স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর করণীয় ও পূনঃ বিবাহের বিধান

কোন স্ত্রী লোকের স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর করণীয় কি এবং বিধবা স্ত্রী কখন পূর্ণঃবিবাহ করতে পারবে সে সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের আলোকে আলোচনা পেশ করা হলো।

স্ত্রীর ইদ্দাত বা শোক পালন:-
স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর ৪ মাস ১০ দিন ইদ্দাত পালন করতে হবে। সেটা স্বামীর সাথে সহবাস হোক বা না হোক উভই অবস্থায় একই বিধান।

আল্লাহ তায়ালা বলেন- وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا অর্থ তোমাদের মধ্য থেকে যারা মারা যায়, তাদের পরে যদি তাদের স্ত্রীরা জীবিত থাকে, তাহলে তাদের চার মাস দশ দিন নিজেদেরকে (বিবাহ থেকে) বিরত রাখতে হবে ৷ বাকারা-২৩৪

উম্মে হাবীবা রা.থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাসী কোনো নারীর জন্য তার স্বামী ব্যতীত অন্য কারো মৃত্যুতে তিনদিনের বেশি সময় হিদাদ (শোক করা ও সাজসজ্জা থেকে বিরত থাকা) বৈধ নয়। আর স্বামীর মৃত্যুতে ৪ মাস ১০ দিন হিদাদ (শোক) পালন করবে।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৫৩৩৪

গর্ভবতী নারীর ইদ্দাত :-
স্বামীর মৃত্যুর পর গর্ভবতী স্ত্রীর জন্য ইদ্দাত হচ্ছে সন্তান প্রসব পর্যন্ত। সন্তান যে দিন প্রসব করবে সেই দিনে থেকে স্ত্রী সাজ-সজ্জা ও বিবাহের প্রস্তুতি নিতে পারবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ অর্থ: গর্ভবতী মহিলাদের ইদ্দতের সীমা সন্তান প্রসব পর্যন্ত৷ (তালাক-৪)

হযরত সুবা‘আহ (রাঃ) নিজের ব্যাপারে রাসুল (সঃ) কে জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, ‘সন্তান প্রসবের পর থেকেই তুমি ইদ্দাত হতে বেরিয়ে গেছ। সুতরাং এখন তুমি ইচ্ছা করলে বিয়ে করতে পার।’ (ফাতহুল বারী ৯/৩৭৯, মুসলিম ২/১১২২)

ইদ্দাত পালনের আদেশ দানের নিগুঢ় রহস্য:-

সাঈদ ইব্ন মুসাইয়াব (রহঃ) এবং আবুল আলীয়া (রহঃ) বর্ণনা করেন, বিধবাদের জন্য ৪ মাস ১০ দিন ইদ্দাত পালন করার পিছনে যে রহস্য রয়েছে তা হলো স্বামী মারা যাওয়ার সময় স্ত্রী গর্ভাশয়ে ভ্রুণ থাকার সম্ভাবনা থাকলে তা ৪ মাস ১০ দিনের মধ্যেই গর্ভধারণের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।ইদ্দাত পালনরত অবস্থায় স্ত্রীরা যে কাজ হতে বিরত থাকবে:-
• নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া (ইদ্দাত শেষ হলে পারবে)
. অধিক সাজগোজ করে নিজেকে সাজা
• সুগন্ধি ব্যবহার করা
• কারুকার্যমণ্ডিত কাপড় পরিধান করা
• অলংকার পরিধান করা
• মেহেদি ও আলতা ব্যবহার করা
• খিযাব (কলপ) ও সুরমা ব্যবহার করা

এক কথায় এমন ভাবে সাজগোজ না করা যাতে অন্য পুরুষেরা বিবাহের জন্য আকৃষ্ট না হতে পারে। আল্লামা কুরতুবী রাহ. তার বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ ‘আলজামে লিআহকামিল কুরআন’ও ইদ্দত সংক্রান্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি লেখেন, হিদাদ পালনের অর্থ হল, মহিলা তার ইদ্দতকালীন সুগন্ধি, সুরমা, মেহেদি,অলঙ্কারাদিসহ পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রে যাবতীয় সাজসজ্জা ত্যাগ করবে। -আল জামে’ লিআহকামিল কুরআন, কুরতুবী ৩/১১৮

