেটি করতে পারে। তবে এই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের মন্দ কাজের পাল্লা যেন দিন দিন ভারী হয়ে উঠছে। টেকনাফের পাহাড়ি জনপদের হাজার হাজার মানুষ পাহাড়কে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই জনপদের মানুষের প্রধান পেশা পাহাড়ের গাছ ও লাকড়ি সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করা। গহীন বনের ভিতর বন্য প্রাণীর ভয় থাকলেও ছিল না কোনো অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ভয়। সকালে রাখাল তার গরু, মহিষ পাহাড়ে চরাতে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসত আপন নীড়ে। কাঠুরিয়া লাগড়ির জন্য গিয়ে দিনের বেলায় ফিরে আসত বউ বাচ্চাদের কাছে। কিন্তু ২০১৮ সালে মায়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে টেকনাফে রোহিঙ্গা আসার পর থেকে বদলে যায় সব দৃশ্যপট। এছাড়া এই জনপদে হাজার হাজার মানুষ পাহাড়ে শশার ক্ষেত, পানের বরজ, তরিতরকারী, আম বাগান, লিচু বাগান, জুম জাষ, নাল জায়গায় ধান চাষ, মাছের চাষ সহ বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু রোহিঙ্গা অস্ত্রধারীদের ভয়ে পাহাড়ে তাদের প্রত্যেকটা মিনিট যেন কাটে আংতকে। এমনকি তারা এই অস্ত্রধারীদের ভয়ে সাংবাদিকদের সাক্ষাতকার দিতেও ভয় পান। তাদের মতে সবখানে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গুপ্তচর রয়েছে। পরে নাম প্রকাশ হবেনা এমন শর্তে অনেক মানুষ পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলতে থাকে। বাংলাদেশী এমন এক ব্যক্তি জানান রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা ছদ্নবেশে পাহাড়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রম করে। তারা অস্ত্রের সাথে ধারালো দা, কুড়াল, ও মাছ ধরার জাল সহ পাহাড়ে প্রবেশ করে। সময় মত তারা বাংলাদেশি লোকের মাছ চাষের নালা(ছরা) থেকে মাছ ডাকাতি করে। আবার টাকা পয়সা জমা আছে এমন কোনো লোক পেলে অপহৃরণ করে। তবে এই কাজে বেশি ভাগ শিকার হয় গরু মহিষের রাখলরা। সন্ত্রাসীদের মতে দুইটি গুরু বা একটি মহিষ বিক্রি করলে এক লক্ষ টাকা পাওয়া যায়। তার ধারাবাহিকতায় পাহাড়ে মহিষ আনতে গিয়ে গত ২৮ এপ্রিল অপহরণের শিকার হয় টেকনাফ বাহারছড়া চৌকিদার পড়া গ্রামের মোঃ কাসেম (৬০) ও সলিম উল্লাহ (১৫)। সন্ত্রাসীরা তাদের মুক্তিপণের জন্য পরিবারের কাছে পাঁচ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবী করে। পরে স্বজনরা পাহাড়ে তাদের খুঁজতে গেলে গহীন বনে সন্ধান মিলে অর্ধগলিত এক তরুণীর লাশের। যার পরিচয় এখনো উদঘাটন করতে পারেনি প্রশাসন। এক সাপ্তাহ পার হলেও অপহৃতদের এখনো খোঁজ পাইনি কোনো আত্নীয় স্বজন ও প্রশাসন। এখন সবার মনে একটাই আশংঙ্কা অপহতদের খুঁজতে গিয়ে একটি যুবতীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সেই ঘটনার জেরে অপহৃতদের মেরে ফেলবে কিনা!। তার তিন সাপ্তাহ আগে একই এলাকার আবদুল আমীন ও আলী আহমদ নামে দুই ব্যক্তি পাহাড়ে লাকড়ির জন্য গেলে রোহিঙ্গা অস্ত্রধারীদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়। লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আবদুল আমীনের পায়ের হাঁড় ভেঙ্গে ফেলা হয়। কয়েক ঘন্টা বেধেঁ রেখে আবদুল আমীনের কাছে থাকা মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে পাহাড়ে না যেতে হুশিয়ারী প্রদান করা হয়। ভোক্তভোগীদের মতে তারা সবাই রোহিঙ্গা ছিল। তাদের কাছে ছিল ভারী অস্ত্র ও প্রচুর গোলাবারুদ। সন্ধ্যা হলে টেকনাফের পাহাড়ী জনপদে নেমে আসে এক ধরণের আতংক। অনেকে নিরাপত্তার কথা ভেবে রাতে রাস্তার পাশে তাদের আত্নীয় স্বজনদের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। এই সন্ত্রাসীরা রাত হলে সুযোগ বুঝে পাড়া মহল্লায়ও ঢুকে পড়ে এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। রাতে নিজের ঘরের সামনে সন্ত্রাসের শিকার হওয়া এমন এক যুবক জানান দুই তিন সাপ্তাহ আগে আমি বাড়ির সামনে একটি খোলা জায়গায় বসে ফোনে নিজের প্রিয়জনের সাথে কথা বলতে ছিলাম। তখন রাত আনুমানিক ১০টা হবে। হঠাৎ একটি বড় আকারের ধারালো ছুরি নিয়ে একটি লোক আমার পেছনে আসে। আমি মোবাইলের লাইট মেরে কে জীজ্ঞেস করলে আমাকে ছুরি ধরে বলে তোর কাছে কি আছে দিয়ে দে। তখন আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার দিয়ে পালাতে লাগলে সেও আমার পেছনে দৌঁড়াতে থাকে। পরে আমার চিৎকার শুনে এলাকাবাসী এগিয়ে আসলে সন্ত্রাসীটা পালিয়ে যায়। পাড়ার লোক সবাই খোঁজেও কয়েক মিনিট ব্যবধানে তাকে খোঁজে পাইনি। তার কথাবার্তায় সে রোহিঙ্গা ছিল। মুলত এই সব ঘটনাকে কেন্দ্র করে টেকনাফের পাহাড়ী জনপদ সহ সবখানে এক ধরণের আতংক বিরাজ করছে। সন্ধ্যা হলে প্রয়োজনীয় কোনো কাজ ছাড়া কেউ বের হইনা। তাই স্থানীয়দের দাবী এলাকার নিরাপত্তা জোরদারের জন্য প্রশাসনের টহল আরো বাড়ানো হোক। সন্ধ্যা ৭ টা থেকে যাতে কোনো রোহিঙ্গা শিবির বের হতে না পারে তার ব্যবস্থা করা হোক।