কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা ভূমি অফিসকে ঘিরে দালালচক্র ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, সাধারণ মানুষের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ভূমি অফিসটি এখন একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে নামজারি, খতিয়ান উত্তোলন, সৃজিত বিএস খতিয়ান তৈরি, জমির খাজনা পরিশোধসহ ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত হয়রানি, দুর্ভোগ ও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের শিকার হতে হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসব অনিয়মের মূল নিয়ন্ত্রক ও সিন্ডিকেটের রক্ষাকারীর ভূমিকা পালন করছেন। বিশেষ করে সদ্য বদলি হওয়া সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর দায়িত্বকালীন বিগত দেড় বছরে উখিয়া ভূমি অফিসে অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছিল বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই সময়ে অফিসটি ছিল দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক “অভয়ারণ্য”।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উখিয়া ভূমি অফিসে টাকা ছাড়া কোনো কাজই এগোয় না। প্রতিটি ফাইল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, অনিয়ম ও দালাল নির্ভরতা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। বিশেষ করে সৃজিত বিএস খতিয়ান তৈরির ক্ষেত্রে সরেজমিন তদন্ত ছাড়াই, দখল শর্ত যাচাই না করে এবং জমির পূর্ব মালিকানার ইতিহাস পর্যালোচনা ব্যতিরেকেই টাকার বিনিময়ে খতিয়ান সৃষ্টির অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সৃজিত খতিয়ানের বিপরীতে একাধিক বিএস খতিয়ান তৈরির মতো গুরুতর অনিয়মও ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সচেতন মহলের দাবি, এসব অনিয়মের কারণে প্রকৃত জমির মালিকরা যেমন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তেমনি ভবিষ্যতে ভূমি বিরোধ ও আইনি জটিলতার আশঙ্কাও বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজরে আনা হলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা আরও বেড়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করার পরও দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হয়। পরে দালাল, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার মাধ্যমে যোগাযোগ করলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়। এতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করছেন এবং ন্যায্য আইনি অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অফিসে কর্মরত বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। সদ্য যোগদান করা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর আচরণ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকে। তাদের দাবি, সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার আচরণে ঔদ্ধত্য ও অবহেলার প্রকাশ পাওয়া যায়, যা একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর উখিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে সুশাসন ও স্বচ্ছতা ফিরবে বলে আশা করেছিলেন স্থানীয় জনগণ। তবে বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। স্থানীয়দের ভাষ্য, ভালো কর্মকর্তা এলেও দুর্নীতিবাজ দালালচক্র ও অসাধু কর্মকর্তাদের কারণে ইতিবাচক পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে উখিয়া ভূমি অফিস আবারও পুরনো অনিয়ম ও দুর্নীতির চক্রে ফিরে গেছে।
স্থানীয়দের মতে, এখানে শীর্ষ কর্মকর্তাদের চেয়ে দালাল সিন্ডিকেট ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপট বেশি। ফলে পুরো কার্যক্রম অনেকটাই দালালনির্ভর হয়ে পড়েছে। একসময় বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে উখিয়া উপজেলা ভূমি অফিস প্রায়ই গণমাধ্যমের শিরোনাম হতো। পরে কিছু সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তার তদারকিতে অফিসের পরিবেশ ও কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও পুরোপুরি কমেনি দুর্নীতি ও বহিরাগত দালালদের তৎপরতা। অভিযোগ রয়েছে, শীর্ষ কর্মকর্তাদের অগোচরেই অফিসের বিভিন্ন টেবিলে চলছে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেন।
সরেজমিনে ভূমি অফিসে গিয়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাম প্রস্তাব, সার্ভে রিপোর্ট, দাখিলা, নামজারি, ডিসিআর সংগ্রহ, খাজনা দাখিল, খতিয়ান ইস্যুসহ প্রায় প্রতিটি কাজে সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত ২০ থেকে ৩০ গুণ পর্যন্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ আদায়ের সঙ্গে সহকারী কমিশনার, কানুনগো, তহসিলদার, অফিস সহকারী, পিয়ন ও বহিরাগত দালালচক্রের সদস্যরা জড়িত।
আরও অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে মামলার তদন্ত রিপোর্ট পর্যন্ত বদলে ফেলা হয়। পরিচ্ছন্ন কর্মী, ঝাড়ুদার, নাইট গার্ড ও কম্পিউটার অপারেটরদের বিরুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ফাইলপত্র বাইরে নিয়ে গিয়ে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এতে ভূমি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নামজারি ও খতিয়ান ইস্যুর সরকারি অনলাইন ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা হলেও বাস্তবে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময় এক মাস হলেও অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১১ মাস পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধারণ মানুষকে সঠিকভাবে কথা বলার সুযোগ পর্যন্ত দেন না। অধিকাংশ কাজই সরাসরি চিহ্নিত দালালদের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। সময়ক্ষেপণের জন্য সেবাগ্রহীতাদের বলা হয়, “ফাইল এসিল্যান্ড স্যারের কাছে আছে, স্যার সহজে ছাড়ছেন না।” পরে এই অজুহাত দেখিয়ে দালাল ও বহিরাগতরা অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভূমি অফিসের সঙ্গে জড়িত এক দালাল জানান, সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের বড় অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন টেবিলে দিতে হয়। তিনি বলেন, “আমরা না থাকলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ত। কারণ টাকা ছাড়া এখানে কোনো কাজ হয় না। নির্ধারিত টাকা না দিলে আমাদেরকেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না।”
এদিকে সরকার ভূমি সেবা ডিজিটালাইজেশন, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠনের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও উখিয়ায় তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের মতে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চলে আসছে।
সচেতন মহল বলছে, ভূমি অফিসে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। পাশাপাশি ভূমিদস্যুদের অপতৎপরতাও বৃদ্ধি পাবে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।