পূনঃ বিবাহের বিধান:-

যে পর্যন্ত ইদ্দাতকাল শেষ না হবে সে পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে না। তবে ইদ্দাত পালনরত অবস্থায় স্ত্রীকে ইশারা-ইঙ্গিতে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া অথবা বিয়ের আকাঙ্খা মনের মধ্যে থাকলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে না। যেমন মাহান আল্লাহ বলেন- وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا عَرَّضْتُم بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ أَوْ أَكْنَنتُمْ فِي أَنفُسِكُمْ

ইদ্দতকালে তোমরা এই বিধবাদেরকে বিয়ে করার ইচ্ছা ইশারা ইঙ্গিতে প্রকাশ করলে অথবা মনের গোপন কোণে লুকিয়ে রাখলে কোন ক্ষতি নেই । বাকারা-২৩৫

যে ইশারা- ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেওয়া যাবে:-

যেমন তাকে বলা ‘আমি বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করেছি অথবা আমি এরূপ এরূপ মহিলাকে পছন্দ করি; অথবা আমি চাই যে, আল্লাহ যেন আমার জোড়া মিলিয়ে দেন। আমি তোমার মতো কোন সতী ও ধর্মভীরু স্ত্রী লোককে বিয়ে করতে চাই। (ফাতহুল বারী ৯/৮৪, তাবারী
৫/৯৫, ৯৬) ইত্যাদি

মুজাহিদ (রহঃ), তাউস (রহঃ), ইকরিমাহ (রহঃ), সাঈদ ইব্ন যুবাইর (রহঃ) প্রমুখ বলেছেন যে, যার স্বামী মারা গেছে তাকে পরোক্ষভাবে বিয়ের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। (ইব্ন আবী হাতিম ২/৮১৭, ৮১৮)

সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া যাবে না:-

ইদ্দাত পালনরত অবস্থায় ঐ স্ত্রীকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব অথবা গোপন কোন চুক্তি করা যাবে না। যেমন তাদেরকে বলা-
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, ‘কিন্তু তাদের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়োনা’ এর অর্থ হল তাকে বলনা ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ অথবা এ কথা বলা যে, ‘প্রতিজ্ঞা কর যে, (ইদ্দাত শেষ হওয়ার পর) অন্য কেহকে বিয়ে করবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। (তাবারী ৫/১০৭)

সুফিয়ান সাওরী (রহঃ) বলেন যে, এর অর্থ হল মহিলাদের কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি নেওয়া যে, সে অন্য কেহকে বিয়ে করবে না। (তাবারী ৫/১০৯)
ইব্ন যায়িদ (রহঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে পরোক্ষভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া; যেমন বলা, আমি তোমার মত কেহকে বিয়ে করতে আগ্রহী। (তাবারী ৫/১১৪)
আবু উবাইদাহ (রহঃ) কে এই আয়াতাংশের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, স্ত্রীর অভিভাবককে এ কথা বলা যে ‘আমাকে প্রথম জিজ্ঞেস না করে তাকে কোথাও বিয়ে দিবেন না।’ (ইব্ন আবী হাতিম ২/৮২৬)

এ সম্মন্ধে মহান আল্লাহ বলেন- وَلَٰكِن لَّا تُوَاعِدُوهُنَّ سِرًّا إِلَّا أَن تَقُولُوا قَوْلًا مَّعْرُوفًا ۚ وَلَا تَعْزِمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ حَتَّىٰ يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ
কিন্তু তাদের সাথে কোন গোপন চুক্তি করো না ৷ যদি কোন কথা বলতেই হয় তবে প্রচলিত ও পরিচিত পদ্ধতিতে বলো৷ তবে বিবাহ বন্ধনের সিদ্ধান্ত ততক্ষণ করবে না যতক্ষণ না ইদ্দত পূর্ণ হয়ে যায়। বাকারা-২৩৫

ইদ্দাত পালনরত অবস্থায় বিয়ে করলে করণীয়:-
যে পর্যন্ত ইদ্দাতকাল শেষ না হবে সে পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেনা। ইব্ন আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রহঃ), শা’বি (রহঃ), কাতাদাহ (রহঃ), রাবী ইব্ন আনাস (রহঃ), আবূ মালিক (রহঃ), যায়িদ ইব্ন আসলাম (রহঃ)সহ আলেমদের এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, ইদ্দাতের মধ্যে বিয়ে শুদ্ধ নয়। যদি কেহ ইদ্দাতের মধ্যে বিয়ে করে এবং সহবাসও হয়ে যায় তথাপিও তাদেরকে পৃথক করে দিতে হবে। (ইব্ন আবী হাতিম ২/৮২৮, ৮২)