অতিরিক্ত বোঝাইয়ে দুর্ঘটনার শঙ্কা, বনভূমিতে বাঁশ মজুতের অভিযোগ
উখিয়ার সড়কে ফের বাঁশবোঝাই ট্রাকের দৌরাত্ম্য


কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সড়কে আবারও অতিরিক্ত বাঁশবোঝাই ট্রাকের দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব ট্রাকে নির্ধারিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত বাঁশ পরিবহনের কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছেন পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের চালকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এসব যানবাহন।
মিয়ানমারে সহিংসতার মুখে ২০১৭ সালের আগস্টে বাস্তুচ্যুত হয়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার তাদের আশ্রয় দেওয়ার পর কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং থেকে টেকনাফ পর্যন্ত গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতি।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত মানুষের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহের পাশাপাশি ক্যাম্পের অবকাঠামোগত কাজে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাঁশ, গাছসহ নানা ধরনের মালামাল সরবরাহ করে আসছে। এসব মালামাল পরিবহনে ব্যবহৃত অতিরিক্ত বাঁশবোঝাই ট্রাক নিয়ে শুরু থেকেই রয়েছে নানা অভিযোগ।
২০১৭ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফ সড়কে অতিরিক্ত বাঁশবোঝাই ট্রাককে কেন্দ্র করে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি আহত হয়েছেন অনেকে।
২০১৮ সালের ১৬ জুলাই উখিয়ার কাস্টম ঘাট এলাকায় অতিরিক্ত বাঁশবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রাকে থাকা বাঁশের নিচে চাপা পড়ে রোহিঙ্গাসহ চারজন নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হন। ট্রাকের পাশ দিয়ে যাওয়া চারটি টমটম ও অটোরিকশার ওপর বাঁশ পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ট্রাকটি জব্দ করলেও চালক পালিয়ে যায়।
এরপর ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট সকালে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের উখিয়ার বালুখালী পানবাজার সংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত বাঁশবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে যায়। এতে হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও দীর্ঘ যানজট ও ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।
এত দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরও উখিয়া-টেকনাফ সড়কে অতিরিক্ত বাঁশবোঝাই ট্রাকের চলাচল বন্ধ হয়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে এসব ট্রাকের চলাচল আবারও বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
চলতি মাসের ১৯ তারিখেও অতিরিক্ত বাঁশবোঝাই একটি ট্রাকের কারণে অল্পের জন্য দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁশের বোঝা এতটাই অতিরিক্ত থাকে যে পাশ দিয়ে চলাচলকারী যানবাহন ও পথচারীদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়।
হাইওয়ে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত মালামাল বোঝাই করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যানবাহন চালানো দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। নির্ধারিত ওজন ও পরিবহন বিধিমালা না মেনে অতিরিক্ত লোড নিয়ে চলাচল করায় এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়তে পারে।
এ বিষয়ে শাহপুরী হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আদিল আকবর বলেন, হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ফারুক আহমেদ মৌখিকভাবে সারাদেশে ফোর-হুইলার যানবাহনের বিরুদ্ধে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মামলা না করার নির্দেশনা দিয়েছেন। ফলে আপাতত বাঁশবোঝাই গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দিতে পারছি না।
এদিকে, অতিরিক্ত বাঁশ পরিবহনের পেছনে একটি বাঁশ সিন্ডিকেটের সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ২০১৭ সাল থেকে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র অতিরিক্ত বাঁশবোঝাই ট্রাকের মাধ্যমে বাঁশ পরিবহন করে আসছে। এতে উখিয়া-টেকনাফ সড়কে সাধারণ মানুষের জীবন ও যানবাহন চলাচল প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
শুধু অতিরিক্ত বাঁশ পরিবহন নয়, আরকান সড়কের পাশে সরকারি ও বন বিভাগের জায়গা দখল করে বাঁশ মজুতের পয়েন্ট তৈরির অভিযোগও রয়েছে সিন্ডিকেটটির বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, উখিয়া স্টেশন থেকে পালংখালী পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে বনভূমি দখল করে কমপক্ষে ১০টি বাঁশ মজুতের পয়েন্ট গড়ে তোলা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব পয়েন্টে বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঁশ এনে মজুত করা হয়। পরে সেখান থেকে অতিরিক্ত বাঁশবোঝাই ট্রাকে করে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়। এতে একদিকে সরকারি ও বন বিভাগের জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত বোঝাই যানবাহনের কারণে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
এ বিষয়ে উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহিনুর রহমানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এর আগেও বন বিভাগ কয়েকটি ডিপুতে অভিযান পরিচালনা করেছিলো। উখিয়ায় বন বিভাগের জায়গায় থাকা বাঁশের ডিপু চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একের পর এক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরও অতিরিক্ত বাঁশবোঝাই ট্রাকগুলো কীভাবে নির্বিঘ্নে সড়কে চলাচল করছে? এসব যানবাহনের ওজন, লোডের পরিমাণ ও নিরাপত্তা বিধি তদারকিতে হাইওয়ে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
তাদের দাবি, দুর্ঘটনার পর সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বন বিভাগের জায়গা দখল করে বাঁশ মজুতের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাঁশ পরিবহন বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই এসব অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাকের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যেকোনো সময় আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।

পাঠকের মতামত