রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রকল্পে যোগ হচ্ছে ২১ কোটি টাকা পরামর্শক ব্যয়

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করতে চলমান প্রকল্পটি সংশোধনের প্রস্তাব এসেছে পরিকল্পনা কমিশনে। মাঝপথে এসে প্রকল্পের সংশোধনীতে পরামর্শক ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, এই ব্যয় অবশ্য আরও বেশি প্রাক্কলন করা হয়েছিল। তাদের আপত্তির মুখে সেই ব্যয় কিছুটা কমানো হয়েছে।

‘কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন কার্যক্রমে জরুরি সহায়তা’ শীর্ষক প্রকল্পটিতে সার্বিকভাবেও ব্যয় বেড়েছে ৫২ শতাংশেরও বেশি। ২০১৮ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন মেয়াদে ৫৮৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে কিছু অঙ্গের ব্যয় বাড়িয়ে নতুন ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯২ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সরকারের তহবিল থেকে এই প্রকল্পের ব্যয় আসছে প্রায় ৩০ শতাংশ টাকা। বাকি টাকা আসছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অনুদান থেকে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলমান প্রকল্পের মাঝ পথে এসে কেন এত পরামর্শক ব্যয় লাগছে— সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেনি কমিশন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) মামুন-আল-রশীদ সারাবাংলাকে বলেন, অনুদানের প্রকল্পে সাধারণত শর্ত অনুযায়ী কিছু পরামর্শক থাকে। এছাড়া এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গেলে পরামর্শক প্রয়োজন আছে। তবে সেই পরামর্শক ব্যয় যতটা কম রাখা যায়, আমরা সে চেষ্টাটাই করেছি।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, গত ১২ মে অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভা। ওই সভায় বলা হয়, পরামর্শক ব্যয় বাবদ ২০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে বলা হয়, পরামর্শক বাবদ ব্যয় ২০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে ১৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া সার্ভে, ইনভেস্টেগেশন অ্যান্ড ট্রেনিং খাত অঙ্গটি পরামর্শক খাত থেকে বাদ দিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে ব্যয় কমিয়ে আইবাস অনুযায়ী স্বতন্ত্র দেখাতে হবে বলে মত দেয় পিইসি সভা। এর জবাবে স্থানীয় সরকার বিভাগ বলেছে, মূল অনুমোদিত ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ডিজাইন ও সুপারভিশন পরামর্শক খাতে সার্ভে, ইনভেস্টেগেশন অ্যান্ড ট্রেনিং অঙ্গটি একীভূত থাকায় এই খাতে এরই মধ্যে ব্যয় করা ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা পরামর্শক খাতে দেখানো হয়েছে।

পিইসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সার্ভে, ইনভেস্টেগেশন অ্যান্ড ট্রেনিং অঙ্গটি পরামর্শক খাত থেকে বাদ দিয়ে নতুন অঙ্গ প্রদর্শন এবং এ খাতে যৌক্তিকভাবে অবশিষ্ট এক কোটি ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৬৬ লাখ ২৩ হাজার টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।

প্রকল্পটির সংশোধনী প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসরত মিয়ানমারের বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। তাই নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য পাইপ ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেম উইথ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, রিজারভার ব্যাংক ও সরকারের অনুদানে মোট ৫৮৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্পটির সুষ্ঠু বাস্তবায়নের সুবিধার্থে বাস্তব প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় বাড়ানোসহ কয়েকটি নতুন অঙ্গ সংযোজন করে প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ও বাড়তি ধরা হয়েছে ৩০৬ কোটি ৬৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৮৯২ কোটি টাকায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ২৬৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং এডিবি’র অনুদান থেকে ৬২৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

প্রকল্প সংশোধনের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, গত ২২ মে বাংলাদেশ সরকার ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে এই প্রকল্পের অতিরিক্ত অর্থায়নের বিষয়ে অনুষ্ঠিত হয় গ্র্যান্ট নেগোসিয়েশন মিটিং। সেখানে প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ে নেওয়া পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও জনস্বাস্থ্য মোকাবিলায় নতুন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়।

স্থানীয় সরকার বিভাগ বলছে, ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পের অধীনে সাতটি ওয়াটার ক্যারিয়ার, ২৬টি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ট্রাক কেনা, চারটি হাইড্রলিক রিগ, ৪০টি মিনি পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই, ৮০০টি কমিউনিটি গোসলখানা, চারটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং আটটি সমন্বিত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিটের সংস্থান রাখা হয়েছে।

এছাড়া নতুন অঙ্গ হিসেবে একটি সারি-আইটিসি সেন্টার স্থাপন, ছয়টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র, এক হাজার জরুরি সরঞ্জাম কেনা এবং ২৫০ জন স্বাস্থ্যসেবাকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়গুলোও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রকল্প এলাকায় জমি পাওয়ায় দেরি হওয়া, যথাসময়ে বন ও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র না পাওয়া ও কোভিড-১৯ এর জন্য লকডাউনের কারণে কাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। সুত্র: সারা বাংলা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন