স্বাধীন আরকানের পটভূমি – আদিল চৌধুরী

কক্সবাজারের আঞ্চলিক ইতিহাসে ওৎপ্রোত জড়িয়ে আছে বঙ্গপোসাগর। উপকূলে একটি শ্রেষ্ঠ সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল কাহিনী। শুধু প্রাকৃতিক সম্পদই নয়, কক্সবাজার সমৃদ্ধ শালী হয়েছে ইতিহাস ও সভ্যতায়। একথা সত্য, কক্সবাজারের আঞ্চলিক ইতিহাসের উপর কোন সুখপাঠ্য ইতিহাস আজ পর্যন্ত রচিত হয়নি। তাই আমাদের অতীত এখনো অন্ধকারাচ্ছন্ন। শাহ সুজার আরাকান গমন শুধু মাত্র অতীতের আলোক মশাল হিসেবেও এঘটনায় চিহ্নিত। আমাদের ইতিহাস উদঘাটনের লক্ষ্যেই, এই ঘটনা পাশাপাশি বক্ষমান নিবন্ধে আলোচিত হয়েছে। সমসাময়িক কালের ঐতিহাসিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঘটনা। ইতিহাস প্রমাণ করে, স্বাধীন ও সার্বভৌম আরাকানের ইতিহাসই হলো কক্সবাজারের আঞ্চলিক ইতিহাসে সূতিকাগার। আরাকানের রাজসভা সমৃদ্ধশালী করেছে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য এবং আজকের বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে।
কথিত আছে মোঘল যুবরাজ শাহ সুজা চট্টগ্রাম থেকে দুর্ভেদ্য গভীর বন জঙ্গল, পাহাড় ও অজস্র পাহাড়ী ঢলে নেমে আসা খরস্রোতা নদী অতিক্রম করে- আরাকানের উদ্দেশ্যে যে দিন ঈদগড় এসে পৌছেন সেদিন রাতে আকাশে দেখা দেয় ঈদের চাদ। নানা প্রতিকুল কারণে মোঘল বাহিনীর সেখানে আর ঈদের জামাত আদায় করা সম্ভব হয়নি। ঈদগড় থেকে কিছু দূর পশ্চিমে এসে  একটি স্থানে ঈদের নামাজ আদায় করেন। অত:পর ঐ স্থানটির নাম করণ হয় ঈদগাহ। আর যে স্থানে ঈদের নামাজ আদায় করা হল না, সে স্থানটির নাম হয়ে পড়ে ঈদগড়।
অবশেষে শাহসুজা তদানিস্তন আরাকানের রাজধানী ম্রোহং এসে পৌছলে আরাকানের তরুন রাজা সান্দা-থু-ধম্মা (চন্দ্র-সু-ধর্মা) তাকে রাজকীয় অভিবাদন জানান এবং ম্রোহং শহরের উপকেন্ঠর লেমব্রু নদীর তীরে অনুচ্ছ পাহাড়ের চুড়ায় এক রাজকীয় প্রসাদে আশ্রয় দান করেন। কথা ছিল, আরকান রাজা সান্দা-থু-ধম্মা সামুদ্রিক জাহাজে করে শাহসুজা ও তাঁর অনুগত বাহিনীকে পবিত্র মক্কা নগরীতে পৌছিয়ে দেবার ব্যবস্থা করে দেবেন।
তখন আরাকান রাজার নিয়ন্ত্রণে ছিল একটি সুদক্ষ নৌ বাহিনী। তবে এই নৌ বাহিনী তাদের নিয়মিত নৌ বিদ্যার মহড়া দিত ব্যাপক জলদস্যুবৃত্তির মাধ্যমে। আরাকান রাজা নৌ দস্যু বাহিনী গড়ে তুলার পেছনেও একটি কারণ ছিল।
আগে বিশ্বের নৌ বাণিজ্য ছিল আরব ও পারস্যদেশীয় সওদাগরদের নিয়ন্ত্রণে। ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত সমগ্র দেশে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল আরব ও পারস্যের বণিকগণ। সওদাগরেরা এক দেশের পন্য অপর দেশে বিক্রি করতো। বাণিজ্যিক সুবিধার জন্যে আরব ও পারস্যের বণিকগণ বিভিন্ন বাণিজ্য কেন্দ্র সমূহে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র মানব বসতী গতে তুলতো। চট্টগ্রাম বন্দর, আকিয়াব, বার্মা পেগু প্রভৃতি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে এভাবে গড়ে উঠে। এক নদীর অবাহিকায় অবস্থিত বলে ফারশী শব্দ ‘‘এক-আব’’ থেকে আকিয়াবের নামকরণ হয়।
