রোহিঙ্গা জ্বালানির চাহিদা মেটাতে বন সাবাড়

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ॥

জ্বালানি হিসেবে এখনও বনাঞ্চল ধ্বংস করে চলেছে উখিয়া টেকনাফে আশ্রিত লাখ লাখ রোহিঙ্গা। প্রত্যেহ সকালে কিশোর কিশোরী ও প্রাপ্ত বয়স্ক রোহিঙ্গারা দা হাতে সারিবদ্ধভাবে যায় বনাঞ্চলে। নির্বিচারে কেটে নিয়ে আসছে বনের কচি চারাগাছ। বন রক্ষার খাতিরে এত বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জ্বালানি হিসেবে কয়লা বরাদ্দ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

জানা যায়, আশ্রিত ক্যাম্পগুলোর আশপাশে সবুজ বনাঞ্চল নেই বললে চলে। রোহিঙ্গারা টেকনাফ উখিয়ার বিভিন্ন স্থানে সৃজিত বন ও সামাজিক বনায়ন কেটে সাবাড় করে দিয়েছে। বন রক্ষা কল্পে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীরা তৎপরতা চালালেও ‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী’ এ অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। জ্বালানি হিসেবে বনের গাছ ধ্বংস করে চলেছে রোহিঙ্গারা।

ইতোপূর্বে জ্বালানি হিসেবে রোহিঙ্গাদের এলপি গ্যাস সরবরাহ করা হলেও কেউ কেউ গোপনে ওই গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে রোহিঙ্গারা অনভিজ্ঞ। এতে যে কোন সময় বিপদ ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে এলপি গ্যাস সরবরাহ করা বিপজ্জনক এবং যেকোন সময় বড় দুর্ঘটনাও হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অভিজ্ঞমহল।

গত সপ্তাহে কুতুপালং ক্যাম্পে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করতে গিয়ে পুড়ে গেছে তিনটি কক্ষ। অগ্নিদগ্ধ হয়ে আহত হয়েছে চার রোহিঙ্গা। তাই বনাঞ্চল ও পরিবেশ রক্ষার খাতিরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে রোহিঙ্গাদের কয়লা সরবরাহ করা উত্তম মনে করছেন তারা।

এ দিকে দলে দলে নতুন রোহিঙ্গা আগমনের আগেও সরকার এবং বিভিন্ন এনজিও সংস্থা রোহিঙ্গাদের তুষ সরবরাহ করেছে। তবে রোহিঙ্গারা তুষের ওসব বস্তা সকালে ত্রাণ হিসেবে নিয়ে রাতে এক শ্রেণীর দালালের মাধ্যমে ফের ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দেয়। ওই টাকা জমা রেখে বনে গিয়ে লাকড়ি সংগ্রহ করে নিয়ে আসে আশ্রয় শিবিরের রোহিঙ্গারা। এতে বনকর্মীরা কোনভাবেই বন রক্ষা করতে পারছে না বলে জানা গেছে।

রোহিঙ্গা নারীরা যেহেতু স্বদেশে রান্নার কাজে বনের কাঠের ওপর অভ্যস্ত, সেহেতু এলপি গ্যাস, তুষ জ্বালানি হিসেবে তাদের পছন্দ হচ্ছে না। এ বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা পরিবারের খাবার তৈরির জন্য জ্বালানি হিসেবে তারা ব্যবহার করছে বনের কাঠ। বনাঞ্চল ছাড়াও আশপাশের সামাজিক বনায়নসহ বিভিন্ন ভিটাবাড়ির বৃক্ষের ওপরও পড়েছে খড়গ। অনেকে রাতের আঁধারে স্থানীয়দের বেড়া ও চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।

ad

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এনজিও কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মহিলারা রান্নার কাজে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করতে অভ্যস্ত নয়। সিলিন্ডারের পাইপ, গ্যাসের রেগুলেটর ইত্যাদির ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা নেই মোটেও। গ্যাসের রেগুলেটরের নজল সংযুক্ত পাইপ দিয়ে ঢেকে রাখা, গ্যাস বন্ধ করার আগে গ্যাসের পাইপ গরম বার্নারের গায়ে লেগেছে কী না দেখা ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞাত নয় রোহিঙ্গা নারীরা। ক্যাম্পে এলপি গ্যাস ব্যবহারকারী রোহিঙ্গা নারীদের অনেকেই গ্যাসের রেগুলেটর বা দেয়াশলাই ব্যবহারের পর অবহেলার সঙ্গে তা রেখে দেয় সিলিন্ডারের ওপর। এতে যে কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানিয়েছেন অভিজ্ঞজনরা।

ওয়াকিবহাল মহল বলেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্ব হলে রোহিঙ্গাদের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কয়লা দেয়া যেতে পারে।

পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় উজাড় হওয়া গাছের বিকল্প হিসেবে নতুন করে পাহাড়ে চারাগাছ লাগানো দরকার। তারা বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে উখিয়া টেকনাফ এলাকার যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা কখনও পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। হয়তো ন্যাড়া পাহাড়গুলোতে চারাগাছ লাগিয়ে সবুজ বনাঞ্চল গড়া সম্ভব হবে। তবে রোহিঙ্গারা যেসব পাহাড়-টিলা কেটে বসতি গেড়েছে, বিলীন করেছে বহু পাহাড়। এতে কোটি টাকার বিনিময়েও একটি পাহাড় গড়া সম্ভব হবে না।

সূত্র জানায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সেনা অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সোয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে উখিয়া টেকনাফের ২০টি ক্যাম্পে। রোহিঙ্গাদের পয়ঃনিষ্কাশনের দূষিত পানি মৎস্য প্রজেক্টে ঢোকার কারণে টেকনাফ উখিয়া এলাকার বহু প্রজেক্টের কোটি কোটি টাকার চিংড়িসহ মারা গেছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এ ছাড়াও রোহিঙ্গাদের পাহাড় কাটা বালুমিশ্রিত পানি বিভিন্ন প্রজেক্টে-মৎস্য ঘেরে পড়ে বিষক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ঘের চাষীরা জানায়, বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ওই দূষিত পানি প্রজেক্টে প্রবাহিত হওয়ায় স্থানীয় সব ঘেরে মাছ মারা গেছে।