
মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগর এলাকার জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলেদের কাছ থেকে অবৈধ মাসোহারা আদায়ে অলিখিত ‘চুক্তি’ চাপিয়ে দিতে চাইছে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। জেলেরা তা মানতে অস্বীকৃতি জানালে অপহরণের মতো ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। কখনও কখনও গুলি চালানো হচ্ছে।
গত ২৮ মার্চও তিনটি মাছ ধরার নৌকা লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। পরে অস্ত্রের মুখে ১৪ জেলেকে অপহরণ করা হয়। এতে সীমান্তবর্তী জেলেপল্লিতে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে জীবিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। যদিও তিন দিন পর দুই লাখ টাকার মুক্তিপণে এই ১৪ জেলে নিজেদের প্রচেষ্টায় শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে গত মঙ্গলবার রাতে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিম সৈকতে এসে পৌঁছেন। তবে কেউ মুক্তিপণের বিষয়টি স্বীকার করেননি।
সীমান্তের বন্দর ব্যবসায়ী ও জেলেরা জানান, এর আগেও আরাকান আর্মি মিয়ানমার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পর গত বছর জানুয়ারির মাঝামাঝি টেকনাফ স্থলবন্দর ও সীমান্ত বাণিজ্যে পণ্যবাহী জাহাজ থেকে কমিশন দাবি করেছিল। তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সে সময় মিয়ানমার ইয়াংগুন থেকে আসা পণ্যবাহী তিনটি জাহাজ আটকে রেখে ১৬ দিন পর ছেড়ে দেয়। ওই ঘটনার কিছু দিন পর থেকে সীমান্ত বাণিজ্য কার্যক্রম প্রায় ১১ মাস বন্ধ। এতে সরকার প্রায় ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নতুন করে এবার জেলেদের লক্ষ্য করে ‘চুক্তি’ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
জেলেপল্লিতে আতঙ্ক
টেকনাফ পৌর শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে শাহপরীর দ্বীপ। সেখানকার অধিকাংশ মানুষ জেলে। নাফ নদ ও সাগরে মাছ ধরে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। শাহপরীর দ্বীপে আছে ছয়টি জেলে ঘাট। সেখানে ছোট-বড় সাতশ-আটশ মাছ ধরার নৌকা রয়েছে। তবে আরাকান আর্মির দাপটে এখন অনেক জেলে মাছ ধরতে যাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিমপাড়া ঘাটের বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুর বলেন, আরাকান আর্মির কারণে জীবিকা ও নিরাপত্তা দুটিই সংকটে। হাজারো জেলে পরিবারের জীবিকা এখন হুমকির মুখে। একদিকে অপহরণ ও গুলির ভয়, অন্যদিকে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় দিশেহারা তারা।
তিনি বলেন, নাফ নদের নাইক্ষ্যংদিয়া ও সেন্টমার্টিন থেকে আরাকান আর্মি অস্ত্রের মুখে জেলেদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ কিছু জেলে এক থেকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে ‘চুক্তি’ (পাস) করেছে। আরাকান আর্মির সদস্যরা চাইছে, বাকি জেলেরাও যাতে ‘চুক্তি’ করে। এ কারণেই চাপে ফেলতে অপহরণ ও গুলি চালানো হচ্ছে।
মুক্তিপণে ফিরেছেন ১৪ জেলে!
সর্বশেষ গত ২৮ মার্চ আরাকান আর্মির হাতে অপহৃত জেলে পরিবারের সদস্যদের প্রিয়জন ফেরার প্রতীক্ষার দিন শেষ হয়েছে। তারা স্থানীয় কিছু লোকজনের সহাতায় রাতের আঁধারে টেকনাফে ফিরেছেন। অভিযোগ উঠেছে, দুই লাখ টাকা মুক্তিপণে তারা ফিরে এসেছেন। তবে এ বিষয়ে কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
ফেরত আসা জেলে রহিম উল্লাহ বলেন, গুলি ছুড়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ব্যাপক মারধর করা হয়েছে, খাবারও দেওয়া হয়নি। পরে পরিবারের প্রচেষ্টায় আমরা ফিরে এসেছি।
এ বিষয়ে শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিমপাড়া জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুর বলেন, “রাতের আঁধারে জেলেরা ফিরে এসেছে। তবে তাদের মুক্তির পেছনে ‘টাকার লেনদেন’ রয়েছে-এতে কোনো সন্দেহ নেই।”
বন্দিদশা
গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে আরাকান আর্মি অন্তত ৫০০ জেলেকে অপহরণ করেছে। এর মধ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) প্রচেষ্টায় ৩০০ জেলেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিজিবির উদ্যোগে আরাকান আর্মির হেফাজত থেকে ৭৩ জেলেকে ফেরত আনা হয়।
জেলেদের ফেরত আনার চেষ্টা চলছে
টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, যেসব জেলে ওপারে আটকা আছে, তাদের ফেরত আনার চেষ্টা চলছে। কিছুদিন আগে ৭৩ জেলেকে ফেরত আনা গেছে। তবে কেউ যদি মাছ ধরার বিষয়ে ‘চুক্তি’ করে, সেটি পুরোপুরি অবৈধ। এর সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি জেলেরা যাতে মাছ শিকারের সময় সীমান্ত অতিক্রম না করে, সে জন্য সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে।
রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, কোনোভাবে যাতে জেলেরা সীমান্ত অতিক্রম না করে, সে জন্য বারবার সতর্ক করা হচ্ছে। পাশাপাশি আটক থাকা জেলেদের ফেরত আনার চেষ্টা চলছে। সুত্র,সমকাল

পাঠকের মতামত