রোহিঙ্গা শিবিরে সেভ দ্য চিলড্রেন’র আইসোলেশন ও চিকিৎসাকেন্দ্র

বার্তা পরিবেশক::
কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাসরতদের মধ্যে কোভিড-১৯ সন্দেহভাজনদের জীবন রক্ষায় শনিবার সেভ দ্য চিলড্রেন ৬০ শয্যার একটি নতুন আইসোলেশন ও চিকিৎসাকেন্দ্র’র আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে।

সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ইনফেকশন আইসোলেশন অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার বা সারি আইটিসি কেন্দ্রটি টেকনাফ উপজেলার হোয়াইকং ইউনিয়নের চাকমারকুল গ্রাম ও ২১ নাম্বার ক্যাম্পে অবস্থিত। কেন্দ্রটি বাংলাদেশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইন্টার সেক্টর কোওর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) পরামর্শ অনুযায়ী এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে তৈরি করা হয়েছে। নতুন এই আইসোলেশন ও চিকিৎসাকেন্দ্রটি আগামী ৪ জুলাই থেকে চিকিৎসা প্রদান শুরু করবে।

অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে হাত ধোয়া সহ পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থাগুলো অপ্রতুল এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, সেলফ-আইসোলেশন ইত্যাদি বস্তুত অসম্ভব। ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন রোহিঙ্গা শরণার্থী এখানে মৃত্যুবরণও করেছেন। এরকম একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় করোনাভাইরাসের ব্যাপক আক্রমণ এবং প্রাদুর্ভাব সময়ের ব্যাপার মাত্র। শরণার্থী শিবিরের আশেপাশে থাকা স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এই ঝুঁকির বাইরে নয়।

এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে রক্ষা ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে সেভ দ্য চিলড্রেন এই আইসোলেশন ও চিকিৎসাকেন্দ্রটি নির্মাণ করেছে। এতে অর্থায়ন করেছে ইউকে এইড এবং ইউএনওপিএস। চিকিৎসা কেন্দ্রটি নির্মাণকালে সেভ দ্য চিলড্রেন স্থানীয় ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নেতা এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে এবং এতদঅঞ্চলে চিকিৎসা কেন্দ্র নির্মাণের গুরুত্ব আলোচনা করে ও সিআইসি, উপজেলা চেয়ারম্যান ও অন্যান্যদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে নির্মাণ এলাকা পরিদর্শন করে। পরে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ, অংশীদারীত্ব ও সেবা উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সারি আইটিসি সাপোর্ট কমিটি গঠন করে।

আয়োজিত অনাড়ম্বর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল সংযোগে যোগদান করেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবসান কমিশনার মাহবুব আলম তালুকদার, অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবসান কমিশনার কাজী মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, সিভিল সার্জন- কক্সবাজার ডাঃ মুহাম্মদ মাহহবুবুর রহমান, ইন্টার সেক্টর কোওর্ডিনেশন গ্রুপের সিনিয়র কোওর্ডিনেটর নিকোল এপটিং এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হেলথ সেক্টর কোওর্ডিনেটর ড. মুকেশ কুমার প্রজাপতি। তাছাড়াও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে সরেজমিনে যোগদান করেন ক্যাম্প ২১-এর ক্যাম্প ইন চার্জ সাব্বির ইকবাল, সহকারী ক্যাম্প ইন চার্জ সিরাজুল ইসলাম এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

বাংলাদেশে সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যান ভ্যান ম্যানেন বলেছেন, “শিশুরা আমাদের বলেছে তারা মারা যাবে বলে ভয় পাচ্ছে। মৃত্যু ভয় বা স্বজন হারানোর ভীতি শিশুদের জন্য বিশেষ কষ্টদায়ক। এই শিশুদের অনেকেই এর মধ্যে মিয়ানমার থেকে ভয়ানক বেদনা এবং স্বজন হারানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে। তাদের মিয়ানমারে নিজ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং তিন বছর ধরে অতি ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরে গাদাগাদি করে বাস করতে হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আমরা শিবিরগুলো করোনাভাইরাস মুক্ত রাখার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছি, যদিও আমরা বুঝতে পারছি তাদের আক্রান্ত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বাংলাদেশ সরকার এবং অন্যদের সঙ্গে সেভ দ্য চিলড্রেন মানুষকে সচেতন করা এবং করোনাভাইরাসের বিস্তার ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আমরা চাই শিশুরা যাতে স্বাস্থ্য সেবা পায় এবং তাদের নিরাপদ রাখা যায়।”

“আমাদের নতুন চিকিৎসা কেন্দ্রে মাঝারি থেকে মারাত্মক সংকটাপন্ন করোনা আক্রান্ত অথবা সম্ভাব্য আক্রান্তদের সেবা দেওয়া হবে। ৮০ জন স্বাস্থ্যকর্মীর একটি বিশেষজ্ঞ দল এবং সহযোগীদের দিয়ে চিকিৎসা কেন্দ্রটি চালানো হবে। সেভ দ্য চিলড্রেনের নিজস্ব জরুরি স্বাস্থ্য ইউনিটের কর্মীরা, যারা সংক্রমণ রোধে ব্যাপক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তারাও এর সঙ্গে যুক্ত হবেন। করোনা আক্রান্ত সন্তানসম্ভবা নারীদের নিরাপদ সন্তান প্রসবের জন্য একটি প্রসূতিকেন্দ্রও এখানে থাকবে,” যোগ করেন সংগঠনটির বাংলাদেশ প্রধান।

সেভ দ্য চিলড্রেনের জরুরি স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান রাচেল পাউন্ডস বলেন, “বিশ্ব সম্প্রদায়কে দ্রুত বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসতে হবে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাঁদের আশ্রয়দানকারী কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য করোনাভাইরাস মোকাবিলায় অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তা বিপর্যয়কর প্রাণহানির কারণ হতে পারে।”

“আমরা জানি না ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোতে কোভিড ১৯ কী রকম তাণ্ডব চালাবে। এসব শিবিরে শিশুরা সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপ্রবণ। কারণ তারা নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, ভ্যাকসিন এবং পুষ্টির অভাবে আছে। ফলে এখানে সংক্রমণ সবচেয়ে মারাত্মক হতে পারে,” বলেন তিনি।

পাউন্ডস বলেন, “কঙ্গোতে ইবোলা ভাইরাস মোকাবিলায় আমরা যেভাবে সচেতনতা তৈরির কাজ করেছিলাম, কক্সবাজারে কোভিড-১৯ মোকাবিলায়ও তা প্রয়োজন। শিশু এবং বয়স্কদের আত্মরক্ষার কৌশল সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সক্ষম বানানোর মাধ্যমে সংক্রমণ কমানোই সবচেয়ে ভালো উপায়।”

“আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশ সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা করতে, এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ও কক্সবাজারের স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দ করা নিশ্চিত করতে হবে। নিষ্ক্রিয়তার ফলে বিপর্যয়পূর্ণ জীবনক্ষয় হতে পারে যা কিনা প্রতিরোধযোগ্য।”

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন