টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ধসের ঝুঁকি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান থামছে না। বরং গত এক সপ্তাহে সীমান্তজুড়ে বিজিবি, র্যাব-১৫ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, ইউরিয়া সার, দেশি-বিদেশি মদ ও বিয়ার উদ্ধার হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যদিও এসব অভিযানে কয়েকজন নারীসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাচারকারীরা মালামাল ফেলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
৬ জুলাই থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে অন্তত ২ লাখ ৮৮ হাজার ২৫০ পিস ইয়াবা, ২২ বস্তা ইউরিয়া সার, ৬০ লিটার বাংলা মদ, আরও ৩ দশমিক ৫ লিটার বাংলা মদ, ৭ বোতল বিদেশি মদ এবং ৩ ক্যান বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় চালানটি উদ্ধার করে কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি)। ১২ জুলাই সকালে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তসংলগ্ন কাস্টম মোড় এলাকায় ঘুমধুম বিওপির টহলদল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে মালিকবিহীন অবস্থায় ১ লাখ পিস বার্মিজ ইয়াবা জব্দ করে। বিজিবি জানায়, সীমান্ত পিলার-৩১ থেকে প্রায় এক কিলোমিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ইয়াবার চালানটি পড়ে ছিল। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনি কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
একই দিনে উখিয়ার শীলখালী অস্থায়ী চেকপোস্টে তল্লাশি চালিয়ে একটি প্রাইভেটকার থেকে ৭ বোতল বিদেশি মদ ও ৩ ক্যান বিয়ার উদ্ধার করে ৬৪ বিজিবি। এ সময় টেকনাফের পুরান পল্লানপাড়া এলাকার মো. রেদওয়ান সাদেক (১৭) নামে এক কিশোরকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, কক্সবাজার থেকে সংগ্রহ করে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে এসব মদ ও বিয়ার টেকনাফে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
এর আগে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের হাজিরপাড়া এলাকায় র্যাব-১৫ অভিযান চালিয়ে একটি প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ১ লাখ ১০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এ সময় শাকিলা শারমিন রেশমী (২২) নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে অভিযানের সময় তার স্বামী, স্থানীয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ইদ্রিস পালিয়ে যান। র্যাব জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া ইয়াবার বাজারমূল্য কোটি টাকারও বেশি।
১১ জুলাই উখিয়ার কোটবাজার দক্ষিণ স্টেশন এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিশেষ অভিযানে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ রোকসানা বেগম (৩৫) নামে এক নারীকে আটক করা হয়। তার ভ্যানিটি ব্যাগে থাকা ৫০টি জিপারযুক্ত প্যাকেট থেকে ইয়াবাগুলো উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
৯ জুলাই ভোরে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের কেরেঙ্গাঘোনা এলাকায় নাফ নদী দিয়ে মিয়ানমার থেকে পাচারের সময় ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ৬৪ বিজিবি। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে এক পাচারকারী ইয়াবার পোটলা ফেলে নাফ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মিয়ানমারে পালিয়ে যায়।
এর আগের দিন ৩৪ বিজিবির রেজুখাল চেকপোস্টে পৃথক অভিযানে ৮ হাজার ২৫০ পিস ইয়াবাসহ তিনজনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে একজন নিজের শরীরের ভেতরে বিশেষ কৌশলে ৪ হাজার ২৫০ পিস ইয়াবা বহন করছিলেন বলে বিজিবি জানিয়েছে। একই অভিযানে আরও দুই নারীকে শরীরে লুকানো ৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক করা হয়।
শুধু মাদক নয়, সীমান্ত দিয়ে অন্যান্য পণ্য পাচারের চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। ৮ জুলাই উখিয়ার পালংখালী এলাকায় পৃথক দুই অভিযানে ২২ বস্তা ইউরিয়া সার ও পাচারে ব্যবহৃত একটি ইজিবাইক উদ্ধার করে ৬৪ বিজিবি। বিজিবির ভাষ্য, সারগুলো বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে মজুদ করে রাখা হয়েছিল।
এছাড়া ৬ জুলাই শীলখালী চেকপোস্টে একটি সিএনজি তল্লাশি করে ৬০ লিটার বাংলা মদ উদ্ধার এবং চালক মনসুর আলমকে আটক করা হয়। অপরদিকে ৩৪ বিজিবির পৃথক আরেক অভিযানে আরও ৩ দশমিক ৫ লিটার বাংলা মদ উদ্ধার করা হয়েছে।
কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। বিজিবি শুধু সীমান্ত পাহারায় নয়, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধেও সমানভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের পরও অধিকাংশ ঘটনায় পাচারকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় সীমান্তজুড়ে সক্রিয় সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্রের নেটওয়ার্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, টানা বর্ষণ ও প্রতিকূল আবহাওয়াকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। ফলে শুধু মাদক বা চোরাই পণ্য উদ্ধার করলেই হবে না, বরং এসব চক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালান অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।