কক্সবাজারে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার।
রোববার (৫ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। ঢাকা থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে টিকাদান কার্যক্রম উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সরকারের পাইলট প্রকল্পের আওতায় হামের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে কক্সবাজারের রামু ও মহেশখালী উপজেলায় মোট ১ লাখ ২০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হবে।
প্রাথমিকভাবে কক্সবাজারের রামু ও মহেশখালী উপজেলায় টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে যাদের এ মুহূর্তে জ্বর আছে, তাদের সুস্থ হওয়ার পর টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার সবসময় শিশু সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। কক্সবাজারে হামের প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হওয়ার পরপরই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে আক্রান্ত এলাকায় সক্রিয় অনুসন্ধান, সংক্রমিত শিশুদের দুই ডোজ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল, টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা উন্নয়ন। এ ছাড়া কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ইউনিসেফের সহযোগিতায় ৮ শয্যার হাম ওয়ার্ডকে ২০ শয্যায় উন্নীত করায় দেশব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বি, ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীর, পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমানসহ ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে শিশুদের টিকা দেওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হয়।
ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীর জানান, প্রথম ধাপে অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে মহেশখালীর ৫টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এবং রামুর ৪টি ইউনিয়নে এই টিকাদান কার্যক্রম চলবে। প্রথম দিনে মহেশখালীতে ৪ হাজার ২৩০ এবং রামুতে ২ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে টিকা পেয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন শিশুদের অভিভাবকরা। তারা জানান, হামের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এই উদ্যোগ তাদের স্বস্তি দিয়েছে।
টিকা নিতে আসা ১৩ মাস বয়সি শিশু সামিউল হকের বাবা সানাউল হক বলেন, হামের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা শঙ্কায় ছিলাম। এখন যেহেতু টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তাই হাম থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে বলে মনে করছি। সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই।
সাত মাস বয়সি শিশু সাজ্জাদ ইসলাম সাগরের মা ফাহিমা রোকসানা শিউলি বলেন, কক্সবাজারের পাহাড়তলী থেকে আমার বাচ্চাকে টিকা দিতে নিয়ে এসেছি। হাম রোগ হবে মনে করে খুব ভয়ে ছিলাম। এখন টিকা দিতে পেরে কিছুটা নিশ্চিন্ত হলাম।
কক্সবাজারে সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের এ উদ্যোগকে সংশ্লিষ্ট সকলেই সময়োপযোগী ও জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, কক্সবাজারে শনিবার এক দিনেই হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয় ২৫ শিশু। বর্তমানে জেলা সদর হাসপাতালে রোগী ভর্তি আছে ৪২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় রামুতে রাজিয়া নামে এক শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। জেলায় এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে রামুতে দুই এবং মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও সদর উপজেলায় একটি করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সদর হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আছে ৭৫ শিশু। জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ২৫। গত এক সপ্তাহে জেলায় হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১৩২।
এ ছাড়া ১ জানুয়ারি থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত জেলা সদর হাসপাতালে মোট ৯৩ শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। জেলায় এই সময়ে হাম-রুবেলায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৮৫ জন।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, জেলার কয়েকটি এলাকায় সংক্রামক এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোনো শিশু আক্রান্ত হয়নি। হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া এলাকায় জরিপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শহিদুল আলম বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে পৃথক ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’ চালু করা হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের সেবায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।