
কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার চৌধুরীপাড়া এলাকায় বড় একটি জমির ওপর একতলা টিনশেডের একটি বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন আবদুর রহমান বদি।
বড় বড় গাছে ছায়াঘেরা, চারদিক ঘেরা সীমানাপ্রাচীর বিশিষ্ট ওই প্রাঙ্গণে একটি বিশাল আমগাছের সঙ্গে কাঠের একটি ঘর নির্মাণ করা হয়। নিজের প্রিয় এই ট্রি হাউসের নাম তিনি দিয়েছিলেন "কেউ কারো নয়"। এই ট্রি হাউস ছিল তার গর্বের জায়গা। বিশেষ অতিথি ও ভিআইপিদের তিনি সেখানে ঘুরে দেখাতে নিয়ে যেতেন।
ওই ৬৭ শতক জমির ভেতরেই রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র। বিদ্যালয়টির নাম রাখা হয়েছে তার চাচা হাজী শাহজাহান ইসলামের নামে।
তার পৈতৃক বাড়িও ওই সম্পত্তির ঠিক পাশেই অবস্থিত।
এটি এই ত্রিমাত্রিক গল্পের একটি দিক।
গল্পের আরেকটি মাত্রা হলো, ভূমি অফিসের নথি অনুযায়ী, এই ৬৭ শতক জমির মালিক বাংলাদেশ সরকার।
১৯৭৬ সালের একটি সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে, জমিটির মালিক ছিলেন নক্সমথ ও চিলথো (পিতা: অং থোয়াই) এবং কেমরাউ অং (পিতা: চা থাও)। তাদের ঠিকানার স্থানে লেখা রয়েছে "বার্মা (মিয়ানমার)"।
নথিতে জমির অবস্থান অর্পিত ও অনাবাসী সম্পত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট কমিটির তত্ত্বাবধানে ছিল।
ভূমি অফিসের সূত্র জানায়, ১৯৯০ সালের পর পরিচালিত এক জরিপে জমিটি সরকারি খাস জমি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।
এদিকে, আয়েশা বেগম দাবি করেন, "আমার বাবা-মা ১৯৮০ সালের আগে চট্টগ্রামে চলে গেলেও আমরা চৌধুরীপাড়ার বাড়িতে পারিবারিক অনুষ্ঠান ও ঈদের সময় একত্রিত হতাম।"
তিনি বলেন, "আমার শ্বশুরবাড়িও ছিল বাবার বাড়ির কাছেই। আমার ছয় বোন, এক ভাই এবং বাবা-মা—সবাই ২০০৯ সালে বাবা জহির আহমেদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতি ঈদে ওই বাড়িতে আসতেন।"
আয়েশা বলেন, "পরের বছরই আমরা পুরো ৬৭ শতক জমির দখল হারাই।"
আয়েশা বেগম টেকনাফ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর একরামুল হকের স্ত্রী।
সাবেক টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি একরামুল হক, যিনি 'একরাম কমিশনার' নামে পরিচিত ছিলেন, ২০১৮ সালের ২৬ মে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।
তবে নিহত হওয়ার ঠিক আগে স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে কথোপকথনের অডিও প্রকাশিত হলে তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
আয়েশা বেগমের ভাষ্য, "বাবা হাজী জহির আহমেদের মৃত্যুর এক বছর পর, ২০১০ সালে আমাদের বাড়িতে থাকা আত্মীয়দের উচ্ছেদ করা হয়।"
তিনি অভিযোগ করেন, "পরে আবদুর রহমান বদি আমাদের বাড়ি দখল করে, পুরোনো ঘর ভেঙে নতুন টিনশেড নির্মাণ করেন এবং ওই ট্রি হাউস তৈরি করেন।"
এটি এই গল্পের তৃতীয় ও শেষ মাত্রা।
জহির আহমেদের ছেলে ও আয়েশা বেগমের ভাই দিন মোহাম্মদ বলেন, "চার কক্ষের টিনশেড বাড়িটি এবং সেই বিশাল আমগাছ—যার ওপর এখন কাঠের ঘরটি নির্মিত—এসবের সঙ্গে আমাদের অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে।"
