প্রকাশিত: ২৭/০২/২০১৭ ৯:৩৬ এএম

নিউজ ডেস্ক::
ফরিদপুর জেলার সদর উপজেলার দশ হাজার গ্রামের বানা মোল্লার মেয়ে সুমা আক্তার। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) এলবি-১-২০১৫-০৫১১০৩১ নং ছাড়পত্র নিয়ে ভাগ্যবদলের আশায় গত বছর লেবাননে যান। এর পর থেকে তার খোঁজ পাচ্ছে না পরিবার। ভাগ্য বদল নয়, এখন মেয়েকে জীবিত ফেরত পেতে প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করেছে তার পরিবার।

বরগুনা জেলার সদর উপজেলার ছোট লবণগোলা গ্রামের মো. শাহ আলম খানের স্ত্রী ছবি বেগম। বর্তমানে এই বাংলাদেশি কর্মী লেবাননের কারাগারে। পরিবারের অভিযোগ, সঠিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছিলেন রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে। কিন্তু পাসপোর্ট বদল করে অন্যের পাসপোর্টে তার স্ত্রীকে পাঠানোয় কারাবাস করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে লিখিতভাবে এর প্রতিকার চেয়েছেন শাহ আলম খান।

ফরিদপুরের সোহরাব খানের মেয়ে খাদিজা বেগম লেবাননে যাওয়ার পর অমানুষিক পরিশ্রম করে এখন মৃত্যুর মুখোমুখি। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহায়তা চাওয়া হয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে।

জেসমিন আক্তার। ১৬ বছর বয়স হলেও পাসপোর্টে ২৬ বছর বয়স দেখিয়ে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে লেবাননে কাজ নিয়ে গিয়েছিলেন। মধ্যরাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হতো তাকে। না পারলে চলত শারীরিক নির্যাতন। পরিবারের কারো সঙ্গে কথা বলার সুযোগ ছিল না তার। একসময় এক ব্যক্তি তার দুর্ভোগের কথা শুনে ভালো একটি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেও ছিল এক দুর্বৃত্ত। গণধর্ষণের শিকার হতে হয় মেয়েটিকে।

বেবি বেগম (পাসপোর্ট নম্বর এফ ০৭৩৫০৫২)। লেবাননে কাজ করতে গিয়ে একপর্যায়ে হৃদরোগের শিকার হয়ে মৃতপ্রায়। বেবির পরিবারও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ও চিকিৎসার জন্য সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে। শুধু ছবি, সুমি, জেসমিন বা বেবিই নন, এমন হাজারো বাংলাদেশি নারী জীবিকার তাগিদে লেবাননে গিয়ে এখন মান-সম্ভ্রম খুইয়ে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন সরকারের কাছে। ২০১৬ সালে লেবাননে কাজ নিয়ে দেশ ছেড়েছেন ১৫ হাজার ৯৫ জন নারী। বর্তমানে লেবাননে ১ লাখ ২ হাজার ৫৬৫ জন বাংলাদেশি নারী কাজ করছেন।

মিডিয়া ইনিশিয়েটিভ ফর পাবলিক পলিসি ও বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বমসা) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফলে বলা হয়, লেবাননে বাংলাদেশি ৮ শতাংশ নারীকর্মী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া ২৮ শতাংশ শারীরিক ও ১৫ শতাংশ মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এ জন্য তারা নিরাপত্তা চেয়েছেন।

প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের সহকারী পরিচালক জাহিদ আনোয়ার জানান, অভিযোগ পেলেই দ্রুত সমস্যা সমাধানে কাজ করা হচ্ছে। আগের চেয়ে এখনকার পরিস্থিতি ভালো।

বমসার পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম আমাদের সময়কে জানান, লেবাননে নারীরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। তাদের বাঁচাতে হলে অবশ্যই বিদেশে আমাদের দূতাবাসে ডেটাবেজ করতে হবে। প্রতিমাসে দূতাবাসের পক্ষ থেকে মোবাইল ফোনে প্রতিকর্মীর কুশল জানতে হবে। এর জন্য সরকারকে দূতাবাসপ্রতি বাড়তি টাকাও বরাদ্দ দিতে হবে। প্রতি ৩ মাস পর পর দূতাবাসের পক্ষ থেকে নারীকর্মীদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এনে তাদের সমস্যা শুনে ত্বরিত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

বিদেশে নারীশ্রমিকদের অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কাজ করে। তাদের পরিচালিত অন্য এক গবেষণা প্রতিবেদনেও ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) পরিচালিত ‘এক দশকে বাংলাদেশের নারী অভিবাসন : অর্জন, চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা’ শীর্ষক ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নারীকর্মীরা কাজ নিয়ে যেসব দেশে যাচ্ছেন সেখানে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তারা শিকার হচ্ছেন শারীরিক, যৌন এবং মৌখিক নির্যাতনের। অনেকে কাজের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত বেতন পাচ্ছেন না। আবার অনেকে বিনা বেতনেই কাজ করে যাচ্ছেন মাসের পর মাস। নির্যাতিত নারীশ্রমিকদের একটি বড় অংশ স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন।

গবেষণায় দেখা যায়, ভিকটিম ২৬৪ জন নারীকর্মীর মধ্যে ৩১ দশমিক ৩৩ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যৌন নির্যাতনের শিকার ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ, মৌখিক নির্যাতনের শিকার ৩ দশমিক ২১ শতাংশ। এ ছাড়া ১৫ দশমিক ২৬ শতাংশ বেতন পাননি এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছেন ৪৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে, কর্মীদের ৬৬ দশমিক ৯০ শতাংশ বিবাহিত এবং ৯ শতাংশ অবিবাহিত। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে ধারাবাহিকভাবে।

পাঠকের মতামত