উখিয়ায় অন্ধকার নামলেই সক্রিয় ইয়াবা সিন্ডিকেট
কক্সবাজারের উখিয়ার গহিন অরণ্যঘেরা পূর্ব সীমান্ত জনপদ করইবনিয়া রাত নামলেই রূপ নেয় ইয়াবার বিশাল পাইকারি বাজারে। প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য, এ বাজারের নিয়ন্ত্রণকারীদের হাতেনাতে পাকড়াও করা। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত আসামি মোহাম্মদ ইকবাল ওরফে ‘ডাকাত ইকবাল’ এবং ‘বর্মায়া চেয়ারম্যান’ নুর হোসেনের প্রভাবের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিকল্পনা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে মিয়ানমার থেকে আসা বিপুল পরিমাণ ইয়াবা জব্দ হলেও মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রাজাপালং ও রত্নাপালং ইউনিয়নের করইবনিয়া সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী ইয়াবা করিডোর। অস্ত্রসজ্জিত পাহারায় ইকবাল সিন্ডিকেট এই করিডোর নিয়ন্ত্রণ করে। সীমান্ত পেরিয়ে করইবনিয়ায় পৌঁছানোর পর বসে প্রথম পাইকারি বাজার। সেখান থেকে ইয়াবা চলে যায় দরগারবিল হয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে, পরে ছোট-বড় ভাগে সেগুলো ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইকবালের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই মাদক বা অস্ত্র মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। রাজনৈতিক প্রভাব ও জনপ্রতিনিধির পরিচয় কাজে লাগিয়ে তিনি সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর পর্যন্ত ম্যানেজ করে পুরো কারবার চালাচ্ছেন। তার একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে এসব অপকর্ম চালালেও প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
জানা গেছে, গত ১৭ অক্টোবর আরাকান আর্মির কাছ থেকে প্রায় ১০০ কার্ড (১০ লাখ পিস) ইয়াবা করইবনিয়ায় ঢোকার কথা থাকলেও প্রথমে ২০ কার্ড (দুই লাখ পিস) পৌঁছে পাইকারি বাজার থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। এ ঘটনায় এলাকায় শুরু হয় ব্যাপক চাঞ্চল্য। পরে সন্দেহভাজন একলাছ নামে একজনকে ধরে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেয় ইকবাল। সাত দিন পর উখিয়া থানা পুলিশ পরিত্যক্ত অবস্থায় ৪ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে মামলা করে।
বিজিবির তথ্য বলছে, শুধু ২৮ অক্টোবর দরগারবিল কবরস্থান এলাকা থেকে ৩৪ বিজিবি উদ্ধার করেছে ৪ লাখ ইয়াবা। গত ছয় মাসে এই ব্যাটালিয়ন জব্দ করেছে মোট ১৩ লাখ ৪১ হাজার ইয়াবা।
ইয়াবা সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ইকবাল, রোহিঙ্গা মাহাদুর রহমান, নুর হোসেন (বর্মায়া চেয়ারম্যান) ও নুরুল আমিন ভুট্টু। বহনকারীদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ কামাল, জুহুরা বেগম, ফিরোজ আহমেদ, জুনায়েদসহ আরো অনেকেই। ইকবালের স্ত্রীও ৫০ হাজার ইয়াবা মামলার আসামি বলে জানা গেছে।
মূলত ইকবালের পরিচালিত ইয়াবা কারবারের মিয়ানমার–বাংলাদেশের অঘোষিত করিডোর নিয়ন্ত্রণ করেন রোহিঙ্গা মাহাদুর রহমান। ইকবালই তাকে বাংলাদেশি এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরি করে দিয়েছেন। ইয়াবা বিক্রির টাকা দিয়ে মাহদুর বিদেশ থেকে স্বর্ণের বার এনে দেশে পৌঁছে দেন এবং ইকবাল তা বিভিন্ন শহরে পাচার করেন, এমন অভিযোগও রয়েছে।
থানা সূত্র নিশ্চিত করেছে, ইকবালের নামে মোট ১৬টি মামলা রয়েছে, যার ১৪টিই মাদক মামলা।
