
টেকনাফের নাম উঠলে যে শব্দটি সামনে আসে, তা হচ্ছে ‘ইয়াবা’। এই ইয়াবার সঙ্গে মিশে আছে এখানকার আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদি ও তাঁর পরিবারের নাম। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বদি কারাগারে। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পরও ইয়াবামুক্ত হতে পারেনি টেকনাফ।
এক পাশে সাগর, অন্য পাশে পাহাড়। মাঝখানে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ। ঝাউগাছ-পাহাড়-সমুদ্রের ঢেউ যতটা না মনোমুগ্ধকর, ভাঙাচোরা রাস্তা ততটাই বিরক্তির। মাঝে মাঝে আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশি চৌকি। সেই চৌকির অন্যতম কারণ ইয়াবা।
টেকনাফ ও উখিয়া নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-৪ সংসদীয় আসন। পুরো নির্বাচনী এলাকায় এখনও ঘুরেফিরে আলোচনায় মিয়ানমার থেকে চোরাই পথে আসা ভয়ংকর মাদক ইয়াবা। টেকনাফের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত ৩০ কিলোমিটার। আর উখিয়ার ৫০ কিলোমিটার। মৎস্য, কৃষি, লবণ চাষ এখানকার সাধারণ মানুষের মূল জীবিকা হলেও এসব দিয়ে এলাকার মানুষের যে ভাগ্যের উন্নতি হয়েছে, তা
বলা যাবে না। বরং ইয়াবা কারবার করে রাতারাতি ভাগ্য ফিরেছে অনেকের। অজপাড়াগাঁয়েও এখান চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন ফটকের ডুপ্লেক্স-ট্রিপ্লেক্স বাড়ি। দুয়েকটির বাড়ির সামনে বিলাসবহুল গাড়িও দেখা পায়। উখিয়ার চিত্রও প্রায় অভিন্ন।
ইয়াবার বিরুদ্ধে সোচ্চার নন প্রার্থীরা
এই আসনে চারটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও আলোচনায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই প্রার্থী। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন চারবারের এমপি শাহজাহান চৌধুরী। আর দাঁড়িপাল্লায় কক্সবাজার জেলা জামায়াতের আমির নূর আহমদ আনোয়ারী। নির্বাচনী প্রচারণা দেদার চালালেও ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে তাদের জোরালো বক্তব্য নেই।
টেকনাফের কায়ুকখালীপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক বলেন, এখানে ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের কেউ কথা বলে না। দুই দলই তাদের পাশে রাখতে চাইছে। এখানে ইয়াবা কারবারিরা যে দিকে ঝুঁকবে, তিনিই সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবেন।
ইয়াবা কারবারিদের গ্রাম হিসেবে পরিচিত টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মৌলভীপাড়ার বাসিন্দা লবণচাষি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মৌলভীপাড়ায় বিএনপির সমর্থক বেশি। এখানে ধানের শীষ সর্বোচ্চ ভোট পাবে।
একই পরিচয়ে পরিচিত পাশের গ্রাম নাজিরপাড়ার চিত্র সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউনূস বলেন, মৌলভীপাড়ায় বিএনপির ভোট বেশি হলেও নাজিরপাড়ায় জামায়াতের অবস্থান ভালো।
জামায়াতের প্রার্থী নূর আহমদ বলেন, মাদক কারবারির সঙ্গে জামায়াতের সম্পৃক্ততা নেই। তবে সাধারণ ভোটাররা আমাদের সঙ্গে আছে। আর উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা যে কিনা বদির ঘনিষ্ঠ, নৌকা প্রতীক নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিল, তাঁর পুরো পরিবার এখন বিএনপির হয়ে কাজ করছে। বদির ইয়াবা কারবারের ১৭ বছরের সহযোগী উখিয়ার একজন সাবেক চেয়ারম্যানও বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করছেন।
বিএনপি প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী বলেন, আমরা তো ক্ষমতায় না। মাদক চোরাচালানের বিষয়টি বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমরা কথা বলছি। মাদক এলাকা হওয়ায় দক্ষিণ সীমান্তের কিছু মাফিয়া জামায়াতের পক্ষে কাজ করছে। তিনি বলেন, জামায়াতের বেশি জনপ্রিয়তা আছে বলে মনে করি না। তারা টাকাপয়সা দিয়ে কিছু ভোট পেতে পারে। একদিকে তারা সৎ লোকের শাসন চাইছে, অন্যদিকে দুর্নীতি করে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে।
