
নির্বাচন ঘিরে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর মূলত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর ভেতরে সীমাবদ্ধ, তখন ক্যাম্পের বাইরে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ভাড়া বাসায় রোহিঙ্গাদের অবাধ অবস্থান নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ক্যাম্পের বাইরে গড়ে ওঠা এসব ‘ছায়া বসতি’ নির্বাচনকালীন নজরদারিতে বড় ধরনের ফাঁক তৈরি করছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উখিয়ার পালংখালী, রাজাপালং, হলদিয়াপালং ও জালিয়াপালং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এখনো বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা পরিবার ভাড়া বাসায় বসবাস করছে। দিনের বেলায় তাদের বাজার, সড়ক ও জনবহুল এলাকায় অবাধ চলাচল করতে দেখা যায়। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ভাষাগত মিল থাকায় অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনিক উদ্বেগ বাড়ছে। ক্যাম্প থেকে বের হয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন রোহিঙ্গা জানান, তারা নিয়মিত কাঁটাতারের বেড়া কেটে তৈরি করা গোপন পথ ব্যবহার করে বাইরে যাতায়াত করেন। ক্যাম্প-২ ব্লক-বি-এর বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক জানান, মূল গেট দিয়ে বের হওয়া কঠিন হওয়ায় কাটা বেড়ার পথ দিয়েই বাজারে যাতায়াত করেন। একই কথা বলেন কুতুপালং রেজিস্ট্রার ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইছহাক। স্থানীয়দের দাবি, কাঁটাতারের বেষ্টনির অন্তত ২০০টি স্থানে কেটে নিজেদের মতো করে গেট তৈরি করেছে রোহিঙ্গারা। এসব পথ ব্যবহার করে তারা ক্যাম্প ছেড়ে লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পরে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে। বালুখালী ক্যাম্প-৮-এর বাসিন্দা ইউসুফ বলেন, এপিবিএনের চেকপোস্ট এড়িয়ে কাটা বেড়ার দিক দিয়েই বের হয়েছি। সারাদিন উখিয়ার একটি গ্রামে কৃষিকাজ করে আবার ক্যাম্পে ফিরছি। এদিকে ক্যাম্পের বাইরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গাদের অবৈধ ভাড়া বাসার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুতুপালং এলাকায় কবির আহমদ শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবারকে বাসা ভাড়া দিয়েছেন। এ ছাড়া আরও অনেকেই বাসা ভাড়া দিয়েছেন। বালুখালী বাজার এলাকায় দিদার, বেদার উদ্দিন ও আজিজুল হক জুলু অন্তত ২০টির বেশি পরিবারকে ভাড়া দিয়েছেন। মরা গাছতলায় মনিয়ারের বাড়িতে ২০টি, আনোয়ারের বাড়িতে ৩০টি এবং ছগির আহমদের বাড়িতে ১৫টি রোহিঙ্গা পরিবার বসবাস করছে। এছাড়া কুতুপালং পশ্চিমপাড়া উত্তর মসজিদ সংলগ্ন বেশ কয়েকটি বাড়িতেও রয়েছে শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবার এসব আশ্রয়দাতা আওয়ামীলীগ, বিএনপিন ও জামায়াত নেতারা। এসব বাসা থেকে প্রতি মাসে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা ভাড়া ও মোটা অঙ্কের জামানত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব ভাড়া বাসা এখন ইয়াবা কারবারি, অপহরণকারী ও অপরাধী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। এতে করে সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি ডাক্তার মুজিব বলেন, গত আট বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও প্রত্যাবাসন করা হয়নি। ফলে তারা ক্যাম্প ছেড়ে লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, যা দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে থাকার কোনো অনুমতি নেই। বাসা ভাড়া দেয়া ও নেয়া দুটোই বেআইনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া আছে। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সবমিলিয়ে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচল ও অবৈধ বসবাস দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

পাঠকের মতামত