শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬টা, রান্নাঘরের গ্যাসের চুলায় চা বসিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে কর্মরত এক কর্মী। কিছুক্ষণ পর সেই রান্নাঘর থেকে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তেই ১০ শতক জমির ওপর নির্মিত রিসোর্টটির সবর্ত্র আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে।
ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। ২৪ ঘণ্টা পার হলেও এখনো ওই রিসোর্টে অবস্থান করা যশোরের একই পরিবারের চারজনের কোনো হদিস মেলেনি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও টুপটুপ রিসোর্টের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলা জানা গেছে, আগুন লাগার পরপরই রিসোর্টটির প্রায় সব কর্মী ও কয়েকজন অতিথি দ্রুত বেরিয়ে পড়লেও বেশ কয়েকজন কক্ষে আটকা পড়েন।
রিসোর্টের দ্বিতীয় তলায় ছিলো প্রতিষ্ঠানটির মালিকের পোষা দুটি কুকুর ও চারটি বিড়াল। আগুনের সূত্রপাত হলে রিসোর্টের ৪-৫ জন কর্মী প্রথমে সেই প্রাণীগুলো নিয়ে দ্রুত বাইরে চলে আসে বলে জানান এক প্রত্যক্ষদর্শী।
টুপটুপ রিসোর্টের অদূরেই বসতঘর প্রত্যক্ষদর্শী সেই যুবকের। তিনি বলেন, বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেয়ে ঘুম ভেঙে যায়, বাইরে এসে দেখি টুপটুপ জ্বলছে। প্রতিষ্ঠানটির ৪-৫ জন কর্মী কুকুর ও বিড়াল নিয়ে ছোটাছুটি করছেন, যেগুলো তাদের মালিক পুষতেন বলে জানতাম। তানভীরকে (মালিক) অসংখ্যবার কুকুরসহ বিচে হাঁটতে দেখেছি।
অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনায় টুপটুপ রিসোর্টের সেই মালিক তানভীর সুলতান মিয়াকে ১নং আসামিসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে উখিয়া থানায় একটি মামলা করা হয়েছে, যার বাদী পুলিশ।
তানভীরের ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদকেও আসামি করা হয়েছে এবং ঘটনার দিন শনিবার সন্ধ্যায় আটক রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এক আসামির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
গ্রেপ্তারের আগে সুমন সাংবাদিকদের জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনিসহ রিসোর্টের ১৯ জন কর্মী সেখানে কর্মরত ছিলেন এবং আগুন লাগার পরপরই তারা প্রাণ বাঁচাতে বেরিয়ে পড়েন। এছাড়াও রিসোর্টের ৯টি কক্ষের ৬টিতে ২১ জন অতিথি অবস্থান করছিলেন।
পলাতক তানভীর, অনুমোদন ছাড়াই চলছিল টুপটুপ
২০২২ সালের জুনে উখিয়ার ইনানী মৌজায় গিয়াস উদ্দিন গং থেকে প্রায় কোটি টাকা মূল্যে মেরিন ড্রাইভ লাগোয়া ১০ শতক জমি ক্রয় করেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার বাসিন্দা টিপু সুলতান মিয়ার ছেলে তানভীর সুলতান মিয়া। পরে বন্ধু নিয়াজ মোরশেদসহ সেই জমিতে টুপটুপ রিসোর্ট গড়ে তোলেন তিনি এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় যার ব্যবসায়িক কার্যক্রম। রিসোর্ট ব্যবসার পাশাপাশি তানভীরের রয়েছে সার্ফনেট নামে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
টুপটুপে অতিথিদের আর্কষণের জন্য পোষ্য কুকুর-বিড়ালের একটি সংগ্রহশালা বানিয়েছিলেন তিনি, যেখানে কেনি নামের ইতালিয়ান প্রজাতির ও কিয়ানা নামে আরেকটি জার্মান প্রজাতির কুকুর ছিল। এছাড়াও পার্সিয়ানসহ বিদেশি প্রজাতির কয়েকটি বিড়াল রাখা ছিল সেই সংগ্রহশালায়, পোষার পাশাপাশি তিনি প্রাণীগুলো ক্রয়-বিক্রয় করতেন বলে জানা গেছে। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তানভীর পলাতক রয়েছেন এছাড়াও তার ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদেরও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ বলেন, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে অনিরাপদ উল্লেখ করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি জানান, তিনতলা কাঠের ভবনটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ।
এছাড়াও নিয়মের তোয়াক্কা না করে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদন ছাড়াই চলছিল টুপটুপ।
কউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার জসিম উদ্দিন জানান, প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না। এ ব্যাপারে নোটিশ দেওয়া হলেও মালিক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি না সরিয়ে অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অধিকতর তদন্তে কাজ করছে জেলা প্রশাসনের ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি। মঙ্গলবারের মধ্যে সেই কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান।
উখিয়ার থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, মামলার প্রধান আসামি তানভীরসহ অন্যদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সুত্র, ঢাকা পোষ্ট