মিলেমিশে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই আসনে তিন দলের নেতাকর্মী সব সময় মিলেমিশে থাকেন। যে কারণে ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের দুয়েকজন শীর্ষ নেতা ছাড়া কাউকে এলাকা ছাড়তে হয়নি। লুটপাট, দখল-হামলারও বড় নজির নেই। এমনকি বদির ভাইরাও এখন এলাকায় যাতায়াত করছেন। আওয়ামী লীগের একাংশ প্রকাশ্যে যেমন বিএনপির পক্ষে ভোট চাইছে, তেমনি আরেক অংশ মিশেছে জামায়াতের সঙ্গে। আবার বিএনপি প্রার্থীর ভাই শাহজালাল চৌধুরী জেলা জামায়াতের আমির ছিলেন। আর শাহজালাল চৌধুরীর ছেলে হাসান পান্না ও পান্নার স্ত্রী সুফিয়া জাফর দানু ধানের শীষের পক্ষে মাঠে নেমেছেন।
সুফিয়া জাফর দানু টেকনাফ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জাফর আহমদের মেয়ে। উপজেলা যুবলীগের সভাপতি নুরুল আলমকে কৌশলে ফেল করিয়ে জাফর আহমদকে টেকনাফ উপজেলার চেয়ারম্যান বানিয়েছিলন বদি। আবার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হককে কৌশলে ফেল করিয়ে নূর আহমদকে বদি হোয়াইক্যং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বানিয়েছিলেন।
অভিযোগ আছে, নূর আহমদের সঙ্গেও বদির পুরোনো ঘনিষ্ঠতা। অবশ্য সমকালের কাছে নূর আহমদ দাবি করেন, বদি ছিলেন তখন এমপি। আমি ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর সঙ্গে যতটুকু সম্পর্ক রাখার দরকার ছিল, ততটুকুই রেখেছি। এর বাইরে কিছু না।
নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে কিছুটা শঙ্কা
গত বৃহস্পতিবার টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের আলীখালীস্থল রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে দুর্বৃত্তদের অতর্কিত গুলির ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনার পর নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের ধারণা, সীমান্তবর্তী ও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা ঘিরে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপকে ব্যবহার করে কোনো কোনো পক্ষ নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে, যা নির্বাচনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এমন বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা আরও কঠোর ও দৃশ্যমান হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারীদের চলাচল ও কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয়রা জানান, এখানে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা প্রধান দুই প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইছেন। উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যেই ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। আরেকটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নেমেছেন। এ কারণে ভোটের পরিবেশ ভালো বলে মনে করছেন খোদ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।
র্যাবের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়া টেকনাফ পৌর যুবলীগের সভাপতি একরামুল হকের ভাই পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এহতেশামুল হক বাহাদুর বলেন, এখানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা ভোট দিতে না গেলেও সাধারণ কর্মীরা কেন্দ্রে যাবেন। এখানে ভোটের পরিবেশ নিয়ে তেমন শঙ্কা নেই।
প্রশাসনের পক্ষে এই আসনের ১১৫ কেন্দ্রের মধ্যে ৪৯টিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার পরও সেখানে সমস্যা হবে না বলে মনে করছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, সব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ সদস্য নিয়োজিত থাকবে। এ ছাড়া সেন্টমার্টিনে নৌবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
আরও যারা প্রার্থী
বিএনপি-জামায়াত ছাড়াও এ আসনে আরও দুজন প্রার্থী আছেন। তারা হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা নুরুল হক ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাইফুদ্দিন খালেদ। এ আসনে ভোটার ৩ লাখ ৭১ হাজার ৮২৫ জন। পুরুষ ১ লাখ ৮৯ হাজার ২৬৮, নারী ১ লাখ ৮২ হাজার ৫৫১ আর তৃতীয় লিঙ্গের আছেন ছয়জন।
সুত্র,সমকাল


পাঠকের মতামত