উখিয়া নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০/০২/২০২৬ ৯:৩১ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনটি এবার পরিণত হয়েছে সম্মান, অভিজ্ঞতা ও নতুনত্বের এক জটিল লড়াইয়ে। ‘লক্ষ্মী আসন’ হিসেবে পরিচিত এই আসনে জেলা সভাপতি ও জেলা আমিরের মুখোমুখি অবস্থান নির্বাচনী রাজনীতিতে বাড়তি উত্তাপ ছড়িয়েছে।

বাংলাদেশের ৩০০ আসনের মধ্যে কক্সবাজার জেলার চারটি আসনের অন্যতম উখিয়া-টেকনাফ আসনটি ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাফ নদী, মায়ানমার সীমান্ত, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, মেরিন ড্রাইভ, পাহাড়ি অঞ্চল ও বিস্তীর্ণ লবণ মাঠের পাশাপাশি প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর উপস্থিতি এই আসনকে দেশের অন্যতম স্পর্শকাতর নির্বাচনী এলাকায় পরিণত করেছে।

এই আসনে হেভিওয়েট দুই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভোটের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক হুইপ ও চারবারের সংসদ সদস্য, কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী। তাঁর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে লড়ছেন চারবারের ইউপি চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারী।

উখিয়া-টেকনাফ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬৮৮ জন।

এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ৮০৩ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৬ জন। সংখ্যাগত দিক থেকে নারী ভোটার প্রায় পুরুষ ভোটারের সমান হওয়ায় ভোটের মাঠে নারীরাই হয়ে উঠেছেন বড় ফ্যাক্টর।
ভোটের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নির্বাচনী উত্তাপ। গ্রাম-গঞ্জ, চায়ের দোকান, হাটবাজার—সবখানেই চলছে ভোটের হিসাব-নিকাশ।

প্রার্থীরা পুরুষ ভোটারদের অবস্থান অনেকটাই অনুমান করতে পারলেও নারী ভোটারদের মন জয় করতেই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন।
এ লক্ষ্যে দুই প্রার্থীই দিচ্ছেন নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি—ফ্যামিলি কার্ড, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, এমনকি ধর্মীয় আবেগকে ঘিরে পরকালীন শান্তির আশ্বাসও উঠে আসছে প্রচারণায়, যা নিয়ে এলাকায় আলোচনা ও সমালোচনা দুটোই চলছে।

স্থানীয় বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও ভোট বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে এখনো বড় ফ্যাক্টর হয়ে আছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। তাঁদের ধারণা, আওয়ামী লীগের অধিকাংশ ভোট যেদিকে যাবে, সেদিকেই তৈরি হতে পারে বড় ভোটের ঢেউ। অভিজ্ঞতা ও অতীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে শাহজাহান চৌধুরী আপাতদৃষ্টিতে এগিয়ে থাকলেও সাংগঠনিক সক্রিয়তা ও নতুনত্বের কারণে অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারীর অবস্থানও বেশ শক্ত।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একটি বড় অংশের ইঙ্গিত বিএনপির দিকে থাকায় প্রাথমিক হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন শাহজাহান চৌধুরী। চারবারের সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর সময়ে স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে তিনি দীর্ঘদিনের একটি সুসংগঠিত ভোটব্যাংক গড়ে তুলেছেন।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ইউপি চেয়ারম্যান থাকার অভিজ্ঞতায় অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারীর রয়েছে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও তৃণমূল পর্যায়ে শক্ত যোগাযোগ। জেলা জামায়াতের আমির হিসেবে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মী কাঠামো এবং মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি তাঁকে ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থানে রেখেছে। বিশেষ করে কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও শেষ মুহূর্তের সংগঠিত প্রচারণায় জামায়াতের অভিজ্ঞতা এই আসনে আনোয়ারীর বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এসব কারণে আসনটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।

এ আসনের রাজনীতিতে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ফ্যাক্টর হয়ে আছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। নাফ নদীকেন্দ্রিক সীমান্ত বাণিজ্যে একসময় তাঁর ছিল ব্যাপক প্রভাব। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে, বিশেষ করে নারীদের মাঝে তাঁর জনপ্রিয়তা এখনো আলোচনায়।

আবদুর রহমান বদি বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন। তিনি নিজে দুইবার এবং তাঁর স্ত্রী শাহীন বদি দুইবার সংসদ সদস্য ছিলেন। বদির শ্যালক জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী ছিলেন উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে—বদি ও তাঁর পরিবারের সমর্থন যেদিকে যাবে, সেদিকেই ঝুঁকতে পারে বড় একটি ভোটব্যাংক।

রোহিঙ্গা সংকটও এই আসনের ভোটের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দীর্ঘদিন ধরে এই সংকটে জর্জরিত উখিয়া-টেকনাফের স্থায়ী বাসিন্দারা বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা তুলে ধরছেন। তাঁর দাবি, ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে সমস্যার সমাধান করেছিলেন। তিনি আরো বলেন, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার।

শাহজাহান চৌধুরীর নিজ ইউনিয়ন উখিয়ার রাজাপালংয়ে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৪৮ হাজার ৯৮১ জন, যা মোট ভোটারের দশ ভাগের এক ভাগেরও বেশি। এই বড় ভোটব্যাংক নির্বাচনী সমীকরণে তাঁকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

উখিয়া-টেকনাফকে দেশের ‘মাদকের স্বর্গরাজ্য’ বলেও অভিহিত করা হয়। এলাকায় রয়েছে ছোট-বড় একাধিক মাদক সিন্ডিকেট। স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন রয়েছে, মাদক কারবারিরা যাকে নিজেদের জন্য নিরাপদ মনে করবে, গোপনে তার পক্ষেই সক্রিয় হতে পারে—যা নির্বাচনের অদৃশ্য কিন্তু বাস্তব এক দিক হিসেবে আলোচিত।

সব মিলিয়ে ভৌগোলিক গুরুত্ব, রোহিঙ্গা সংকট, মাদক বাস্তবতা, নারী ভোটার, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক এবং হেভিওয়েট প্রার্থীদের সম্মানের লড়াই—সবকিছু মিলিয়ে কক্সবাজার-৪ আসনের ফলাফল নিয়ে তৈরি হয়েছে তুমুল কৌতূহল। শেষ পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফের ভোট কোন দিকে ঝুঁকবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সুত্র, কালের কন্ঠ

পাঠকের মতামত

 

কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীতকরণের উদ্যোগে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু

কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার লক্ষ্যে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ...

রোহিঙ্গা খাদ্য কর্মসূচিতে ডব্লিউএফপির চোখ ফাঁকি দিয়ে ‘মাঈশা এন্টারপ্রাইজ’ এর হরিলুট!

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রিত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে জেনারেল ফুড এসিস্ট্যান্ট (জিএফএ) কার্যক্রমের আওতায় মানবিক ...