কক্সবাজারের উখিয়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে সার ও বীজ বিতরণকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপকারভোগী নির্বাচনে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব, নিম্নমানের কৃষি উপকরণ বিতরণ, প্রণোদনার নামে অর্থ আদায় এবং উপকারভোগীদের তালিকা প্রকাশে অনীহাসহ একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
বৃহস্পতিবার উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় রবি (উফশী) ও খরিপ-২ মৌসুমের বীজ, চারা, রাসায়নিক সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস সরকারের সভাপতিত্বে এবং উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বেনজির আহমেদের সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও কৃষকেরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, সরকার প্রকৃত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের হাতে কৃষি প্রণোদনা পৌঁছে দিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিতরণে কোনো অনিয়ম বা কৃষি উপকরণ পাচারের তথ্য পাওয়া গেলে প্রশাসনকে জানাতে তিনি আহ্বান জানান।
স্থানীয় একাধিক কৃষকের অভিযোগ, প্রকৃত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি, তাদের স্বজন এবং রাজনৈতিকভাবে সুপারিশপ্রাপ্তদের উপকারভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত অনেক প্রকৃত কৃষক এবার সরকারি প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও দাবি তাদের।
কয়েকজন কৃষক বিতরণ করা সার ও বীজের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, নিম্নমানের কৃষি উপকরণ বিতরণ করায় কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া নিয়ে তারা শঙ্কিত।
এ ছাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস সরকার ও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বেনজির আহমেদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতায় প্রণোদনার নামে জনপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। তবে অভিযোগের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের দুই হাজার কৃষককে এ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতি ইউনিয়ন থেকে ৪০০ জন করে কৃষক নির্বাচন করা হয়েছে। প্রত্যেক উপকারভোগীকে ১০ কেজি ডিএপি সার, ১০ কেজি এমওপি (পটাশ) সার এবং ৫ কেজি আমন ধানের বীজ দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া ৫০ জন কৃষককে মরিচের বীজ, ৫৫০ জনকে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষের জন্য বীজ, সার ও বালাইনাশক দেওয়া হবে। পাশাপাশি ৯৪০ জন কৃষকের মধ্যে নারিকেল, আম, লিচু, কাঁঠাল, বাতাবি লেবু, আতা, মাল্টা, জলপাই, কদবেল ও আমলকীর চারা বিতরণ করা হবে। প্রতিজনকে পাঁচটি করে বাঁশের খুঁটি ও গোবর সারও দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে ৩ হাজার ৫৪০ জন কৃষক বিভিন্ন ধরনের কৃষি প্রণোদনার সুবিধা পাবেন।
এদিকে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের স্বার্থে উপকারভোগীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তা সরবরাহ করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। তালিকা প্রকাশ না করায় উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, সরকারি সুবিধাভোগীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা সহজেই যাচাই করা সম্ভব হতো।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস সরকার বলেন, “সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করেই প্রকৃত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। বিতরণ করা সব কৃষি উপকরণই মানসম্মত।”
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বেনজির আহমেদ প্রণোদনার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, “উপকারভোগীর তালিকা তৈরিতে কোনো রাজনৈতিক চাপ বা সুপারিশ ছিল না। তালিকা প্রস্তুতের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই পালন করেছেন।”
এ ঘটনায় স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল উপকারভোগীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, অর্থ আদায়ের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, কৃষকদের জন্য বরাদ্দ সরকারি প্রণোদনা বিতরণে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।