মুহিববুল্লাহ মুহিব ::
মাদককান্ডসহ নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত দেশের সর্বদক্ষিণের উপজেলা টেকনাফ। সীমান্ত উপজেলা হওয়ায় মাদক ও চোরাকারবারিদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে। অবৈধ টাকার প্রভাবে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কমিটিতে ঢুকে পড়ছে মাদক কারবারিরা।
এতোকিছুর মাঝে গেল বছরের ১৩ এপ্রিল ঘোষণা করা হয় টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি। যেখানে সভাপতি করা হয় সাবেক কমিটির সাধারন সম্পাদক সাইফুল ইসলাম মুন্না ও সাধারন সম্পাদক করা হয় নুরুল মোস্তফা নামে একজনকে। এ কমিটি ঘোষণার পর পরই বেরিয়ে আসে সাধারন সম্পাদক পূর্বে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পদ বঞ্চিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন হিসেবে ধরে নেয়া হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে। আর সংগঠন যারা করেন তাদের যৌবনের প্রথম প্রেম, প্রেরণার উচ্ছ¡াস, গৌরবের সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগ ছড়িয়ে গেছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। সেই সংগঠনের নেতা নির্বাচনে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুললেও জেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক মারুফ আদনানের প্রশ্রয়ে বহাল থাকেন নুরুল মোস্তফা। মূলত তার বলয়ে থাকতে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগ উঠেছে অনেক আগেই। একের পর এক অভিযোগ আসলেও কোন ব্যবস্থায় নেয়নি জেলা ছাত্রলীগ।
কমিটি ঘোষণার পর থেকে বিপত্তি বাঁধে সম্পাদক নূরুল মোস্তফাকে নিয়ে। জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী ও বিএনপির নেতা কর্মীদের সাথে নূরুল মোস্তফাসহ সৌজন্য সাক্ষাতের কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তার সূত্র ধরে তৃনমূল নেতাকর্মী ও সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে নুরুল মোস্তফার পরিচয় এবং নেতৃত্বে আসার বিষয় নিয়ে সৃষ্টি হয় নানা প্রশ্ন। টেকনাফ ছাত্রলীগের কোন অনুষ্ঠান বা প্রোগ্রামে না থাকা নুরুল মোস্তফা যখন কমিটির সাধারন সম্পাদক করা হয় তখনি বিতর্কও শুরু।
সেই বিতর্কের শেষ না হতেই নতুন করে আবারও বিতর্কিত কর্মকান্ডে পা দিয়েছেন নুরুল মোস্তফা। এবার মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গ্রামবাসীর উপর হামলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নুুরুল মোস্তফাসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মামলাও হয়েছে।
চলতি বছরের ৮ এপ্রিল কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাইকে ঘোষণা দিয়ে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলায় উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল মোস্তফাসহ ২৮ জন আসামি করা হয়েছে।
১০ এপ্রিল হ্নীলার মৌলভীবাজার নাইক্ষংখালী এলাকার অলি আহমদের ছেলে বেলাল উদ্দীন বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান মামলা রেকর্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার এজাহারে অভিযোগ আনা হয়েছে, গত শুক্রবার (৮ এপ্রিল) সন্ধ্যায় লাঠি, দা ও ছুরি নিয়ে বাদীর ভাতিজা সাইফুল ইসলামের ওপর হামলা চালায় আসামিরা। ভাতিজাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে বেলাল উদ্দীনকেও মারধর করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। একই সময়ে আসামিরা ইট-পাটকেল ছুড়ে স্থানীয় মসজিদের জানালাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালায়। সেই সঙ্গে গ্রামবাসীর ওপর হামলা করা হয়। যার নেতৃত্ব দেয় নুরুল মোস্তফা।
ওসি হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এজাহারটি প্রাথমিক তদন্ত করে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। মামলার আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
মামলার বিষয়ে জানতে টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল মোস্তফাকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি। অবশ্য সংঘর্ষের পর তিনি বলেছিলেন, ‘ঘটনাস্থলে পুলিশসহ আমরা
সবাই মিলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছি। উভয় পক্ষের লোকজন আমার পরিচিত ছিলেন। এ সময় কয়েকজন আহত হন।
ছাত্রদলের রাজনীতির বিষয়ে জানতে চাইলে নূরুল মোস্তফা ছবিগুলোকে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের বলে দাবি করেন।
কক্সবাজার ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য সায়েদ আমিন নিশান বলেন, ‘জীবনে কখনও ছাত্রলীগ করেনি, হঠাৎ ছাত্রদল থেকে এসে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছে। পদবি ব্যবহার করে বিভিন্ন বিতর্কিত কাজ করে ছাত্রলীগের মানসম্মান ক্ষুন্ন করছে নুরুল মোস্তফা। তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থার নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।
কানে হেডফোন দিয়ে রাস্তা পার হওয়া এক যাত্রীর গায়ে টমটমের ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে ঝগড়া শুরু হয়। এতে প্রভাব খাটাতে চেয়েছিলেন নুরুল মোস্তফার আত্মীয় সুলতান আজম এমনটা দাবি করেন ছাত্রলীগের এ নেতা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের আরও একাধিক নেতা জানান-তার বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ কেন্দ্রীয় ভাবে তদন্ত করা হোক। তদন্তে এসব অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হলে তাকে অভিনন্দন। যদি সত্য প্রমাণিত হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হোক। একই সাথে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মারুফকে নুরুল মোস্তফার বিরুদ্ধে অবস্থান না নেয়ার জন্য উপজেলা ছাত্রলীগ নেতাদের নিষেধ করা বন্ধ করতে কেন্দ্রীয ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষন করেন।
কক্সবাজার ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মঈন উদ্দিনের কাছে প্রশ্ন করা হয় আর কত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বিতর্কিত এই সাধারন সম্পাদকের বিরুদ্ধে। জবাবে তিনি জানান, বার বার নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়াচ্ছেন নুুরল মোস্তফা এটি ছাত্রলীগের জন্য সুখকর নয়। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারন সম্পাদক তার বিরুদ্ধে হয়তো ব্যবস্থা নেবেন।
ব্যবস্থা নেয়ার মতো কিছুই হয়নি বলে সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে জেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক মারুফ আদনান বলেন, মামলা হয়েছে শুনার পর ওসির কাছ থেকে বিস্তারিত জেনেছি। তিনি বিষয়টি তদন্ত করছে বলে দাবি করেন। অভ্যন্তরীন কোন্দলে নুরুল মোস্তফাকে আসামী করা হয়েছে বলেও দাবি করেন।
কমিটি এক বছরের মধ্যে পুর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়ার কথা ছিল তার কি অবস্থা জানতে চাইলে সাধারন সম্পাদক বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে হয়তো পুর্ণাঙ্গ কমিটি দেযা সম্ভব হয়নি।
বিতর্কিত নুুরুল মোস্তফা আগে টেকনাফ উপজেলা বা জেলা ছাত্রলীদের কোন সদস্য বা পদে ছিলেন কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, সে কোন কমিটিতে ছিল না। তার বয়স তখন খুব কম। সে একজন ত্যাগী কর্মী। টেকনাফে মাদক কারবারিদের মন মতো কমিটি না পাওয়ায় বিতর্কেও জন্ম দিচ্ছে তারা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এস এম সাদ্দাম হোসেন বলেন, অভিযোগের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা জেলার নেতৃবৃন্দ বসে একটি সিদ্ধান্ত দ্রæত পৌছাবো। তবে কমিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে সেবিষয়ে কিছু বলতে চাননি সভাপতি।