
অনলাইনে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে কক্সবাজারে ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল ২৫০ থেকে ৩০০ চীনা নাগরিক। মেরিন ড্রাইভ সড়কের আশপাশে বেশ কয়েকটি রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে সেখানে তারা গড়ে তোলে অনলাইনভিত্তিক অপরাধ কর্মকাণ্ডের আস্তানা।
প্রেপ্তারের পর পুলিশের অনুসন্ধানে চক্রটির চাঞ্চল্যকর কর্মকাণ্ডের তথ্য উঠে আসে। পুলিশ বলছে, চক্রটি অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, অনলাইন জুয়া, ক্যাসিনো পরিচালনা, ভুয়া ট্রেডিং সাইট চালানো এবং হ্যাকিংয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিল।
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে চীনারা কেন? : রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় এ ধরনের একাধিক প্রতারকচক্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর ব্যাপক অভিযান শুরু হলে চক্রটির সদস্যরা প্রথমে চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায় ঘাঁটি গড়ে তোলার চেষ্টা করে। তবে সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তৎপরতা বেশি থাকায় কক্সবাজারকে তারা নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নেয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কোন ধরনের রোহিঙ্গাদের টার্গেট করা হয়েছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা জানান, ক্যাম্পে বসবাসকারী যে রোহিঙ্গারা বাড়তি আয়ের আশায় অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত, তাদের টার্গেট করা হয়েছিল।
উখিয়া, রামু ও কক্সবাজার শহরের ছয়টি রিসোর্ট ও হোটেলে ঘাঁটি গড়েছিল চীনা চক্রটি।
সরেজমিনে যা দেখা গেছে : সরেজমিনে সেখানে গিয়াস উদ্দিন নামের এক যুবকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, মাসিক ৬০ হাজার টাকা বেতনে ওই ভবনে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করতেন তিনি। ভবনের সব বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপনের দায়িত্ব ছিল তাঁর। গিয়াসের ভাষ্য, সেখানে অবস্থান করা চীনা নাগরিকদের প্রত্যেকের কাছে দুটি আইফোন ও একটি ল্যাপটপ ছিল। তারা সেখানে কী ধরনের কাজ করত, তা জানার সুযোগ ছিল না। এমনকি নির্দিষ্ট কিছু কক্ষে প্রবেশও নিষেধ ছিল।
তিনি আরো জানান, ভবনের প্রতিটি কক্ষ সাউন্ডপ্রুফ করা হয়েছিল, যাতে ভেতরের কোনো শব্দ বাইরে না যায়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সেখানে স্থাপন করা হয়েছিল কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে দুটি জেনারেটর। গিয়াসের ধারণা, ইলিয়াস ব্রাদার্সে অবস্থান করা চক্রটি মূলত হ্যাকিংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল। তারা বিভিন্ন ব্যক্তির আইডি হ্যাক করে অর্থ আদায় করত।
গতকাল শনিবার দিনভর কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, সবগুলো রিসোর্টের প্রধান ফটক বন্ধ। ভেতরে চীনাদের দেখভাল করার কাজে নিয়োজিত পাহারাদাররা দায়িত্ব পালন করছেন। ইলিয়াস ব্রাদার্স রিসোর্টের ম্যানেজার পাভেল আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি শাহজাহান ও আকতার কামালের নিয়োজিত কর্মী। হোটেলের নিরাপত্তাসহ সবকিছু আমাকে দেখতে হয়। অন্য রিসোর্টেও একই ব্যবস্থা।’
জানা গেছে, ইলিয়াস ব্রাদার্স রিসোর্টের ভবনটি সব সময় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে থাকত। পুলিশ অভিযান চালানোর সময় অনেকে বাউন্ডারি টপকে পালিয়ে যায়। চীনা চক্রের সদস্যরা নিজেদের খাবার তৈরি করতে চীন থেকে বাবুর্চি নিয়ে এসেছিল। তারা খুব একটা বাইরে বের হতো না।
