রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তৎপর ৪ বিদেশি এনজিও

বিদেশিরা এনজিও ব্যুরোর অনুমোদন ছাড়াই কাজ করছেন * ভাসানচরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অনশনে উদ্বুদ্ধের চেষ্টা * বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধিত হতে নিরুৎসাহিত করা * সরকারের ভাবমূর্তির জন্য হুমকির আশঙ্কা

উখিয়া নিউজ ডেস্ক::

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চারটি বিদেশি এনজিও সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর বিদেশি কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের নানাভাবে উসকানি দিচ্ছে। তারা ভাসানচরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের অনশনে উদ্বুদ্ধের চেষ্টা করছে। নিরুৎসাহিত করছে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধিত হওয়ার বিষয়ে। তাদের একজন নিজের অবস্থান গোপন রাখতে গোপনে বাড়ি ভাড়ার চেষ্টা করেন। অন অ্যারাইভাল ভিসায় তারা দেশে প্রবেশ করছেন।

কর্মকর্তাদের অধিকাংশই এনজিও ব্যুরোর অনুমোদন ছাড়াই কাজ করছেন। এ ধরনের কাজে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ মাদক ও হত্যা মামলার এক আসামি তাদের সহযোগিতা করছে। স্থানীয় এমপি প্রার্থীসহ একাধিক জনপ্রতিনিধি রোহিঙ্গাদের নিয়ে ভোটব্যাংক গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জাতীয় নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের শৃঙ্খলা এবং সরকারের ভাবমূর্তির জন্য হুমকি বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার ৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে একই মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ, পুলিশের মহাপরিদর্শক ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে কক্সবাজারে অবস্থানরত বিদেশি এনজিও’র কর্মীদের বাংলাদেশে আগমন, প্রস্থান, পুনরায় আগমন ও গতিবিধির বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ভোটব্যাংক বানানোর জন্য স্থানীয় এমপি প্রার্থীদের কর্মকাণ্ডও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, কক্সবাজার জেলার বালুখালী, কুতুপালং, আঞ্জুমানপাড়া ও নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিক, এনজিও’র গোপন তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এসব রোধে সাত দফা সুপারিশ করা হয়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের একটি প্রতিবেদন আমাদের হাতে এসেছে। রিপোর্টটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। যদি প্রতিবেদনের তথ্য সত্য হয়, তাহলে ওইসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবিক বিষয়কে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় যে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল বা মৌলবাদী, সন্ত্রাসী, জঙ্গি গোষ্ঠী আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গাদের ব্যবহারের চেষ্টা চালাতে পারে। এতে ভবিষ্যতে দেশের স্থানীয়, অভ্যন্তরীণ ও জাতীয় নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা আছে। রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্য দেয়ায় কাজে নিয়োজিত এনজিওগুলোয় স্থানীয়দের পরিবর্তে রোহিঙ্গাদের চাকরি দেয়া হচ্ছে। এ নিয়েও স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

৪ এনজিও’র বিদেশি কর্মকর্তাদের সন্দেহজনক আসা-যাওয়া : কোডেক, এমডিএস ও মোয়াসসহ ৪টি এনজিও’র বিদেশি কর্মকর্তারা ঘন ঘন বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করছেন। এসব এনজিওতে কর্মরত অধিকাংশ কর্মকর্তা অন অ্যারাইভাল ভিসা অথবা ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে আসছেন। ১ মাস অবস্থানের পর পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে চলে যাচ্ছেন। সেখানে কিছুদিন পার করে আবারও বাংলাদেশে এসে এনজিও’র কাজে নিযুক্ত হচ্ছেন। উচ্চ বেতনে এক মাস অন্তর অন্তর চাকরি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করছেন। ইমিগ্রেশন ডাটাবেজে যার তথ্য আছে। বিনিয়োগ ও পর্যটনবান্ধব শিথিল ভিসা নীতির কারণে উপার্জিত অর্থ আয়কর জালের বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

বিদেশি এনজিও মোয়াসের নির্বাহী কর্মকর্তা মার্কো কুচি ৩০ সেপ্টেম্বর অন অ্যারাইভাল ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। পরে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ায় দেশ ত্যাগ করেন। ২৩ নভেম্বর আবার অন অ্যারাইভাল ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এ সময় ইমিগ্রেশন ডাটাবেজে অসম্পূর্ণ ঠিকানা দেন। মার্কো কুচি (পাসপোর্ট নং-০৯৯৭৯৫৭) ২ মাস ধরে এনজিও কর্মকাণ্ড চালানোর পাশাপাশি শহিদ ও ম্যাক্স মোহাম্মদ নামের দুই ব্যক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধনে না আসার এবং ভাসানচরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত এলে রোহিঙ্গাদের অনশন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন।