প্রসংগত: উল্লেখযোগ্য ইউরোপিয়রা ছিল অসভ্য ও বর্বর প্রকৃতির। তাই অনেক ঐতিহাসিক মনে করেণ, সভ্যতার লীলাভূমি মধ্য এশিয়া, যেখান থেকে প্রচারিত হয়েছে মানবতাবাদী ধর্ম সমূহ। পক্ষান্তরে, বর্বরতাই হলো ইউরোপের ঐতিহ্য। এশিয়া থেকে উৎসারিত খৃষ্টধর্ম ইউরোপিয়রা গ্রহণ করেছে বটে, তবে তারা খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হয় নাই। ইউরোপীয়রা  খৃষ্ট ধর্মকে ব্যবহার করেছে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে। সম্ভবত: মানব ইতিহাসের এটিই সবচেয়ে বড় দু:খজনক ঘটনা হলো, ইউরোপিয়দের হাতে গিয়ে পৌছল তৎকালীন পৃথিবীর আধুনিকতম নৌ যুদ্ধ বিদ্যা ও প্রযুক্তি। প্রকৃত পক্ষে বৃটিশসহ ইউরোপিয়রা ছিল মূলত: দস্যু। দস্যুবৃত্তিইছিল তাদের প্রধান পেশা। নৌ দস্যুবৃত্তির মাধ্যমে তারা পারদর্শী হয়ে উঠে নৌ যুদ্ধ বিদ্যায়। অতপর এরা আর্বিভূত হয় আর্ন্তজাতিক নৌ বাণিজ্যে। ফলে বাণিজ্য সুকুমার কলা থেকে রূপান্তরিত হয় এক বীভৎস দস্যুবৃত্তিতে। নৌ শক্তির কারনে আবরীয়রা সামুদ্রিক বাণিজ্য থেকে সরে দাড়ায়।
বঙ্গপোসাগর সহ দুরপ্রাচ্যের জলসীমায় একই সাথে প্রবেশ করে পর্তুগীজ, ডাচ বাং বৃটিশরা। কিন্তু ডাশ ও বৃটিশদের সাথে পর্তুগীজরা পাল্লা দিয়ে বাণিজ্যে টিকতে পারেনি। কেননা, বাণিজ্যের চেয়ে দস্যু বৃত্তির নেশা তাদের মধ্যে ছিল প্রবল। তবে ব্যবসার মধ্যে দাশ ব্যবসাটাই ছিল পর্তুগীজ দস্যুদের মুখ্য ব্যবসা। ডাচ ও ব্রিটিশরাই ছিল পর্তুগীজদের প্রধান দাস ক্রেতা।
চতুর্দশ শতকরে শেষভাগে পর্তুগীজরা এসে পড়ে বঙ্গপোসাগারের জল সীমায়। চট্টগ্রাম এবং সদ্বিপ ছিল এদের দস্যু বৃত্তির প্রধান কেন্দ্র। সর্বোপরি পর্তুগীজ জলদস্যুরা ছিল সুদক্ষ নৌ যোদ্ধা। তখন আরকানের জন্যে সময়টা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। সুদীর্ঘ একশত বছর বাংলার ইলিয়াস শাহী রাজ বংশের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে আরাকানের ম্রাউক-উ রাজবংশে দ্বাদশতম রাজা জেবুকশাহ ১৫৩১ খৃষ্ট্রাব্দে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
বলা বাহুল্য, ১৪৪০ খৃষ্টাব্দে আরাকানের যুব রাজ নরমিখলা গৌড়ীয় সৈন্যবাহিনীর সহায়তায় সোলাইমান শাহ নাম ধারণ করে  ম্রাউক-উ রাজ বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। উল্লেখ্য, ১৪৩০ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৫৩০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সুদীর্ঘ একশত বছর বাংলার শাসকদের নিয়মিত কর প্রদান করতো।
যা হউক, স্বাধীন আরকানের রাজা জেবুকসাহ দিল্লির অপ্রতিরোধ্য মুগল শক্তিকে ভয়ের চোখে দেখতেন। বাংলার শাসকগণ অভ্যন্তরীণ গোলযোগ আর কলহে জর্জরিত। বিচক্ষণ রাজা জেবুক শাহ উপলিব্ধ করলেন একমাত্র সমুদ্র পথে মুগলদের আরাকান আক্রমণ সম্ভব। চট্টগ্রাম ছিল আরাকান রাজার অধীন। রাজা যেবুক শাহ পর্তুগীজদের চট্টগ্রামে বাণিজ্যের সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে স্বদেশীয়দের নিয়ে একটি সুদক্ষ নৌবাহিনী গড়ে তুলার লক্ষ্যে পর্তুগীজদের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করলেন। সংগত কারণে স্বদেশীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগদের নিয়েই আরাকান রাজার নৌ বাহিনী গড়ে উঠল। সম্ভবত: এর পেছনে রাজা জেবুক শাহের অন্য মনস্তাত্বিক কারণ কাজ করেছিল। প্রথমত: আরাকানের স্থল বাহিনীটা ছিল একচ্ছত্রভাবে মুসলিম প্রধান। তদুপরি পর্তুগীজ দস্যুদের আরকানের মুসলমানেরা ঘৃণার চোখে দেখতো। দ্বিতীয়ত: ধর্মে মুসলমান ছিলেন বলে মুগল আক্রমণ প্রতিরোধে আরাকানের মুসলমানেরা নির্ভরযোগ্য ছিল না। তৃতীয়ত: আরকানের সামাজিক সাংস্কৃতিক কাঠামো টা ছিল ইসলামের ধর্মীয় মূল্যবোধ মোতাবেক। আরাকানের