মৃত্যুর মুখ থেকে যেভাবে ফিরলেন রোহিঙ্গা নারী ছলিমা

মুহিববুল্লাহ মুহিব,বার্তা২৪::
রোহিঙ্গা নারী ছলিমা খাতুন (১৯)। রাতের আধাঁরে দালালের ফাঁদে পা দিয়ে পাড়ি দিচ্ছিলেন মালয়েশিয়ায়। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নেওয়া হচ্ছিল তাকে। কিন্তু যাত্রাপথে কক্সবাজার উপকূলের নুনিয়াছড়া এলাকায় ছলিমা খাতুনসহ মোট ১০ রোহিঙ্গাকে সাগরে নামিয়ে দেয় দালাল চক্র। সেখান থেকে কূলে ফেরেন তারা।

সোমবার (২০ মে) কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের হাতে আটক হন এসব নারীরা। পরে পুলিশকে এসব তথ্য জানান ছলিমা খাতুন। তিনি টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মৃত আমান উল্লার মেয়ে। ৭ ভাই-বোনের মধ্যে ছলিমা খাতুন দ্বিতীয়। দুই ভাই এখনো ছোট।

ছলিমাদের সঙ্গে আটক হয়েছেন উখিয়ার থ্যাংখালীর সি-১২ নং ক্যাম্পের দলু হোসেনের ছেলে আজিম উল্লাহ (২১)। তাকেও ভালো বেতনের চাকরির কথা বলে নদী পথে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হচ্ছিল।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, গত এক সপ্তাহে কক্সবাজার উপকূল থেকে মালয়েশিয়াগামী প্রায় তিন শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। গত ১৭ মে রাতে পেকুয়া ও সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৃথক অভিযানে ৮৪ জন মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে আটক করে পুলিশ ও কোস্টগার্ড। এরমধ্যে দালাল চক্রের ছয়জন সদস্য ছিল।

এর আগে মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক থেকে ২৯ জন, কালারমারছড়া থেকে ১৪ জন, পৃথক অভিযানে টেকনাফের বাহারছড়া থেকে ২০ জন, কক্সবাজারের দরিয়া নগর এলাকা থেকে ৩৪ জন এবং কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া থেকে ১৭ জনকে আটক করা হয়। পাচারের সময় বেশিরভাগ রোহিঙ্গা ধরা পড়লেও অনেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের মেরিনড্রাইভ সড়কের রেজু ব্রিজ এলাকায় ২০১৫ সালের মতো সক্রিয় রয়েছে মানব পাচারকারী চক্র। সেই চক্রের ৬ সদস্যের নেতৃত্বে রোহিঙ্গাদের সাগর পথে বিদেশে নেওয়া হচ্ছে।

গত শুক্রবার (১৭ মে) রাতে পেকুয়া থেকে মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গা আটকের ঘটনায় জড়িত ১১ জন দালালকে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এরমধ্যে ছয়জন স্থানীয় উজানটিয়া এলাকার। তারা হলেন- মো. টিপু, আবদুল গণি, মো. মনছুর, মিজবাহ উদ্দিন, জসিম উদ্দিন ও আব্দুল কাদের।

আর সেন্টমার্টিন থেকে মালয়েশিয়াগামী আটকের ঘটনায় পাঁচজন দালালকে আটক করেছে কোস্টগার্ড। তারা হলেন- মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম এলাকার আমিন শরীফ (২৭), একই এলাকার মুহি উদ্দীন (৫১), আব্দুল খালেক (৩০), রামু উপজেলার রশিদ নগর সিকদার পাড়ার শওকত আকবর (৪৫) এবং একই এলাকার মো. মোবারক (৩২)।

উভয় ঘটনায় মানবপাচার আইনে মামলা করা হয়েছে।

পুলিশের হাতে আটক ছলিমা খাতুন বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে দালালরা বাড়িতে গিয়ে আমাদের ভুল বুঝিয়েছে। তারা বলেছে কোনো সমস্যা হবে না, সহজেই আমাদের পার করে দেবে। এজন্য তারা আমাদের কাছ থেকে ৫ হাজার করে টাকাও নিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে সমুদ্রের গলা পানিতে নামিয়ে দিয়ে দালাল চক্র পালিয়ে যায়। পরে অনেক কষ্টে কূলে আসলে পুলিশ আমাদের ধরে নিয়ে আসে।’

আটক আজিম উল্লাহ বার্তা২৪.কমকে বলেন, মালয়েশিয়ায় নিয়ে যেতে তারা আমার কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা নিয়েছে। তারপর ব্রিজের পাশ দিয়ে বোটে তুলে সাগরের কাছে ফেলে দেয়। সেখান থেকে সাঁতরে কূলে ফিরেছি। এখন ক্যাম্পে ফিরতে চাই, এমন ভুল আর করতে চাই না।’

অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া কক্সবাজার সদর থানার উপ-পরিদর্শক দীপক কুমার বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘নুনিয়াছড়া থেকে নারীসহ ১০ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়। সাগর পথে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে উখিয়া ক্যাম্প থেকে তাদেরকে নিয়ে এসে নুনিয়াছড়া উপকূলে নামিয়ে দেওয়া হয়।’

এদিকে স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শহরের সাগরতীর নুনিয়াছড়া এলাকায় শীর্ষ মানব পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত শামসু মাঝির ছেলে ছৈয়দ করিম ও তার ভাই মোহাম্মদ করিম, গুড়া মিয়া মাস্টারের ছেলে আবু বক্কর ও নতুন বাহারছড়া এলাকার মৃত হোসেনের ছেলে জাফর আলম শিপন। তাদের হাত ধরেই এ পথ ধরে বহুবার মানবপাচার হয়েছে। চিহ্নিত এসব পাচারকারীর নামে বেশ কয়েকটি মামলাও রয়েছে।

অভিযোগ আছে, পুলিশের তালিকাভুক্ত এসব পাচারকারী আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের হাত ধরে এসব রোহিঙ্গা নুনিয়াছড়া এলাকায় এসেছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদ উদ্দিন খন্দকার বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘অবৈধভাবে সাগর পথে পাচারের খবর পেয়ে পুলিশ ১০ জন রোহিঙ্গাকে নুনিয়াছড়া থেকে আটক করেছে। স্থানীয় একটি চক্র এসব পাচারে জড়িত রয়েছে। পুলিশ এ বিষয়ে তদন্ত করে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

কক্সবাজার পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেন বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘সীমানা প্রাচীর না থাকায় রোহিঙ্গারা সহজেই ক্যাম্প ছাড়তে পারছে। দ্রুত সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন করা হবে।’

ad