চীনা নাগরিকদের স্টার লিংক ব্যবহার : কক্সবাজার শহরসহ রামু ও উখিয়ার ছয়টি রিসোর্টে চীনারা আস্তানা গড়েছিল। এর মধ্যে উখিয়া উপজেলার তিনটি—অর্কিড ব্লু, ড্রিম হলিডে ও ইলিয়াস ব্রাদার্স। রামুর মেরিনা বিচ রিসোর্ট, কক্সবাজার শহরের সি প্যালেস ও ফ্যালকন রিসোর্ট। এ জন্য রিসোর্টগুলোতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। পুলিশের দায়ের করা মামলার তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টে সাউন্ডগ্রুফ ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছিল। তারা দেশীয় কোনো ইন্টারনেট লাইন ব্যবহার করত না; ব্যবহার করত স্টার লিংক। চীনাদের ভাড়া করা রিসোর্টে ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরি নেওয়া গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘অন্যান্য ইন্টারনেট সার্ভিসের গতি কম, এ জন্যই তারা স্টার লিংক ব্যবহার করত।’
চীনাদের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় সিন্ডিকেট : স্থানীয়ভাবে চীনাদের ফরমায়েশি কাজে জড়িত ছিলেন তিনজন। তাঁরা হচ্ছেন রামুর হিমছড়ি এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজাহান, আকতার কামাল ও মেরিনা রিসোর্টের মালিক আবু সোয়েব ক্যাসন। চীনারা ইংরেজি বলতে না পারায় এই তিনজনের সঙ্গে ছিল বাংলা ও চীনা ভাষার অ্যাপস। বাংলায় বললে চীনা ভাষায় রূপান্তরিত হতো, একইভাবে চীনা ভাষায় বললে বাংলায় রূপান্তরিত হতো।
রিসোর্ট ভাড়া করা হয়েছিল তিন বছরের জন্য : চীনারা মেরিন রিসোর্টটি ভাড়া নিয়েছিল তিন বছরের চুক্তিতে। টানা তিন বছর মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টে চীনারা কেন অবস্থান করতে চাইছিল তা জানা সম্ভব হয়নি। কয়েক দিন আগে মেরিনা রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রিসোটর্টির পাতায় দেওয়া স্ট্যাটাসে এমন ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে, তাদের রিসোর্টটি আগামী তিন বছরের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
চীনাদের পরিচয় ছিল ‘নির্মাণ সংস্থার কাজে জড়িত’ : পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে আটক চীনা নাগরিকদের কক্সবাজারে অবস্থানের উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের কেউ কেউ নির্মাণ সংস্থায় কাজের জন্য বাংলাদেশে এসেছে বলে দাবি করলেও বর্তমানে কক্সবাজারে ওই পরিমাণ বড় কোনো নির্মাণকাজ চলমান নেই, যেখানে এত বিপুল চীনা নাগরিকের প্রয়োজন। ফলে তাদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
প্রশংসা কুড়াচ্ছে জেলা পুলিশের অভিযান : অনলাইন জুয়াসহ অনলাইনে বিভিন্ন অপরাধকাজে যুক্ত আন্তর্জাতিক চক্রের একটি বড় দলকে শনাক্ত করে কক্সবাজার জেলা পুলিশের পরিচালিত অভিযান বেশ প্রশংসিত হচ্ছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এম এ মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলা পুলিশ অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। এ জন্য পুলিশ প্রশংসার দাবি রাখে।’
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গোপন সূত্রে খবর পেয়ে মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টগুলোতে নজরদারি করছিলাম। চীনা নাগরিকরা অবৈধভাবে অবস্থান করছে, বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তারপর অভিযান চালাই। এর আগে চীন দূতাবাসেরও সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। ঘটনার ব্যাপারে রামু থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। সুত্র, কালেরকন্ঠ