রাজ দরবার মুসলিম ঐতিহ্য অনুযায়ী পরিচালিত হতো। আমাত্যবর্গের অধিকাংশই ছিল মুসলমান। মুদ্রার এক পিঠে আরবী হরফে মুসলমানদের কলেমা এবং অপর পিঠে রাজার মুসলিম নাম, রাজ্যাভিষেক কাল সহ খোদাই করা হতো। বিচার ব্যবস্থা মুসলিম কাজীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। তাছাড়া মুসলমানেরা ছিল কৃষি কাজে পারদর্শী। আরাকানের বিপুল অনাবাদী ভূমিকে কৃষির আওতায় আনতে আরাকান রাজার কাছে মুসলমান প্রজারাই ছিল অধিক প্রয়োজনীয়। তাই দেশের পরিপুর্ণ নির্মাণ কাজে মুসলমান প্রজার সামগ্রিক শক্তি নিয়োগের স্বার্থে নৌ বাহিনীতে মগ প্রজা প্রাধান্য পেয়েছিল। কিন্তু মগ প্রজাদের নিয়ে গঠিত আরকানের নৌ বাহিনী যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেনি, পুতুর্গীজ প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে ঐতিহ্য হিসেবে পেয়েছিল বর্বর জলদস্যুবৃত্তি। এদের দস্যুতা ছিল বর্বর তম, বিভৎস ও লোমহর্ষক । মেঘনা নদীর মোহনা থেকে মগ পর্তুগীজ জল দস্যুরা উজানের দিকে চলে যেতো। হঠাৎ করে দস্যুরা কোন গ্রামে হানা দিয়ে পুরো গ্রামটাই ঘ্রিরে ফেলতো। তারপর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতো। সকল নারী পুরুষকে ধরে বেধে ফেলতো। একটি জ্বলন্ত লৌহ শলাকা দিয়ে বন্দিদের হাতের তালু ছিদ্রি করে, ছিদ্র পথে চিকন বেত চালিয়ে স্তুপ আকারে বেধে ফেলত। অতপর টানতে টানতে নৌকার পাটাতনে ফেলে রাখতো। পাটাতনের উপরে ছিদ্র থেকে হাস মুরগীকে যে ভাবে চাউল ছিটিয়ে দেওয়া হয়, সেভাবে রান্না বিহীন শুধু চাউল ছিটিয়ে দিতো। পর্তুগীজ দস্যুরা বন্দিদের একটি অংশ আরকানে পাঠিয়ে দিতো এবং অপর অংশ দাশ হিসেব বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করতো। অপর দিকে মগ জলদস্যুরা দ্রæত সব বন্দিদেরকে আরাকানে পাঠিয়ে দিতো। আরাকান রাজা এ সকল বন্দিদের কৃষি কাজে লাগাতো।
এখন প্রশ্ন হলো, কি পরিমাণ বন্দি বাংলাদেশ উপকুল ভাগ থেকে আরাকানে পাচার করা হয়েছিল? উল্লেখ, ১৫৩০ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৬৬৬ খৃষ্টাব্দ অর্থাৎ শায়েস্তা খানের চট্টগ্রাম বিজয় পর্যন্ত মগ পর্তুগীজ জলদস্যুদের এই নৃশংসতম অত্যাচার প্রায় দেড় শতাব্দী পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এর মধ্যে মুগল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে স্থায়ী ভাবে সুবেহ বাংলা দিল্লি অধীন হয়ে পড়ে। বলাবাহুল্্য, যুব রাজ শাহ সুজার আরাকান গমনের সময়টা ছিল ১৬৬০ খৃষ্টাব্দের জুন মাস।
বাংলাদেশের ঘন বসতিটা গড়ে উঠেছিল মেঘনা নদীর অববাহিকায়। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে বাংলার রাজ দরবারে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব রাজকোষে জমা হতো। ক্রমাগত দস্যুদের অত্যাচারে এই রাজস্বের পরিমাণ শূন্যে চলে আসে। এমনকি, বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত দস্যুদের আক্রমণ থেকে নিরাপদ ছিল না।
সমকালীন ঐতিহাসিক সিহাব উদ্দিন তালিশ এর বর্ণনা অনুসারে, দস্যুরা ছিল পাগলা ঘোটকীর মত দুর্দান্ত ও বেপরোয়া। এদের অত্যাচারে দক্ষিণ বাংলার বিস্তৃত ঘন বসতি পূর্ণ অঞ্চল সম্পূর্ণ জনমানবহীন হয়ে গভীর জংগলে পরিপুর্ণ হয়ে পড়ে।
