প্রকাশিত: ২২/০১/২০২০ ৯:৫২ এএম

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একদল গবেষক সম্প্রতি কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ মাটি ও পানির নমুনা সংগ্রহ করে জাপানে পরীক্ষার পর উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়ামের সন্ধান পান।
বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল সায়েন্সডাইরেক্ট ডটকম-এ (গ্রাউন্ড ওয়াটার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট এর মুখপত্র) গত ৯ জানুয়ারি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ মাটিতে থাকা জিরকন ও মোনাজাইটে ৯৯০ পিপিএম মাত্রারও বেশি ইউরেনিয়াম থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ মাটিতে থাকা জিরকন ও মোনাজাইটে ৮৫০.৭ পিপিএম থেকে ৯৯০.৬ পিপিএম মাত্রার ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। যা ইতোঃপূর্বে সিলেট ও মৌলভীবাজারে প্রাপ্ত আকরিকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ উচ্চমানের।
গবেষক অধ্যাপক ড. আশরাফ জানান, কক্সবাজারে চালানো সাম্প্রতিক ওই গবেষণা অনুসন্ধানের জন্য ভূ-পৃষ্ঠের সর্বোচ্চ ১৮.৯ মিটার গভীর থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ৩ মিটারের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি জিরকন ও মোনাজাইট পাওয়া যায়। কক্সবাজারের মাটিতে ১.১ পিপিএম থেকে ৩৩.৪ পিপিএম পর্যন্ত ইউরেনিয়াম এবং ৬.৩ পিপিএম থেকে ২০২.৩ পিপিএম থোরিয়াম পাওয়া যায়। আর এই মাটিতে মোনাজাইটের পরিমাণ ৩.২৮% ভাগ এবং জিরকন এর পরিমাণ ২.৩৬% ভাগ। আর মোনাজাইট এবং জিরকন কনা নিজেই ৩৩৯৫.৯ পিপিএম থেকে ৩৯৩৭.৫ পিপিএম পর্যন্ত থোরিয়াম এবং ৮৫০.৭ থেকে ৯৯০.৬ পিপিএম পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ। যা সাধারণ মাত্রার তুলনায় অনেক সমৃদ্ধ। সাধারণ মাত্রায় থোরিয়াম থাকে ২৭৫.৫ পিপিএম থেকে ৩১৮.৪ পিপিএম এবং ইউরেনিয়াম থাকে ২৫৬.৩ পিপিএম থেকে ২৯০.৫ পিপিএম পর্যন্ত। এটা বেশ সমৃদ্ধ এবং কম গভীরতায় থাকায় উত্তোলনও হবে খুব লাভজনক।
গত কয়েক বছর আগে কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ পানীয় জলের নমুনা পরীক্ষা করে ১০ পিপিএম মাত্রার ইউরেনিয়াম এর অস্তিত্ব পান বিজ্ঞানী ড. আশরাফ। যা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বা হু নির্ধারিত সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৫ গুণ বেশি। হু নির্ধারিত সহনীয় মাত্রা হল ২ পিপিএম ( পার্টস পার মিলিয়ন বা ১০ লক্ষ ভাগের এক ভাগ)। আর এ ফলাফলের পরই কক্সবাজারের মাটিতে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম থাকার সম্ভাবনা থেকে তিনি সম্প্রতি ওই জরীপ চালান বলে জানান।
গবেষক দলে আরও রয়েছেন- জিওলজিকেল সার্ভে অফ জাপানের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ এডভান্সড ইন্ডাস্ট্রিয়াল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজির শিক্ষক ইয়োশিআকি কোন, জাপানের তুকোশিমা ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্কুল অফ টেকনোলজি, ইন্টাস্ট্রিয়াল এন্ড সোশ্যাল সায়েন্সের শিক্ষক রিও আনমা, জাপানের ওসাকা সিটি ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্কুল অফ সায়েন্সের শিক্ষক হারু মাসুদা ও কেজি শিনোদা, সুইডেনের কেটিএস-ইন্টারন্যাশনাল গ্রাউন্ড ওয়াটার আর্সেনিক রিচার্স গ্রুপের ডিপার্টমেন্ট অফ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক প্রসূন ভট্টাচার্য্য, জাপানের দশিশা ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর শিক্ষক ইউরিকো ইউকো এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক এস. বিপুলেন্দু বসাক।
অধ্যাপক ড. আশরাফ সিদ্দিকী জানান, তার গবেষণায় মোনাজাইটের মধ্যে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার (১৬%) ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। রুটাইল, জিরকন ও ইলমেনাইটেও তেজস্ক্রিয় পদার্থ মিশে থাকে। ইউরেনিয়াম একটি ঘন, রূপালী-সাদা, সামান্য প্যারাম্যাগনেটিক তেজস্ক্রিয় ধাতু। এটি নমনীয় এবং ক্ষতিকারকও। ইউরেনিয়ামের কালো স্তর অক্সাইডের মাধ্যমে বাতাসকে দূষিত করে। ইউরেনিয়াম একটি অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল ধাতু এবং প্রায় সমস্ত ননমেটালিক উপাদান এবং তাদের অনেকগুলি যৌগের সাথে প্রতিক্রিয়া করে। এটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি ভারী ধাতু, যা ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘনীভূত শক্তির প্রাচুর্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
পৃথিবীর ভূ-ত্বকে টিন, টাংস্টেন এবং মলিবডেনমের মতোই সাধারণ একটি খনিজ ইউরেনিয়াম। সাধারণত: ২ থেকে ৪ পিপিএম ঘনত্বের পাথরেই ইউরেনিয়াম দেখা যায়। ইউরেনিয়াম সমুদ্রের পানিতে জন্ম নেয় এবং সেখান থেকেও আহরণ করা যায়। তবে ভূ-পৃষ্ঠের নিচে বা পানিতে, যেখানেই ইউরেনিয়াম থাকুক না কেন সেখান থেকে তেজস্ত্রিয়তা বের হয়। এতে উপাদানটি চিহ্নিত করা সহজ। তবে কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ মাটিতে ইউরেনিয়ামের কী পরিমাণ মজুদ রয়েছে বা সাগরের পানিতে কী মাত্রায় রয়েছে, তা নিয়ে কোন গবেষণা হয়নি।
গবেষক ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকীর ধারণা, কক্সবাজারে প্রাথমিক অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেছে, তা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। গত বছর চট্টগ্রামের পতেঙ্গা চালানো জরীপেও মাটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি তেজস্ত্রিয় পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যারমধ্যে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম ও রেডিয়াম রয়েছে। এসব জরীপ চট্টগ্রাম উপকূলের মাটিতেও ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম থাকার জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশের অন্যান্য সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাতেও এই খনিজ পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
সারাবিশ্বে ভিন্ন মাত্রার ইউরেনিয়াম ভিন্ন ভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়াম পারমানবিক চুল্লীতে সমৃদ্ধ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়। প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়ামকে ০.৭% থেকে ৩.৭ পর্যন্ত এবং ৩.৭ থেকে ৫% মাত্রায় সমৃদ্ধ করা হয়। তবে ২০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে বলা হয় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (এইচআরইউ)। পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রচুর পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দরকার। আর সেই ইউরেনিয়ামের যোগান দেশ থেকে আসতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে এই মূল্যবান খনিজ সম্পদের ব্যবহারের জন্য এখনই প্রস্তুতি শুরু করা উচিৎ বলে মনে করেন তারা।

পাঠকের মতামত

সোনার দামে আবারও রেকর্ড, ভ‌রি‌ ১ লাখ ১৯ হাজার ৬৩৮ টাকা

আবারও সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। প্রতি ভরিতে ...