একটি দলিলের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালে তার বাবা জহির আহমেদ টেকনাফ মৌজার ৫৪৭ নম্বর খতিয়ানের অধীনে আরএস দাগ নম্বর ১১৫২, ১২০৯, ১২৩৬, ১২৬০, ১২৭৭, ১৩৩৩, ১৪৬৩, ১৩৭৮ এবং আরএস দাগ নম্বর ৫৭০৮, ৫৭১১, ৫৭০৭, ৫৭১০, ৫৭১৫, ৫৭০৯, ৫৭০৬, ৫৭১২, ৫৭১৯ ও ৫৭২০-এর আওতাভুক্ত ৬৭ শতক জমি ক্রয় করেন।
দলিল অনুযায়ী, তিনি এলাকার নয়জন রাখাইন বাসিন্দার কাছ থেকে জমিটি কিনেছিলেন।
দিন মোহাম্মদ বলেন, "১৯৭১ সালের আগে বাবা সেখানে একটি টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। আমি ১৯৮০ সালে জন্মানোর আগেই বাবা-মা চট্টগ্রামে চলে যান। এরপরও আমরা প্রতি ঈদে ওই বাড়িতে যেতাম এবং ২০০৯ সালে বাবার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই ঈদ উদযাপন করতাম।"
তিনি আরও বলেন, "বাবার মৃত্যুর পর ২০১০ সালের এক রাতে ডাকাতরা পেছনের সীমানাপ্রাচীর ও ঘরের দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ে। তারা আমার ফুফু (বাবার বোন) ও তার পরিবারকে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেয়। ভয়ে তারা পরদিন সকালে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এরপর বদি বাড়িটি দখল করে নেন।"
দিন মোহাম্মদের দাবি, সরকার জমিটিকে অর্পিত সম্পত্তি ঘোষণা করার বিরুদ্ধে তার বাবা আদালতে মামলা করেছিলেন এবং সেই মামলাটি এখনও কক্সবাজারের একটি আদালতে বিচারাধীন।
তিনি আরও বলেন, "বাড়ি দখলের পর বদি আমাকে সেখানে ডেকে নিয়ে ১৮ লাখ টাকা দেন, যদিও সম্পত্তিটির মূল্য আট কোটির টাকার কম নয়।"
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বদি তাকে বলেছিলেন, "তোমাকে কোথাও সই করতে হবে না। টাকা নিয়ে বাড়ির কথা ভুলে যাও।"
দিন মোহাম্মদের দাবি, পরে বদি তাদের সব জমির কাগজপত্র নিয়ে নেন এবং কক্সবাজার আদালতে চলমান মামলার দায়িত্বও নিজের হাতে তুলে নেন।
তিনি বলেন, "তিনি চাইলে আমাদের কাছ থেকে জমিটি কিনতে পারতেন। আমরা স্বেচ্ছায় তাকে বিক্রি করতাম। কিন্তু তিনি যেভাবে আমাদের সঙ্গে আচরণ করেছেন, তা অন্যায়। তার বাবা-মা এবং তার সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল।"
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, "টেকনাফে সরকারের অনেক খাস জমি রয়েছে। এর মধ্যে কিছু জমি আদালতে মামলা চলমান থাকায় বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে রয়েছে।"
কক্সবাজার অতিরিক্ত আদালত-১-এর সূত্র জানায়, সরকার ও জহির আহমেদের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি-সংক্রান্ত মামলাটি এখনও বিচারাধীন।
মামলায় সরকারের পক্ষে আইনজীবী (গভর্নমেন্ট প্লিডার) অ্যাডভোকেট শামসুল হুদা বলেন, "জমিটিকে অর্পিত সম্পত্তি ঘোষণা করা হলে দখলদার পক্ষ সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরে ২০১৪ সালে তারা ডিক্রি পায়। এর বিরুদ্ধে সরকার একটি মিস আপিল দায়ের করে।"
তথ্য সূত্র : বে ইনসাইট