এই সব জঙ্গলে পাখি তো দুরের কথা, শকুন পর্যন্ত দেখা যায়না। কেননা, সব কিছুই দস্যুরা বধ করে ফেলেছে। রেলফ ফিচ সহ আরো সমকালীণ পরিব্রৃাজকদের বণর্নামতে, এ দস্যুরা এতই ইতর এবং ববর্র প্রকৃতির ছিল যে, এরা মানুষের সমাজে বসবাসত করতো না। স্বদেশী মগেরা ও তাদের সমাজে ঠাই দিতো না। মানুষের সমাজ থেকে অনেক দুরে তারা বসবাস করতো।
ইতিপূর্বে চন্দ্র সূর্য রাজ বংশ নামের একটি রাজ বংশ স্বাধীন আরাকান শাসন করতো। লেমব্রæ নদীর তীবে অবস্থিত লংগ্রেত শহরে ছিল। এই রাজ বংশের সর্বশেষ রাজধানী। ১৪০৪ খৃষ্টাব্দে রাজা অযুতুর পুত্র নরমিখলা মাত্র ২৪ বৎসর বয়সে রাজধানী লংগ্রেতের সিংহাসনে আরোহণ করেন। সিংহাসনে আরোহণ করেই নরর্মিখলা ডেল্লা নামক এক দেশীয় রাজ্যের রাজার অপূর্ব সুন্দুরী স্ত্রী সাঁ-বু-ইউ-কে অপহরণ করে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে আসেন। সুন্দরী সাঁ-বু-ইউ ছিল অননাথিউ নামক অপর এক দেশীয় রাজার ভগ্নী। অগত্যা অপমানের প্রতিশোধ স্বরূপ অননাথিউ বার্মায় গিয়ে আভার রাজাকে আরাকান দখল করতে প্রলুব্ধ করেন। ১৪০৬ খৃষ্টাব্দে এক বিরাট সৈন্য বাহিনী নিয়ে আরকান আক্রমণ করলে সমস্ত দেশীয় রাজাগণ বার্মার পক্ষাবলম্বন করেন। ফলে, রাজা নরমিখলা তাদানিস্তন বাংলার রাজধানী গৌড়ে এসে আশ্রয় গ্রহন করেন। কথিত আছে, নরমিখলা স্বদেশ ভুমি থেকে পালিয়ে গৌড়ে এসে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন। আরাকান জনৈক বৌদ্ধ ভিক্ষুর পরামর্শক্রমে নরমিখলা গৌড়ের বিখ্যাত সুফী মোহাম্মদ জাকেরের আস্তানায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। উল্লেখিত রয়েছে যে, আরাকানের নির্বিশেষে অনেকে তাকে ভক্তি ও শ্রদ্ধা করতেন। সুফী মোহাম্মদ জাকেরের আস্তানায় অবস্থান করেন নরর্মিখলা ইসলাম ধর্মে দিক্ষিত হন এবং ইসলামের ইতিহস, ধর্ম, দর্শন, ঐতিহ্যের ভুৎপত্তি  লাভ করেন। এ মহান সুফীর মাধ্যমে নরমিখলা গৌড়ের রাজ প্রসাদে স্থান লাভ করেন। তখন ইলিয়াস শাহী রাজ বংশ বাংলা শাসন করতেন। নরমিখলা সু দীর্ঘ ২৪ বছর গৌড়ে অবস্থান করেন। ১৪৩০ খৃষ্টাব্দে গৌড়ের সুলতান নাছির উদ্দিন শাহা মতান্তরে জালাল উদ্দিন সেনাপতি ওয়ালী খানের নেতৃত্বে ২০ হাজার সৈন্য বাহিনী দিয়ে নরমিখলাকে স্বদেশ ভূমি উদ্ধারের সাহায্য করেন। বলা বাহুল্য, ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে নরমিকলা সোলাইমান শাহা নামধারণ করেন। গৌড়িয় সৈন্যবাহিনী নিয়ে ওয়ালি খান বার্মাকে তাড়িয়ে আরাকান দখল করে নিয়ে নিজে স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। আরকানের মন্ডু থেকে বুচিডং পর্যন্ত গিরি পথটি ওয়ালী খানের ঢালা (আলী অং এর ঢালা) হিসেবে এখন ও সেনাপতি ওয়ালিখানের স্মৃতি বহণ করছে। পুনরায় স্বদেশ ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে সোলামাইন শাহা ওরপে নরমিখলা গৌড়ে পালিয়ে যান। গৌড়ের সুলতান সেনা পতি সিন্ধী খানের নেতৃত্বে পুনরায় ৩০ হাজার সৈন্য দিয়ে সোলামান শাহাকে সাহায্য করেন ১৪৩২ খৃষ্টাব্দে সোলামাইন শাহা ওয়ালি খানকে পরাজিত করে আরাকানের সিংহাসন দখল করেন, গৌড় থেকে আগত সৈন্যবাহিনী স্থায়ী ভাবেই আরাকানে থেকে যায়। আর এখান থেকেই শুরু হয় ম্রাউক-উ রাজ বংশের ইতিহাস এবং লংগেট থেকে সরিয়ে মোহং নামক স্থানে এই রাজ বংশ তাদের রাজধানী গড়ে তুলে।
