উখিয়া নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৮/০১/২০২৩ ১০:০৫ এএম

জসিম উদ্দিন,যুগান্তর::
কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখা এবং তোতার দ্বীয়া দ্বীপে জঙ্গি ঘাঁটি গড়ে ওঠার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া অভিযানের মুখে জঙ্গিরা পাহাড় ছেড়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় ও ঘাঁটি করার চেষ্টা করছে।

দ্বীন কায়েমের কথা বলে সাধারণ রোহিঙ্গাদের দলে ভেড়ানোরও কাজ করছে তারা। প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপ অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও রোহিঙ্গা বংশোদ্ভূত হাসানের নেতৃত্বে অন্তত ১৭ জন জঙ্গি গত ১৫ দিন ধরে শূন্যরেখায় একটি বাঙ্কারে সশস্ত্র অবস্থায় অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৪ জন লস্কর-ই-তৈয়বার সক্রিয় সদস্য। তাদের ভাড়ায় এনেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) আমির দাবি করা আতা উল্লাহ জুনুনি। আতা উল্লাহর ভাই শাহ আলীও পাকিস্তানে জঙ্গি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

অন্যদিকে আলোচিত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত সীমান্তের তোতার দ্বীয়া দ্বীপে আফগান ফেরত তালেবান যোদ্ধা ও রোহিঙ্গা বংশোদ্ভূত মৌলানা আবু জ্বরের নেতৃত্বে আরেকটি জঙ্গি গ্রুপ অবস্থান করছে। তারা কাজ করছে নবী হোসেনের পক্ষে। তোতার দ্বীয়ায় নবী গ্রুপের ইয়াবা প্যাকেটিংয়ের কাজ করে কয়েকশ রোহিঙ্গা। সম্প্রতি বিজিবিকে লক্ষ্য করে অন্তত ৩শ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে নবী বাহিনী। মাদক কারবার ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নবী বাহিনী ও আরসার মধ্যে প্রায়ই গোলাগুলি ও খুনাখুনির ঘটনা ঘটছে। দুটি গ্রুপের কাছে গ্রেনেডসহ ভারী অস্ত্র রয়েছে।

২৩ জানুয়ারি কক্সাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় গুলি বিনিময়ের পর জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার’ সামরিক শাখার প্রধান রণবীরসহ দুজনকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এরপর থেকে ক্যাম্প ঘিরে জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে উদ্বিগ্ন সরকার।

রোহিঙ্গাদের ওপর নজর রাখা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য আছে, লস্কর-ই-তৈয়বা থেকে রোহিঙ্গা বংশোদ্ভূত জঙ্গিদের ভাড়ায় এনে তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখা শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে আরসা। মূলত প্রতিপক্ষ নবী হোসেন বাহিনীকে ঘায়েল করা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিজদের শক্তি বৃদ্ধি করতে আরসা এসব জঙ্গিদের ব্যবহার করতে পারে। আর পালটা পদক্ষেপ হিসাবে আফগান ফেরত রোহিঙ্গা তালেবান যোদ্ধাদের ভাড়ায় দলে টানছে নবী বাহিনী।

এসব জঙ্গি যে কোনো সময় ক্যাম্প বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুটি গ্রুপের সঙ্গে দেশীয় কোন কোন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা রয়েছে, থাকলেও তারা কারা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। দুটি গ্রুপকেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী মদদ দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়াও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে একাধিকবার কারা ভোগ করা রোহিঙ্গা মৌলানা সালাহুলও ফের তৎপর হয়ে উঠেছেন বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। কক্সবাজারের লিংকরোড এলাকায় তার মাদ্রাসায় বিদেশি কিছু লোকজন আনাগোনা করছে বলে জানা গেছে।

শূন্যরেখায় জঙ্গি ঘাঁটির বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবানের পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বলেন, আরসা ও আরএসওর মধ্যে সংঘাতের বিষয়টি আমরা জানি। জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হচ্ছে। যদিও সীমান্তের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব বিজিবির।