বাংলাদেশের নাগরিক শহিদুল্লাহ ওরফে শহিদ মোয়াসের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই শহিদ মাদক ও হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ও কারাভোগ করেছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহিদ এনজিও কার্যক্রম বা মানবতার সেবা সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। সে কক্সবাজার অঞ্চলের মানবতার সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর নীতিনির্ধারক পর্যায়ে থাকলে যে কোনো মুহূর্তে সরকারের ইমেজ নষ্ট করার মতো কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। শহিদের প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় ৬ জন মাঝি সরকারবিরোধী প্রচারণা সংবলিত লিফলেট বিতরণের জন্য সংঘবদ্ধ হয়েছে। একই এনজিও’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইতালির নাগরিক লিওটা রেজিনা অবস্থান গোপন করে বাড়ি ভাড়া নেয়ার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া মোয়াসে কর্মরত নিকোলা নামের এক বিদেশি নাগরিকের কর্মকাণ্ড সন্দেহজনক।

মোয়াসের তৃতীয় প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় বিভিন্ন ক্যাম্পে কার্যক্রম তদারকি করেন ব্রিটিশ নাগরিক জেনিফার লুইস লওস (পাসপোর্ট নং-২১০৬৬৯৯৮০)। অন অ্যারাইভাল ভিসায় তিনি ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশে আসেন। থাকেন ইনানীর রয়েল টিউলিপ হোটেলে। তার এনজিওতে কাজ করার বিষয়ে এনজিও ব্যুরো অনুমোদন নেই। নিয়মবহির্ভূতভাবে এনজিও কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ধরনের কাজে তিনি জড়িত হচ্ছেন।

কোডেক নামের আরেক এনজিও’র প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন নেপালি নাগরিক বিনোদ প্রসাদ শ্রেষ্ঠ (পাসপোর্ট নং-০৭৪৩২৪৬৪)। ১১ অক্টোবর বাংলাদেশে আসেন। অথচ এনজিওবিষয়ক ব্যুরো কর্তৃক এনজিও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তার কোনো অনুমোদন নেই। ২৮ অক্টোবর দেশ ত্যাগের পর ২০ নভেম্বর তিনি পুনরায় বাংলাদেশে আসেন। ইমিগ্রেশনে তিনি বনানীর ঠিকানা দিয়েছেন, যা অসম্পূর্ণ। তার সঙ্গে রাজন নামের আরেক বিদেশি কাজ করছেন।

এছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তানের যৌথ মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত ২টি এনজিও কাজ করছে। এদের আরবিতে লেখা ব্যানার বালুখালী ২নং ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে ঝোলানো আছে। তবে এ এনজিও দুটির কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পাওয়া যায়নি। টেকনাফের পানখালী রোডের হ্নীলা দারুস সুন্নাহ মাদ্রাসায় ২৫-৩০ জন রোহিঙ্গা ছাত্র হিসেবে ভর্তি হয়ে ছাত্রাবাসে অবস্থান করছে। এদের প্রায় ২০ জনের বিরুদ্ধে মিয়ানমারে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে এনজিওগুলোর কর্মকাণ্ডে লাগাম টানতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২ অক্টোবর পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে গঠিত রোহিঙ্গা সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্সের সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ত্রাণ দিতে হলে এনজিওগুলোর মন্ত্রাণালয় থেকে অনাপত্তিপত্র নিতে হবে। এক্ষেত্রে দেশীয় এনজিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণালয় এবং বিদেশি এনজিওগুলোর স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্র উভয় মন্ত্রাণালয় থেকে অনাপত্তি নিতে হবে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড : গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে টেকনাফ ও উখিয়া থানা এলাকার সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীরা নিজেদের ভোটব্যাংক সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। এর অংশ হিসেবে তারা রোহিঙ্গাদের মাঝে আস্থা সৃষ্টির চেষ্টা এবং তাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব দেয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন। স্থানীয় এক সংসদ সদস্য মোয়াস এনজিও’র লজিস্টিক কো-অর্ডিনেটর শহিদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন। এ সংসদ সদস্য শহিদের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন। এছাড়া সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন হতে নিরুৎসাহিত করছেন।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে এসএমএস করলেও উত্তর দেননি।

পরে অপর এক জনপ্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা আজিজ উদ্দিন। এ জনপ্রতিনিধি অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা। কেউ প্রমাণ দিতে পারলে শাস্তি ভোগ করতে রাজি আছি। রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে প্রতিবেদনে এসব উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে যে রোহিঙ্গা নাগরিকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাকে আমি চিনি না।

৭ সুপারিশ : রোহিঙ্গা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অন অ্যারাইভাল ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনসহ ৭টি সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এগুলো হচ্ছে- মোয়াসের কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। অনুমোদিত-অননুমোদিত রোহিঙ্গা মুসল্লিদের ইজতেমায় যোগদান থেকে বিরত রাখতে হবে। মোয়াসের কো-অর্ডিনেটর শহিদকে এনজিও কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে দেয়া যাবে না। এছাড়া ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসায় আগত বিদেশিদের দেশত্যাগের আগে আয়কর আইন অনুযায়ী বিমানবন্দরে ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।  সুত্র  ‍যুগান্তর