বলাবাহুল্য, ১৫৩০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত এই রাজবংশ গৌড়ের সুলতানদের কর প্রদান করতো। অতঃপর ১৫৩১ খৃষ্টাব্দে দ্বাদশতম পুরুষ জেবুক শাহ (মগি নাম মিনবিন) স্বাধীনতা  ঘোষণা করেন। অতঃপর ১৬১২ খৃষ্টাব্দে স্বাধীন আরকানের শক্তিধর রাজা সেলিম শাহের রোমান্টিক পুত্র হোছ্ইান শাহ (মগি নাম মিংখ্যা মং) রোশাঙ্গের সিংহাসন অলংক্বত করেন। উল্লেখ্য সেলিম শাহের রাজত্ব কালে আরকানের সিমানা দক্ষিণে বার্মার বিস্তৃর্ণ নিম্ন অঞ্চল থেকে খুলনা-ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। দিল্লির অনুকরণে সেলিম শাহা নিজকে বাদশাহ উপাধিতে ভ‚ষিত করেন। ১৬২২ খৃষ্টাব্দে সেলিম শাহের পুত্র হোসাইন শাহ মৃত্যুবরণ করলে পুত্র থ্রি থু ধম্মা (শ্রী সুধর্মা) দ্বিতীয় সেলিম শাহ নাম ধারণ করে রোসাঙ্গের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত হন।
তৎকালিন যে কোন বিদেশী আরকানে অবাধে বসবাস করতে পারতো এমনকি রোশাঙ্গের যেকোন স্থানীয় রমনী বিয়ে করতে ও কোন বাধা নিষেধ ছিল না। তবে দেশ ত্যাগের সময় দেশীয় রমনি ও তাদের সন্তাদের নিয়ে যেতে পারতো না। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্যে এই আইনটি প্রচলন করা হয়েছিল। ফলে রোশাঙ্গে অবস্থানরত ডাচগণ দেশে ফেরার সময় তাদের স্থানীয়  স্ত্রী ও সন্তনদের আইনগতভাবে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতো না। ইউরোপের স্বদেশীয় ডাচদের এই ঘটনাটি খুবই বিক্ষ‚ব্ধ করতো এই কারণে যে ডাচদের ঔরশজাত রোশাঙ্গের ফেলে যাওয়া স্ত্রী পুত্রগণ ইসলাম ধর্মাবলম্বী হয়ে পড়তো এবং মুসলমান হয়ে বড় হত। শুধুমাত্র এই কারণে ডাচগণ আরকান ত্যাগের সময় বড় বড় মটকাতে তাদের স্ত্রী পুত্রদের লুকিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করতো আর প্রায় ক্ষেত্রেই ধরা পড়তো। প্রকৃতপক্ষে, এ ঘটনা থেকে আরকানে বসবাসরত তৎকালের বাঙ্গালী মুসলমানগন কিভাবে সেদেশের রাষ্ট্রীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে আধিপত্য বিস্তার করেছিল তার পরিচয় পাওয়া যায়।
যা হউক, ১৬৩৮ খুৃষ্টাব্দে শ্রী সুধর্মা স্বীয় পত্নী মিনসানির চক্রান্তে এক প্রসাধ ষড়যন্ত্রে নিহত হন। এই ষড়যন্ত্রের হোতা ছিলেন শ্রীসুধর্মার জ্ঞাতি ভ্রাতা নরপতিগ্রী। প্রখ্যাত গবেষক ও জ্ঞান তাপস ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ নরপতিগ্রীর মুসলীম নাম অস্পষ্ট ও পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন। ১৬৩৮ খৃষ্টাব্দ হতে ১৬৪৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত নরপতিগ্রী রাজা ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর এক মাত্র নাবালিকা কণ্যাকে মুখ্যপাটেশ্বরী  করে নরপতির সৈন্য মন্ত্রী ছিদ্দিক বংশজাত বড় ঠাকুরের গুণীপুত্র কোরেশী মাগন ঠাকুরের হেফাজতে রেখে দেন। নরপতির কণ্যার সাথে ভ্রাতুষ্পুত্র থদোমিন্তারের সাথে বিয়ে দেন।
মুগল যুবরাজশাহ সুজা ১৬৬০ খৃষ্টাব্দে আরাকান গমন করে। তার মাত্র কয়েক বৎসর আগে কোরেশী মাগন ঠাকুর পরলোকগমন করেন এবং রোসাঙ্গের মুসলমানদের প্রধান নব রাজ মসলিস প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন। আলাওলের বর্ণনা মতে মহাপাত্র নবরাজা মজলিসই রাজা সান্দা থু ধম্মার অভিষেকপরিচালনা করেন। নবরাজ মজলিসকে আলাওল রোসাঙ্গের মুসলমানদের প্রধান বলে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া, সান্দা-থু-ধম্মার সৈন্যমন্ত্রী ছিলেন সৈয়দ মুসা। এ মুখ্য সেনাপতির নাম ছিল সৈয়দ মুহাম্মদ। একমন্ত্র্রীর নাম ছিল শ্রীমন্ত সোলায়মান। রোসাংগের কাজী ছিলেন কাদেরিয়া খেলাফতের পীর সুফী মাসুম শাহ।
