উখিয়ার পার্শ্ববর্তী ঘুমধুম–রেজু আমতলী সড়কের পাশে গড়ে ওঠা একাধিক ইটভাটায় ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে সরেজমিন অনুসন্ধানে। এসব অনিয়মের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে সাংবাদিকদের একটি টিমকে প্রকাশ্য দিবালোকে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। ভাড়াটে কয়েকজন যুবক সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেয় এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে এক যুবক হুমকি দিয়ে সরে পড়ে। পরে সেখানে দায়িত্বরত এক ব্যক্তি জানান, ইটভাটার মালিক কুতুপালং এলাকার প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি হেলাল উদ্দিন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এই ইটভাটাগুলো পরিবেশ ধ্বংস, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, টিনের চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাঠ, কৃষিজমি ও পাহাড় কেটে আনা মাটি। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, বন আইন এবং ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন—সবকিছুকে উপেক্ষা করেই চলছে অবৈধ উৎপাদন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এসব ইটভাটার চারপাশে ঘন বসতি, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ ও মকতব রয়েছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ধোঁয়া, ছাই ও বিষাক্ত গ্যাসের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, বায়ু দূষণের কারণে শিশুদের শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ বাড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক ও এক মকতব শিক্ষক বলেন, স্বাস্থ্যসম্মত আধুনিক ইটভাটা হলে তাদের আপত্তি নেই, কিন্তু বসতিপূর্ণ এলাকায় বিষ ছড়িয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধীরে ধীরে অসুস্থ করে তোলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অতিমুনাফার লোভে সমাজ ও পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে, অথচ কেউ কথা বলার সাহস পাচ্ছে না।
আইন অনুযায়ী, বসতিপূর্ণ এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ইটভাটা পরিচালনার সুযোগ নেই। আধুনিক জিগজ্যাগ বা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করে, কৃষিজমি ও পাহাড় রক্ষা করে, নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে ইটভাটা স্থাপন করাই আইনের বাধ্যবাধকতা। অথচ এখানে তার কোনোটি মানা হচ্ছে না।
ইট, কাঠ ও মাটি বহনকারী ভারী যানবাহনের দাপটে গ্রামীণ সড়কগুলো বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত সড়ক এখন ইটভাটা মালিকদের অবাধ ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত। স্থানীয় জনগণের চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
এই বিষয়ে জানতে ইটভাটার মালিক জনপ্রতিনিধি হেলাল উদ্দিনের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
[caption id="attachment_174369" align="alignnone" width="300"]
ভিডিও ধারণ করতে গেলে সাংবাদিকদের একটি টিমকে প্রকাশ্য দিবালোকে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলার হুমকি দেয় লাল গেঞ্জি পড়া এই যুবক[/caption]
প্রশ্ন উঠেছে, এসব অবৈধ ইটভাটা কি প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই চলছে? যদি না চলে, তবে এতদিনে কেন কোনো কার্যকর অভিযান হয়নি? পরিবেশ অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের দায়িত্বের জায়গায় কোথায় গাফিলতি? নাকি দায়িত্বহীনতার আড়ালে রয়েছে অদৃশ্য সমঝোতা?
রাষ্ট্র যদি সত্যিই পরিবেশ, শিশু ও জনস্বার্থ রক্ষায় আন্তরিক হয়, তবে অবিলম্বে এসব অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ করতে হবে। দায়ী মালিক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় জনগণের কাছে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এই ইটভাটাগুলো শুধু পরিবেশ ধ্বংস করছে না, তারা আইনের শাসনের কবর রচনা করছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।