কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বাজার, স্টেশন এলাকা এবং কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশ দূষণ, দুর্গন্ধ এবং জনদুর্ভোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় প্রতিদিনের গৃহস্থালি ও বাজারের বর্জ্য রাস্তার পাশে, খোলা জায়গায় এবং বিভিন্ন জলাশয়ের ধারে ফেলে রাখার প্রবণতা বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানে উখিয়ায় আধুনিক ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে কুতুপালং হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত স্থান রবিবার (২ আগস্ট) পরিদর্শন করেন উখিয়া-টেকনাফের সংসদ সদস্য আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী এবং উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উখিয়ার পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে বাজার, সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশ এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ময়লার স্তূপ জমে থাকে। বর্ষা মৌসুমে এসব বর্জ্য নালা-নর্দমা দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে, আর শুষ্ক মৌসুমে দুর্গন্ধে সাধারণ মানুষের চলাচল দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন,বিভিন্ন বাসাবাড়ি, রাস্তা-ঘাট, কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের দুই পাশ, বাজার এবং স্কুল-কলেজে যাওয়ার পথজুড়ে ময়লার স্তূপ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একসময় উখিয়ার নির্মল বাতাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছিল আমাদের গর্ব, কিন্তু এখন সেই সোনালি দিনগুলো যেন শুধুই স্মৃতি।
কুতুপালং এলাকার বাসিন্দা মুজিব বলেন,
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিপুল পরিমাণ বর্জ্য বিভিন্ন সময় আশপাশের কৃষিজমি ও খালে-নালায় এসে পড়ে। এতে জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে, কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য আমরা সংসদ সদস্য আলহাজ শাহজাহান চৌধুরীর কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, উখিয়ার মতো সংবেদনশীল এলাকায় কেবল একটি ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা। গৃহস্থালি, বাজার ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার উৎপাদন এবং অবশিষ্ট বর্জ্য পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে উৎপন্ন বর্জ্য যাতে কোনোভাবেই স্থানীয় কৃষিজমি, খাল-বিল বা বসতিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। ক্যাম্পভিত্তিক বর্জ্য পৃথকীকরণ, নিরাপদ পরিবহন, আধুনিক ট্রিটমেন্ট ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও কৃষিজমি সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
এছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, বর্জ্য ফেলার নির্ধারিত স্থান নিশ্চিত করা এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অপরিকল্পিতভাবে ময়লা ফেলা বন্ধ করার দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
উখিয়ার মানুষ বিশ্বাস করেন, পরিকল্পিত ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুধু দুর্গন্ধ ও পরিবেশ দূষণই কমবে না; বরং কৃষিজমি, জনস্বাস্থ্য এবং প্রাকৃতিক পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে। একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য উখিয়া গড়ে তুলতে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, উন্নয়ন সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।