যা হউক আরকানের রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের এক বিশেষ উল্লেখযোগ্য মুহুর্তে মুগল যুব রাজ শাহ সুজান নিতান্ত আশ্রয়ের অন্বেষণে আরাকান এসে উপস্থিত হন। তেসরা জুন ১৬৬০ খৃষ্টাব্দে স্বীয় পরিবার হেরেম ও এক ক্ষুদ্র অনুচর বাহিনীনিয়ে স্থল পথে আরাকানের উদ্দেশ্য পাড়ি জমালেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে সফর সঙ্গীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৫ শ জন বলে জানান। রোসাঙ্গের রাজধানী ম্রোহং এ পৌছেন ২৬ আগষ্ট ১৬৬০ খৃষ্টাব্দে। আরকানের রাজা সান্দা থু ধর্ম্মা পরম অতিথিয়েতার সাথে যুব রাজ শাহ সুজাকে গ্রহণ করেন। লেমর্রু নদীর তীরে বাবুধং পাহাড়ের পাদদেশে ওয়াথি ক্রেক নামক স্থানের নদীর উভয় পাশে বাশের তৈরী এক বাড়ী শাহসুজাকে অবসর যাপনের জন্য দেওয়া হয়। আরকান রাজার প্রতিজ্ঞা ছিল প্রকৃতি শান্তরূপ ধারন করলে অর্থাৎ শীত মৌসুমে খুব বড় এক সাম্রদ্রিক জাহাজে করে তাদের মক্কা নগরীতে পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে শাহসুজার। ইচ্ছা তিনি তার জীবনের বাকী দিন সমূহ মক্কা কাটিয়ে দেবেন।
আরকান রাজা মুগলদের রাজকীয় ঐশ্বর্য্য ও বিলাশের কথা শুনেছেন বটে। কিন্তু এত ঐশ্বর্য্য ছিল তা তার কল্পনাতীত। শাহ সুজার রাজকীয় ঐশ্বর্য্য দেখে রাজা সান্দা থু ধম্মা স্থীর থাকতে পারলেন না। তাছাড়া শাহ সুজা অপরূপ সুন্দরী কন্যা আমেনা বেগমকে দেখে সান্দা থু ধম্মা আরো পাগল হয়ে উঠলেন।
অধীর আগ্রহে শাহ সুজা অপেক্ষা করতে থাকেন শীত আসলো। শীতকাল বুঝি চলে যায়। রাজার প্রতিজ্ঞা পালনের কোন উদ্যোগ নেই। অগত্যা শাহ সুজা নেজেই একদিন রাজার কানে কথা তুললেন। বিনিময়ে সন্দা-থু-ধম্মা শাহ সুজার কাছে কন্যা আমেনা বেগমকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠান। প্রথমত: বিধর্মী, তদুপরি নীচবংশ-জাত রাজা সান্দা থু ধম্মা নীল রক্তের অধিকারী মুগল বংশের কন্যা সম্প্রদান এক অসম্ভব প্রস্তাব বলে সুজা পরিবারে বিবেচিত হয়। এমনকি সান্দা থু ধম্মা ম্রাউক-উ রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা সোলাইমান শাহের বংশজাতও নয়। প্রস্তাব প্রত্যাখান হলে সুজা পরিবারের সাথে আরাকান রাজার সংঘাত অনিভার্য হয়ে উঠে। ভীত শাহ সুজা গোপনে মাহপরাক্রমশালী মুসলিম আমাত্য ও সেনা নায়কদের সংঘবদ্ধ করে সান্দা থু ধম্মাকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। কিন্তু আরাকানের উধর্বতন অভিজাতদের কেহই শাহ সুজার কোন রূপ সাহায্যে এগিয়ে এলেন না। অতপর শাহ সুজা সাধারণ সৈনিক ও নাগরিকদের রোসাঙ্গ রাজা ও তার প্রতি উদাসীন মুসলিম আমাত্য ও সেনা নায়কদের বিরুদ্ধে উস্কানী দিয়ে স্বীয় পক্ষে নিয়ে আসার জন্য ষড়যন্ত্র করতে থাকেন। এবং রোসাঙ্গে  সিংহাসন দখলের চেষ্টায় মেতে উঠেন ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে। সেনাপতি ছৈয়দ মোহাম্মদের নেতৃত্বে রোসাঙ্গ সেনাবাহিনী শাহ সুজার প্রসাদ আক্রমণের প্রস্তুতি নিলে ৭ ফেব্রুয়ারী  ১৬৬১ খৃষ্টাব্দে শাহ সুজা প্রসাদ জ্বালিয়ে নিজ পরিবার হেরেম ও তিন শত অনুচর নিয়ে রাত্রের মধ্যেই অন্যত্রে সরে পড়েন। রোসাঙ্গ বাহিনী পিছু ধাওয়া করে শাহ সুজার তিন পুত্র ও কন্যাদের আটক করে  রাজার কাছে নিয়ে আসে। কিন্তু শাহ সুজা ও স্ত্রী পরিবানু নদীতে ডুবে মারা যান। আবার এমনো জনস্রোতি আছে, অনুসরণকারীরা পাথর নিক্ষেপ করে শাজ সুজাকে হত্যা করে, এমনকি শাহ সুজার মৃত দেহ পর্যন্ত সনাক্ত করা যায়নি।