এ বিষয়ে কক্সাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, দুই দেশের অংশ হওয়ার আন্তর্জাতিক আইনের কারণে শূন্যরেখা ও তোতার দ্বীপে বিজিবি চাইলেও অভিযান চালাতে পারে না। তবে, দেশের অভ্যন্তরে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘অভিযানের মুখে পাহাড় ছেড়ে জঙ্গিরা এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দিকে ছুটছে। সেখানে তারা জঙ্গি কর্মকাণ্ডে যোগ দেওয়ার জন্য সাধারণ রোহিঙ্গাদের উদ্বুদ্ধ করছে। এ ধরনের দুইজন জঙ্গিকে সম্প্রতি ক্যাম্প থেকে গ্রেফতার করেছি।’

লস্কর-ই-তৈয়বা ও আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে শূন্যরেখায় জঙ্গি ঘাঁটির বিষয়ে তিনি বলেন, সঠিক তথ্য পেলে জঙ্গিরা যত শক্তিশালী হোক না কেন র‌্যাব জীবন দিয়ে হলেও জঙ্গি দমনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বাংলাদেশের মাটিতে কোনো ধরনের জঙ্গি কার্যক্রম মেনে নেওয়া হবে না।

রোহিঙ্গা অধ্যুষিত উখিয়া পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটি মহাসচিব এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘এমনিতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন স্থানীয়রা। এরমধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্তে জঙ্গি আস্তানার খবর পেয়ে এখন আতঙ্কে তারা।’

ক্যাম্পে জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্যাম্পে মারামারি খুনোখুনির ঘটনা থাকলেও জঙ্গি তৎপরতা বা তাদের কোনো ঘাঁটি নেই। ক্যাম্পের বাইরে জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।’

বিজিবির সাবেক মহাপরিচালক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গারা শুধু জঙ্গি তৎপরতা নয়, দেশে ও এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে চরম মূল্য দিতে হবে জাতিকে।’

জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে। ক্যাম্প এলাকায় সাম্প্রতিক জঙ্গি আস্তানার সন্ধান তারই ইঙ্গিত বহন করে।

ক্যাম্প ঘুরে যাওয়া আফগানরা কারা? : অনুসন্ধানে জানা যায়, কয়েকজন ব্যক্তিগত বছরে ১৩ মে এবং ৮ জুন কক্সবাজারে বেস্ট ওয়েস্টার্ন হোটেলের রুম ভাড় নিয়ে থাকে। তাদের মধ্যে হোটেলে ওঠা ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন আফগান নাগারিক। রুম ভাড়া নেওয়া হয় এমডি তারিক এবং নাবিল নামে দুই ব্যক্তির নামে।

সূত্র বলছে, ওই আফগানরা উখিয়ার জামতলি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কিছুদিন অবস্থান করে। তারা তাবলিগ জামাত হিসাবে নিজদের পরিচয় দিত। গ্রুপটিতে অন্তত দুজন আফগান যোদ্ধা ছিল। যারা বিভিন্ন সময় কয়েকটি দেশে যুদ্ধ করেছে। তাদের মঙ্গে ছিল আফগান ফেরত তালেবান যোদ্ধা ও রোহিঙ্গা বংশোদ্ভূত মৌলানা আবু জ্বর। এখন ওই আবু জ্বরের নেত্বতে তোতার দ্বীপে জঙ্গি ঘাঁটি গড়ে তোলার তথ্য পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে বেস্ট ওয়েস্টার্নের ম্যানেজার জাহিদ যুগান্তরকে বলেন, তারা এনআইডি ও পাসপোর্ট দেখিয়ে হোটেলে উঠেছিলেন। কক্সবাজারে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা আসেন। এখানে কে আসছেন, তার পরিচয় কি এটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। সুত্র: যুগান্তর

পাঠকের মতামত

সীমান্তে কঠোর নজরদারি, এতো তেল মিয়ানমারে যাচ্ছে কীভাবে?

মিয়ানমারে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে আশঙ্কাজনক হারে পাচার হচ্ছে জ্বালানি তেলসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য। তবে সীমান্ত ...