এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ::
অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যা মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামি ও বরখাস্ত হওয়া টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপের সহযোগীরা জনপ্রতিনিধি হতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দায়িত্ব পালনকালে ওসি প্রদীপকে অবৈধভাবে যারা সহযোগিতা করেছিল, তাদের কেউ কেউ এখন চেয়ারম্যান-মেম্বার পদপ্রার্থী। মুখোশধারী মাদক কারবারি ওই প্রার্থীদের জমাকৃত আবেদন বাতিল ঘোষণার দাবিতে মানববন্ধন করেছে টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সংগঠন চিটাগাং ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস এ্যাসোসিয়েশন অব টেকনাফ (চুসাট)।
সূত্র জানায়, মাদকের বিরুদ্ধে সরকার যুদ্ধ ঘোষণা করার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাদকের চালান এনেছে কতিপয় জনপ্রতিনিধি ও সাবেক ওসি প্রদীপের সহযোগী মাদক কারবারি। তারা সাবেক ওসি প্রদীপকে অবৈধ টাকা কামাই করার লক্ষ্যে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছে। গুণকীর্তন করে ওসি প্রদীপকে ফলাওভাবে প্রচারও করেছে। তারাই মাদকের টাকার জোরে চেয়ারম্যান-মেম্বার পদপ্রার্থী হচ্ছে দেখে ফুঁসে উঠেছে টেকনাফের শিক্ষিত ও যুবসমাজ। ওই সব ইয়াবা কারবারিকে মার্কায় ভোট প্রদান না করার শপথ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন টেকনাফের শিক্ষিত সমাজ। টেকনাফ উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়ার আবেদনপত্র খারিজ করার আহ্বান জানিয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করেছে চুসাট। পাশাপাশি তাদের প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে টেকনাফ উপজেলা শহীদ মিনার চত্বরে মানববন্ধন কর্মসূচীও পালন করেছে ছাত্র, যুবসমাজ ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। শুক্রবার সকালে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে চুসাটের সভাপতি সাধারণ সম্পাদকসহ বর্তমান ও সাবেক নেতৃবৃন্দ, সদস্যরাসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সচেতন শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষিত যুবকরা বলেন, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া মাদক রোধ করা মোটেও সম্ভব নয়। তাই প্রশাসনিকভাবে স্থানীয় প্রতিবাদী যুবকদের সহযোগিতা দেয়া প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানববন্ধন থেকে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মাদকসংশ্লিষ্টদের প্রার্থিতা বাতিলের দাবির পাশাপাশি টেকনাফে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ডাক দেন চুসাটের সভাপতি সাইফুল্লাহ মানছুর। আসন্ন ইউপি নির্বাচনে মাদক কারবারিদের সামগ্রিকভাবে বয়কট করার জন্য টেকনাফবাসীকে আহ্বান জানান তিনি। চুসাটের সাবেক সভাপতি রবিউল আলম রবি তার বক্তৃতায় প্রশাসনকে শক্ত হাতে মাদক কারবারিদের প্রতিরোধ এবং তাদের নির্বাচনে কোনভাবেই যেন প্রার্থী হতে দেয়া না হয়, এ ব্যাপারে জোরালো আবেদন জানান। সংক্ষিপ্ত মানববন্ধন ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচী শেষে চুসাটের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে উপস্থিত ছাত্রসমাজ, উপজেলা নির্বাচন অফিসার ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে মাদকসংশ্লিষ্টদের প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে টেকনাফের সচেতন সমাজ, সম্মিলিত সামাজিক সংগঠন ও আপামর জনসাধারণের পক্ষ হয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সক্রিয় একাধিক সিন্ডিকেট
সংবাদদাতা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে জানান, সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে নির্বিঘ্নে চলছে মাদক কারবার। সীমান্ত দিয়ে চরবাগডাঙ্গায় ইয়াবার বড় বড় চালান প্রবেশ করছে। এরপর পাচারকারিরা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ ইউনিয়নটিতে সক্রিয় অর্ধশতাধিক মাদক কারবারি। মদদদাতাও রয়েছে একাধিক। রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আশপাশে থাকা সোর্সরাও মাদক কারবারে যুক্ত। স্থানীয়রা বলছেন, এলাকার জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের অনেকের আশপাশেই দেখা যায় এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারিদের। মাদক কারবারিদের একেকটি গ্রুপের নেতৃত্ব¡ দিচ্ছেন একেকজন জনপ্রতিনিধি ও নেতা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, চরবাগডাঙ্গায় মাদকের বিরুদ্ধে যখনই ব্যবস্থা নিতে যায়, জনপ্রতিনিধি ও নেতারা ফোন করে কখনও কখনো সরাসরি ঘটনাস্থলে এসে তদবির করেন। জনপ্রতিনিধির তদবির না শুনলে নানাভাবে হেনস্তা হতে হয়। এসব কারণেই চরবাগডাঙ্গায় মাদকের কারবার চললেও সেভাবে অভিযান চালানো যাচ্ছে না। তারা বলছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে যেসব মাদক উদ্ধার করা হচ্ছে, সেগুলো আসছে ভারতীয় সীমান্তপথে। ভারত সীমান্ত দিয়ে মাদকের চালান চরবাগডাঙ্গায় প্রবেশ করছে, এরপর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দিচ্ছে পাচারকারীরা। সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, ভারত থেকে আসা ইয়াবা চরবাগডাঙ্গা থেকে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছে। তবে নির্দিষ্ট কোন স্পটে মাদকের লেনদেন হচ্ছে না। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্পটে মাদক হাতবদল করছেন কারবারিরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ক্রেতা সেজে অধিকাংশ মাদক উদ্ধার করছে। এতে মাদক বহনকারিরা গ্রেফতার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে মাদকের গডফাদাররা।
এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চরবাগডাঙ্গার অনেকেই মাদকের কারবারে জড়িত। মাদকের কারবার করে হঠাৎ করেই আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে অনেকের। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চরবাগডাঙ্গা মিজানুর রহমান, নুরুল ইসলাম, তাসু, আসাদুল, সামসুল, সাইফুল, সানা, সাদ্দাম, পাতান আলী, আলমগীর, হাবিবুর, শরিফুল, হাসিব, রুহুল দাপটের সঙ্গে মাদক কারবার চালাচ্ছেন।
এদের মধ্যে পাতান, সামসুল আর সাদ্দাম মাদক মামলায় কারাগারে আছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই মাদক কারবারিদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। আর এদের অধিকাংশ পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্সরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সোর্সরা মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করছেন। আবার অধিকাংশ সোর্স সরাসরি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের নামে কয়েকটি করে মাদক মামলাও রয়েছে। তারা অনায়াসে আসল হেরোইনের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সোর্সরা মাদকাসক্তদের টার্গেট করে লোভ দেখিয়ে হেরোইনসদৃশ মেডি দিয়ে ধরিয়ে দিচ্ছে। সোর্সরা নিজেদের নাম গোপন করে প্রতিপক্ষের নাম ব্যবহার করছে। ফলে ধরা পড়ার পরে তারা ছদ্মনামই বলছে এতে ফেঁসে যাচ্ছে অন্যরা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর চাঁপাইনবাবগঞ্জ কার্যালয়ের পরিদর্শক রায়হান আহমেদ খান বলেন, কোন মাদক কারবারি ছাড় পাবে না। চরবাগডাঙ্গা থেকেও একাধিক মাদক কারবারি গ্রেফতার করা হয়েছে। সুত্র : জনকন্ঠ