১৫ ফেব্রুয়ারী, ১৬৬১ খৃষ্টাব্দে শাহ সুজার পুত্র কন্যাদের রাজার সম্মুকে উপস্থিত করা হয়। সান্দা থু ধম্মা তাদের কারারুদ্ধ করেন। পরে রাজ মাতার মধ্যস্থতায় এদের মুক্তি দেওয়া হয় এবং একটি সাধারণ কুটিরে বসবাস করতে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর রাজার দেহ রক্ষী বাহিনী বিদ্রোহ ঘোষনা করে রোসাঙ্গের রাজ প্রসাদ জ্বালিয়ে দেয়। এ বিদ্রোহের সাথে শাহ সুজার পুত্রেরাও জড়িত আছে ভেবে শাহ সুজার তিন পুত্রকে মারত্মাক কুটার আঘাতে হত্যা করা হয় এবং সুজা কল্যাদের অন্ধকার প্রকৌষ্টে বন্ধি করে অনাহারে মেরে ফেলা হয়।
আওরঙ্গজেব হয়তো শাহ সুজাকে পেলে হত্যা করতো কিন্তু দুর রোসাঙ্গ রাজ্যে ভ্রাতা ও পরিবারের করুন মৃত্যু কাহিনী তাকে বিচলিত করে তুলে। বিচক্ষণ সেনাপতি বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খানকে নির্দেশ দেন এর প্রতিশোধ নিতে। নবাব শায়েস্তাখান ১৬৬৬ খৃষ্টাব্দে চট্টগ্রাম আক্রমণ করে। রামু পর্যন্ত মোঘল অধিকারভুক্ত করেন।
 এদিকে শাহ সুজার করুন পরিণতি সারা ভারতে মুসলিম বিবেককে ভিষণ ভাবে নাড়া দেয়। দলে দলে মুসলমানেরা ভারত থেকে খোলা তলোয়ার হাতে আরাকান পাড়ি দিতে থাকে শুধু তাইনয়, খোদ রোসাঙ্গেও শুরু হয় চরম অসন্তোষ। শাহ সুজার পক্ষালম্বনের অপবাধে শুরু হয় বিভিন্ন মুসলমানের শাস্তি ও ধরপাকড়। মহা কবি আলাউলকে এ অপবাদে ২ বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়। কবি আল্উালের বর্ণনা মতে মির্জা নামক জনৈক কুচক্রী আলাওলের  বিরুদ্ধে অপবাদ এনে কারাদন্ডের ব্যবস্থা করেন। পরে মির্জাকেও শুলে চড়িয়ে মারা হয়।
১৬৮৪ খৃষ্টাব্দে সান্দা থু ধম্মার মৃত্যুর পর মুসলমানগণ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন। এদিকে চট্টগ্রাম থেকে মগ জলদস্যুরা সম্পূর্ণ ভাবে শায়েস্তা খানের হাতে পরান্ত হয়ে আরাকানের সামুদ্রিক উপকূল ভাগে জড়ো হয়। দস্যুবৃত্তি তখন অলাভজনক হয়ে পড়ে। ফলে মগ দস্যুরা ঘৃণার বশে  আরকানের বৌদ্ধদের মুসলমানের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানি দিতে থাকে। সুধীর্ঘ কাল ধরে পাষবিক বর্বরতায় অভ্যস্ত মগ দস্যুরা আরকান পৌছার পর আরকান নানা রূপে কুকর্মে ভরে উঠে। আরাকানের স্বাভাবিক পরিস্থিতি কুৎসিত হয়ে উঠে। বর্বরতা পাষবিকতায় আরকানের পরিবেশ নষ্ট হয়ে পড়ে। স্বদেশী বৌদ্ধরা ও দস্যুদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে রোসাঙ্গে মুসলমানের বিরুদ্ধে মগ দসুরা এক সম্প্রদায়িক দাঙ্গায় লিপ্ত হয়। মুসলমানেরা দাঙ্গায় লিপ্ত সকল মগদস্যুদের হত্যা করে। এতে স্বদেশী মগ বৌদ্ধও মুসলমানদের সাহায্য করে। দস্যুরা এ পরাজয়ের পর দাঙ্গা থেকে বিরত হলেও সম্প্রদায়িক উসকানী সৃুষ্টি থেকে বিরত থাকেনি। এতে বিক্ষোব্ধ মসুলমানদের অস্থিরতা আরো বেড়ে যায়।  সান্দা থু ধম্মার মৃত্যুর পর রোসাঙ্গে মুসলমান সৈনিক গণ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে। খোলা তলোয়ার নিয়ে তারা যত্রতত্র জ্বালিয়ে পড়িয়ে ছারকার করেত থাকে। ভারত থেকে আসা মুসলমানগণ এসে তাদের শক্তিবৃদ্ধি করতে থাকে। তারা যখন ইচ্ছা একজন রাজাকে ক্ষমতায় বসায় এবং যখন ইচ্ছা রাজাকে তাড়িয়ে দিতে থাকে।
