ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ০৬/০৪/২০২৬ ১০:১৬ এএম

বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে একটি অদ্ভুত বাস্তবতা বহু বছর ধরে নীরবে বহমান রয়েছে। এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্মদিন একই দিনে, ১ জানুয়ারি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি অনেক সময় হাস্যরসের জন্ম দিলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে পরিচয় হারানোর গভীর বেদনা।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জাতিসংঘের শরণার্থী নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সময় তাড়াহুড়া ও তথ্যের ঘাটতির কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার জন্মতারিখ হিসেবে ১ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে শিবিরে বসবাসরত প্রায় ৬৭ শতাংশ রোহিঙ্গার সরকারি নথিতে এই একই জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে।

নিবন্ধনের তাড়াহুড়ায় তৈরি ‘এক দিনের জন্ম’

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভিযান, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের মুখে লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। হঠাৎ এই বিপুল জনস্রোত সামাল দিতে গিয়ে জাতিসংঘের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা।

অনেক শরণার্থী নিজেদের সঠিক জন্মতারিখ জানাতে পারেননি, আবার অনেক ক্ষেত্রে সময়ের চাপেই তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে একটি ‘ডিফল্ট’ তারিখ হিসেবে ১ জানুয়ারি ব্যবহার করা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখিত একজন সাবেক নিবন্ধনকর্মীর ভাষায়, “তখন মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া, যেখানে সঠিক তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না।”

হাসির আড়ালে বিষণ্ণতা

শিবিরের বাসিন্দাদের জন্য ১ জানুয়ারি একদিকে যেমন ‘সম্মিলিত জন্মদিন’, অন্যদিকে এটি তাদের হারানো পরিচয়ের প্রতীক।

ক্যাম্প-৭–এর বাসিন্দা মোহাম্মদ ফারুক জানান, তার প্রকৃত জন্মদিন সেপ্টেম্বর মাসে হলেও সরকারি কাগজে ১ জানুয়ারি। প্রতি বছর এই দিনে একসঙ্গে শত শত মানুষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, যা কখনো হাস্যরসের জন্ম দনত। তিনি মন্তব্য করেন, “এক কিলোমিটার জুড়ে কেক লাগবে”।

কিন্তু বাস্তবে এটি তাদের জন্য কষ্টের। “এই তারিখটা দেখলে মনে হয় আমি কেউ নই”, বলেন তিনি।

পরিচয়পত্র: অস্তিত্বের শেষ প্রমাণ

রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গাদের জন্য একটি কাগজের পরিচয়পত্রই এখন অস্তিত্বের শেষ চিহ্ন। অনেকেই এই নথি প্লাস্টিকে মুড়িয়ে রাখেন বা বালিশের নিচে সংরক্ষণ করেন।

তবে ভুল তথ্যের কারণে এই নথিই কখনো হয়ে উঠছে নতুন সমস্যার কারণ।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এর কাছে ক্যাম্প-১২–এর বাসিন্দা মোহাম্মদ আনিস বলেন, চাকরির আবেদন থেকে শুরু করে সব জায়গায় তাকে ভুল জন্মতারিখ ব্যবহার করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশে আসার পর জাতিসংঘের কর্মীরা তার জন্মদিন জানতে চাননি। তিনি বলেন, “তারা শুধু জিজ্ঞেস করেছিল তোমার বয়স কত? আমি বলেছিলাম ১৭।”

এরপর তাকে ১ জানুয়ারি জন্মতারিখ দিয়ে একটি পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। নতুন আসা শরণার্থী হিসেবে তখন তিনি কোনো আপত্তি জানাতে সাহস পাননি।

তারপর থেকে এই ভুল জন্মতারিখ তাকে অনুসরণ করছে। সম্প্রতি চাকরির আবেদন করার সময়ও তাকে এই তারিখ ব্যবহার করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “তারিখটা ভুল, এটা আমাকে কষ্ট দেয়। একদিন হয়তো আমরা আমাদের আসল জন্মতারিখই ভুলে যাব।”

তথ্য সংশোধনের জটিলতা

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এর কাছে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা বলছে, শরণার্থীরা চাইলে তথ্য সংশোধন করতে পারেন।

কিন্তু বাস্তবে তা সহজ নয়।

প্রতিবেদনে শিবিরের এক নারী জানান, কয়েক মাস চেষ্টা করেও তিনি তার জন্ম তারিখ সংশোধন করতে পারেননি। প্রশাসনিক জটিলতা, প্রমাণের অভাব এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়া এই সংশোধনকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।

শুধু শিবির নয়, প্রবাসেও সমস্যা

এই ভুল তথ্যের প্রভাব শুধু শিবিরেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে পুনর্বাসিত রোহিঙ্গারাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

রোহিঙ্গা লেখক মাইয়্যু আলী দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, তার পরিবারের এক সদস্য কানাডায় গিয়েও জন্মতারিখ পরিবর্তন করতে পারেননি। ফলে নতুন জীবনেও বহন করতে হচ্ছে পুরোনো ভুল।

তিনি বলেন, “এই মুছে ফেলার নীতিগুলো আমাদের নতুন জীবনেও প্রভাব ফেলে।”

ফেরার অনিশ্চয়তা, পরিচয়ের সংকট

রোহিঙ্গাদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে যদি কখনো মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ হয়, এই ভুল তথ্য তাদের জন্য আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।

কারণ তাদের শরণার্থী কার্ডের তথ্য মিয়ানমারের পুরোনো নথির সঙ্গে মিলবে না।

তবে বাস্তবতা হলো, ফেরার সম্ভাবনাই এখন অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্রিয়।

জন্মদিন নয়, প্রয়োজন নিজের মাটি

অনেকের কাছে তাই জন্মদিন এখন আর আনন্দের বিষয় নয়।

রোহিঙ্গা ফটোগ্রাফার রহিম উল্লাহর ভাষায়, “যতদিন নিজের কোনো মাটি না থাকবে, ততদিন কোনো জন্মদিন উদযাপন করতে চাই না।”

১ জানুয়ারি, বিশ্বের অনেকের কাছে নতুন বছরের শুরু। কিন্তু কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে এটি হয়ে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া পরিচয়ের এক নীরব প্রতীক।

হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই গল্প মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্রহীনতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু ভৌগোলিক নয়, বরং ব্যক্তিগত অস্তিত্ব ও পরিচয়ের গভীর ক্ষয়। সুত্র, বে ইনসাইট

পাঠকের মতামত

 

দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিএনপি জনগণের সরকার, সবসময় জনগণের পাশে আছে এবং থাকবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ...

রাজাপালং ভেঙে হচ্ছে ‘উয়ালাপালং’ ইউনিয়ন, গণশুনানির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়ন বিভক্ত করে ‘উয়ালাপালং’ নামে নতুন একটি ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে ...

টেকনাফে ইউনিয়ন বিভক্তি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি; নেতৃত্বের দ্বন্ধে বাড়বে জন ভোগান্তি

কক্সবাজারের টেকনাফে নতুনভাবে কয়েকটি ইউনিয়ন করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানাগেছে। নাগরিক সেবা ত্বরান্বিত করতে উপজেলার ...

কক্সবাজারে বন্যা কবলিত বন্ধুর খোঁজ নিতে যাচ্ছিলেন, পথে প্রাণ গেল বন্ধুর

কক্সবাজারের পেকুয়ায় বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত বন্ধুর খোঁজ নিতে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মো. মানিক উদ্দিন নাহিদ ...

কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগিয়ে ইয়াবা পাচার, আটক ৩

মাদক পাচারে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগিয়ে সন্দেহ এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল ...