রোহিঙ্গা প্রভাবে বাড়ি ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য

ওমর ফারুক হিরু :
কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া এলাকায় পরী জামান ম্যানশনের নীচ তলার দুই রুমের একটি বাসা ৭ হাজার টাকায় ভাড়া নেন ফাউজিয়া আফরিন নামে এক গৃহিনী। গত এপ্রিল মাসে নেওয়া এই ভাড়া বাসার দাম আগে ৫ হাজার টাকা থাকলেও তাকে ভাড়া দেওয়া হয় ৭ হাজার টাকায়। বাসা ভাড়ার বাইরে বিদ্যুৎ বিল। এদিকে দুই মাস যেতে না যেতেই এক লাফে ১ হাজার টাকা ভাড়া বাড়িয়ে করা হয় ৮ হাজার টাকা। এরমধ্যে বিদ্যুৎ বিলে ছিল গরমিল। বাড়িওয়ালার ইচ্ছে মত ১ হাজার ১২ শত টাকা করে বিল পাঠানো হত। সুনিদৃষ্ট মিটারও তারা সনাক্ত করে দেয়নি। সবমিলে ওই ৫ হাজার টাকা দামের ভাড়া বাসার দাম দিতে হয় ৯ হাজার টাকা। এছাড়া পৌরসভার নালার পাশে গড়ে উঠা ওই বাসায় একে একে দুই বার চুরি হওয়ায় ফলে বাড়িওয়ালাকে জানালায় শক্ত নেট লাগানোর অনুরোধ করলেও তিনি পাত্তা দেননি। এক লাফে ভাড়া বাড়ানো, বিদ্যুৎ বিলে অস্বচ্ছতা, বাসায় চোরের উপদ্রপ এতসব অব্যবস্থাপনার কারন জানতে চাইলে বাড়িওয়ালা স্পষ্ট জানান, কিছুই করার নেই। সমস্যা হলে বাসা ছেড়ে দিতে পারেন। পরে তারা ওই বাসা ছেড়ে দেন। এমনই অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী গৃহিনী ফাউজিয়া আফরিন।
একইভাবে শহরের গাড়ির মাঠ এলাকার সাইফুল ইসলাম নামে আরেক ভাড়াটিয়া জানান, গাড়ির মাঠের দুই নাম্বার গলির দুই রুমের ৩ হাজার টাকা দামের এক বাসায় তিনি গত ৪ বছর ধরে পরিবার নিয়ে থাকছেন। সেই থেকে ওই ভাড়া বাড়তে বাড়তে সাড়ে ৪ হাজার টাকা হয়। এদিকে গত ৫ মাস আগে হঠাৎ ওই বাসার ভাড়া আরো ২ হাজার টাকা বাড়িয়ে করা হয় ৭ হাজার টাকা। দীর্ঘ দিনের পুরাতন ভাড়াটিয়া সাইফুল ইসলাম বাড়িওয়ালার কাছে জানতে চান এনমটি কেন হচ্ছে। তখন বাড়িওয়ালা জানান, সব জায়গায় ভাড়া বাসার দাম বাড়ানো হয়েছে। তাই নিয়ম অনুযায়ী আমারও ভাড়া বাড়াতে হয়েছে।
এই ধরনের অভিযোগ শত শত ভাড়াটিয়ার। এমনও অভিযোগ আছে নানা অজুহাত দেখিয়ে পুরাতন ভাড়াটিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে বেশি টাকা দিয়ে নতুন ভাড়াটিয়া নিচ্ছে।
শুধু শহরে নয় উখিয়া-টেকনাফের চিত্র আরো ভয়াভহ। ওখানে সুবিধাবাদি লোকজন ঘর ভাড়াকে বড় বানিজ্য হিসেবে নিয়েছে। এমনও খবর আছে গরুর গোয়াল ঘর পর্যন্ত একটু পরিচর্যা ভাড়া বাসা তৈরী করে ভাড়া দিচ্ছে। ওই এলাকায় যে বাসা ৫০০ টাকায় ভাড়া দিত সেই বাসা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে ৫ হাজার টাকায়।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার সেবা প্রদানে কাজ করছে দেশি-বিদেশী এনজিও সহ আন্তর্জাতিক সংস্থার লোকজন। একদিকে রোহিঙ্গা অন্যদিকে তাদের সেবা প্রদানে নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের কারনে শহরে বেড়েছে ভাড়া বাসার চাপ। আর এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে বাড়ির মালিকেরা। তারা ইচ্ছেমত বাড়ি ভাড়া বাড়াচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, যতই বাড়ি ভাড়া ভাড়া করা কেন কোন বাসা খালি যাচ্ছেনা। রীতিমত অগ্রিম বুকিং হয়ে যাচ্ছে। আর এই সুযোগে কিছু অসাধু বাড়িওয়ালা কোন কিছু তোয়াক্কা না করে যাচ্ছে তাই বাড়ি ভাড়া বাড়াচ্ছে। এতে ভোগান্তির শেষ থাকছেনা সাধারণ ভাড়াটিয়াদের।
এই অব্যবস্থাপনার ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তেমন কোন আইন প্রয়োগ না থাকায় হতাশ সচেতন মহল। তারা বলছে এই বিষয়টি নিয়ে দ্রুত আইন প্রয়োগ জরুরী হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে প্রকৌশলী কানন পাল জানান, কক্সবাজারে বাড়ি ভাড়ার উপরে গনপূর্ত বিভাগের একটি সুনিদৃষ্ট আইন থাকলেও তা বাস্তবে প্রয়োগ নাই। বর্তমান সময়ে এই শহরে যেভাবে বাড়ি ভাড়ার দাম বাড়ছে তা কোনভাবে মঙ্গলজনক নয়। মূলত রোহিঙ্গাদের কারনে এই শহর ও উখিয়া-টেকনাফে বাড়ি ভাড়ার চাপ বেড়েছে। আর অসাধু ব্যবসায়ীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অপচর্চা করছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা চলে গেলে এই বাড়িওয়ালারা কি করবে।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটিজ ফোরামের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী জানান, অনেক অসাধু বাড়িওয়ালা লোভে পড়ে পুরাতন ভাড়াটিয়াদের পর্যন্ত বের করে দিচ্ছেন। এনমও দেখা যায় ৫ হাজার টাকা দামের বাসা ভাড়া দিচ্ছে ১০ হাজার টাকায়। অগ্রিম নিচ্ছে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে কক্সবাজারের অর্থনীতিতে পর্যন্ত মারাত্বক প্রভাব পড়ছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়টি নজরে আনা দরকার। আর এই অসাধু বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
শরনার্থী ত্রান ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোঃ আবুল কালাম জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আন্তজার্তিক সহ দেশি-বিদেশী শতাধিক সংস্থা কাজ করছে। আর এসব সংস্থার সাথে জড়িত রয়েছে ১০ হাজারেরও অধিক লোকজন। যাদের বেশিরভাগই অবস্থান করছে শহরে।
জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন জানান, কক্সবাজার শহরে বাড়িভাড়া বাড়ার বিষয়টি তিনি অবগত রয়েছেন। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। এ আইন প্রয়োগে শহরের আশপাশে বাড়ির মালিকদের সাথে মিটিং করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংশ্লিষ্টদের সাথে বসে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুত্র: দৈনিক কক্সবাজার