জানা গেছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ৪২নং পিলার ঘেঁষা সোনাইছড়ি, বাইশফাঁড়ি, তুমব্রু, ঘুমধুম, আমগাছতলা, বালুখালী, থাইংখালী ও আনজুমানপাড়া দিয়ে ইকবাল সিন্ডিকেট ইয়াবার বড় বড় চালান দেশে আনে। রোহিঙ্গাদের মানুষ বন্ধক, নগদ টাকা এবং আরাকান আর্মিকে অস্ত্র দিয়ে করিম্যান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তারা গ্রামীণ সড়ক পথে ইয়াবা নিয়ে আসে করইবনিয়ায়, সেখান থেকে ছোট ছোট ভাগে তা ছড়িয়ে পড়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
এছাড়া মিয়ানমার থেকে মাছ ধরার নৌকায় ইয়াবা পাঠানো হয় টেকনাফ–খুরুশকুল–চৌফলদণ্ডি হয়ে মহেশখালী ও চট্টগ্রাম পর্যন্তও। সিন্ডিকেট এসব পথকে ‘নিরাপদ রুট’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
এক সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় ইয়াবা কারবার চললেও এখন ক্ষমতার পালাবদলে অন্য একটি দলের নেতাদের সহায়তায় ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে। গোপন সূত্রে জানা গেছে, ইয়াবার টাকায় ইকবাল কক্সবাজার ও উখিয়াকেন্দ্রিক দুটি অনলাইন পোর্টাল ও ফেসবুক পেজ পরিচালনা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা জাবের বলেন, তিনজন ইয়াবা গডফাদারের নেতৃত্বে অন্তত ২৫ জন সরাসরি পাচার কাজে জড়িত। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী মাহাদুর রহমান এখন মিয়ানমারে থাকলেও নিয়মিত বড় চালান পাঠাচ্ছে ইকবালের মাধ্যমে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, এখন এলাকায় থাকা দায় হয়ে গেছে। চারপাশে শুধু ইয়াবার গন্ধ। এ ইয়াবার কারণে নতুন প্রজন্ম অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। কোনো কথা বললেই মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়। রাতে অস্ত্রধারীদের পাহারায় চলে পাচার।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বর্মায়া চেয়ারম্যান নুর হোসেন বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে শুনেছি এলাকায় কিছু ইয়াবা ছিনতাই হয়েছে, তবে এগুলো কার ইয়াবা, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।
অভিযুক্ত মাদক কারবারি ইকবাল ওরফে ডাকাত ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে মাদক মামলার বিষয়টি স্বীকার করেন, তবে পরে অস্বীকার করেন। তিনি জানান, আমি এখন এলাকায় থাকি না; পরিবার নিয়ে নিয়মিত কক্সবাজারে বসবাস করছি। স্থানীয় কিছু মানুষ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এরপর তিনি একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার নাম উল্লেখ করে মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মীর শাহেদুল ইসলাম রোমান চৌধুরী বলেন, করইবনিয়া ও আশপাশের সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী চক্র ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে আসছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমরা বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়েছি। তবে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় চক্রটি আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাতেই কেবল এ মাদক সিন্ডিকেটকে দমন করা সম্ভব।
উখিয়া থানার ওসি জিয়াউল হক বলেন, কোনো মাদক কারবারিকে ছাড় দেওয়া হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত আসামিদের ওপর কঠোর নজরদারি চলছে। তাদের হাতেনাতে ধরতে পারলেই গডফাদারদের শনাক্ত সহজ হবে।
কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, পাচারকারীরা নতুন কৌশল ব্যবহার করলেও বিজিবি প্রতিটি তথ্য গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করছে এবং নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। মাদক নির্মূলে অভিযান অব্যাহত থাকবে।সুত্র,আমারদেশ