আরাকানের মুসলমানদের এই অস্থিরতা ও অরাজকতায় পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে পালিয়ে আসা মগ জলদস্যুরা। বস্তুতঃ এই দস্যুরা ছিল স্বদেশী বৌদ্ধদেরও নিজেদের ঘৃণার পাত্র। সম্ভবতঃ এই ঘৃণার কারণেই আরাকানের বৌদ্ধরা নিজেদেরকে জাতিগতভাবে মগ পরিচয় না দিয়ে রাখ্যাইন বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। সে যাই হউক, আরাকানের সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মগরাই অর্থাৎ মগদস্যুরাই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ৬
অতঃপর ১৭১০ খৃষ্টাব্দে সান্দা-উইজ্যা নামক আরাকানের জনৈক সামন্ত রোসাঙ্গের ক্ষমতা দখল করেন এবং অত্যন্ত সুচতুরতার সাথে মুসলমানদের নিরস্ত করে আকিয়াব, রামরী প্রভৃতি এলাকায় কৃষিজ ভুমি দিয়ে মুসলমানদের কৃষি কাজে নিয়োজিত করেন। সান্দা উইজ্যা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে আরাকানের বিরাজমান অস্থিরতাকে সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখতে সক্ষম হলেও মগ জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রনাধীন আরাকানের সামাজিক শৃংখলা আর ফিরে আসেনি। মগ দস্যুদের প্রতাপের মুখে আরকানের অনাচার ও বিশৃংখলা আরও বৃদ্ধি পায়। সম্ভবতঃ অদ্যাবদি মগ দস্যুদের উ্ত্তর পুরুষদের অনাচার থেকে স্বশিক্ষিত রাখাইন সমাজ এখন ও মুক্ত হতে পারেনি। হয়তোবা রাখ্যাইন-রোহিঙ্গাদের ঐতিহ্যগত ঐতিহ্যসিক সম্প্রতি মগদস্যুদের সৃষ্ট অনাচার কুশিক্ষা অজ্ঞতা ও সাম্প্রদায়িক হানাহানি থেকে আরাকানকে মুক্ত করতে পারে। কেননা, এরাই হলেন বঙ্গোপসাগরের উপকূলের একটি সুপ্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকার।
যে যাই হউক শাহ সুজার আরকানের গমন ও তাঁর করুণ পরিণতি রোসাঙ্গ রাজ্যের রাজনীতি ও সামাজিক জীবনে রেখেছে এক সুদুর প্রসারী প্রভাব। রাজশক্তি ও সভ্যতার নির্মাতা মুসলিম শক্তির মধ্যেকার দ্বন্দ্বে সৃষ্টি হয় এক দারুন সংকট ও ভারসাম্যহীনতা। চরম শূন্যতার মাঝে আরাকানের সামাজিক নেতৃত্ব চলে যায় চট্টগ্রাম থেকে বিতাড়িত মগ জলদস্যুদের হাতে। আর এ সাথে নতুন করে আরাকানের সমাজ জীবনে শুরু হয় বর্বরতা ও পাশবিকতার এক নতুন লজ্জাস্কর ইতিহাস। আরাকানের এ গৃহবিবাদ ও পাষবিকতার সূত্র ধরে দলে দলে রাখাইন ও মুসলিম কক্সবাজার অঞ্চলে আসে। তাদেরকে সুদুর কুয়াকাটা থেকে টেকনাফের উপকূল পর্যন্ত বসতি করতে দেওয়ার জন্য তৎকালীন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ক্যাপটেন হিরাম কক্সকে দায়িত্ব দেন। যে সমস্ত রাখাইন বাংলাদেশে সমুদ্র উপকূলে বসবাস করছে তাদেরকে ক্যাপটেন কক্সই বসতি গড়ে দেয়। এই বিশাল আকারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্যাপটেন কক্সের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। অতঃপর তিনি ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে কক্সবাজারে মৃত্যুবরণ করেন।৭  এ বর্বরতা ১৭৯৩ পর্যন্ত চলতে থাকে এবং এখনো চলছে।
1. Arakan’s place in the civilization of Bay: by M.S. COLLIS in Collaboration With San Shwe Bu.
2. Eastern Bengal District Gazetters by L. S. S.O MALLEY.
3.  ইসলামাবাদ by আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ।
4. Studies in Dutch Relation With Arakan by D.G.E Hall.
5. Outlines of Burmese History by G.E Harver.
6. ফ্রান্সিস বোকাননের বর্ণনা দ্রষ্টব্য।
আদিল চৌধুরী, 
আজীবন সদস্য, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
০১৬১৮২৭৫৮০৩