রোহিঙ্গা ইস্যুতে অং সান সু চি; গনতন্ত্রের রং করা একটি কাঠের পুতুল

ক্লান্ত বিষন্ন শরীর, অসহায় মানুষগুলির বদনখানি দেখতে দেখতে মনটা বিষাদে ছেয়ে গেছে। কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মহামারীর আঘাতে দেশত্যাগী শরণার্থী নয় আজকের রোহিঙ্গারা। মনুষ্য সৃষ্টি হিংসা আর বিদ্বেষানলের অনলে পুড়েছে তারা। স্বজাতি কর্তৃক জাতিগত নিধনের স্বীকার তারা। কোলের শিশুদের কলা গাছ কাটার মতো করে যে নির্মম হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তা শুনে রীতিমত স্তব্ধ হয় আমাদের বিবেক।রোহিঙ্গা বালুখালী ক্যাম্প ঘুরে এসে আবারও কলম ধরলাম সমসাময়িক পরিস্হিতি বর্ননা করতে পাঠক সম্মুখে। দ্বিতীয় দফায় উখিয়া যাবার আগ মুহুর্তে ভেবেছি প্রথমবার যখন গেলাম ততটা উপলব্ধি আর ঘুরে দেখা হয়নি রোহিঙ্গাদের অবস্থান মানুষের ভীড়ে। শেষে আরেকটি দিন ঘুরে আসার পরিকল্পনায় রোহিঙ্গাদের পাশে পুনরায় পৌঁছালাম।
যাদের আমরা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী মুসলিম হিসাবে জানি, তাদের কাছেই শুনলাম কি ঘটনাগুলো ঘটেছিল তাদের ওপর।

মানব সেবাই পরম ধর্ম এবং মানুষ মানুষের জন্য এই উপলব্ধি থেকে আমরা গত ১৮ই অক্টোবর বৃহস্পতিবার আবারও আমার প্রিয় প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম হতে ছুটে গিয়েছিলাম রোহিঙ্গাদের পাশে।
আমাদের টিমে ছিলেন সেদিন কক্সবাজার  ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষানুরাগী জনাব লায়ন মোঃ মুজিবুর রহমান, দৈনিক সমকালের সিনিয়র সাব এডিটর জনাব নাসির উদ্দিন হায়দার, মাছরাঙা টেলিভিশনের কক্সবাজার প্রতিনিধি মি.সুনীল বড়ুয়া এবং সিবিআইইউ এর ২০ জন নিরলস স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীসহ কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের একটি সুদক্ষ সেচ্ছাসেবী মেডিকেল টিম, যাদের নিয়ে অসহায় রোহিঙ্গাদের সেবা প্রদানের তাগিদে পথ চলতে শুরু করেছিলাম।
আমাদের  উদ্দেশ্য আর চেষ্টা ছিলো প্রায় ১০,০০০ ( দশহাজার) রোহিঙ্গাদের জন্য ড্রাগস, শিশুখাদ্য ও পড়ালেখার  শিক্ষাসামগ্রী এবং অন্যান্য ত্রাণ নিয়ে অসহায়, নির্যাতিত, নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে উখিয়ার বালুখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটা দিন কাটাবো ওদের সাথে। দিনব্যাপী আমরা বালুখালী টিভি টাওয়ারের নিচে ক্যাম্প বসিয়ে সাধ্যমত সেবাপ্রদান ও ত্রাণ বিতরণ করেছি। সেবা নিতে আসা মানুষগুলোর মুখে কত বিচিত্র কষ্টের কাহিনী শুনেছি। কত নির্মম হতে পারে মিয়ানমার আর্মিরা। চোখের পানিতে অনেক অব্যক্ত কষ্ট ঝরে পড়ে তাদের। সেবা নিতে আসে কোটিপতি ছিলেন এমন রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ তাদেরকেও এদেশের ফকির রোহিঙ্গার ক্যাম্পই ভরসা।
জানতে পেরেছি , গত ১৯শে অক্টোবর হতে যেসব রোহিঙ্গারা আসছে, তারা সবাই রাখাইনের বুথিডং শহরের আশপাশের গ্রাম ও মুন্ডু হতে এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিনিধিরা জানালো, রাখাইনে এপর্যন্ত ২৮৮ টি গ্রাম পুরাপুরি পুড়িয়ে দিয়েছে। গত ৫ই সেপ্টেম্বর কমপক্ষে ৬৬ টি গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে অথচ মিয়ানমার সরকার দাবি করছে ৫ই সেপ্টেম্বরের পরে রাখাইনে আর কোন সহিংসতা হয়নি। রোহিঙ্গারা কেন দেশ ত্যাগ করছে বুঝা যাচ্ছে না। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী অং সান সু চির বুলি,” ১৯৯২ সালের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবেন কিন্তু সেই চুক্তির পর এখন পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গাকেই ফেরত নেয়া হয়নি। আরো বলেছিলেন, কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়ন করবেন অথচ সে কমিশনের মুল বিষয়ই হচ্ছে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়া। সেটিও কিভাবে করবেন, সেটাই প্রশ্ন!”
সভ্য দেশগুলোতে কোন ব্যক্তি বারো থেকে বিশ বছর একনাগাড়ে থাকলে তাকে নাগরিকত্ব দেয়া হয়, কোন শিশু জন্ম নিলে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পায়। কিন্তু রোহিঙ্গারা অারকানে জন্ম গ্রহন করে চার-পাঁচশত বছর বসবাস করেও সেদেশের নাগরিকত্ব দিচ্ছে না মিয়ানমারের মগরা। যে বর্বরতা, নৃশংসতা, পাশবিকতার সাথে জবাই করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করছে এতে প্রমাণিত হয় পৃথিবীর বর্বরতম জাতি এরা। মানুষতো নয় হিংস্রতম পশুর চেয়েও জঘণ্য।
মনেহচ্ছে রবি ঠাকুরের পরে বিখ্যাত কবিতা শুনি সুচির মুখে। কবি সুকান্ত ক্ষুধার রাজ্যে পূর্নিমার চাঁদকে যখন ঝলসানো রুটি হিসাবে আখ্যায়িত করেন তখন সুচি পূর্নিমাভরা জোৎস্ন্যায় কবিতা শুনায় বিশ্বের কাছে। একই সময়ে নিরাপরাধ রোহিঙ্গা  যুবতী ধর্ষিত হয়ে সীমান্তের ওপাড়ে লাশ হয়ে পড়ে। এটাই পার্থক্য মনে হচ্ছে আজ। শিবিরে গাদাগাদি বসবাস, অমানবিক কষ্ট, কল্পনাতীত জীবন প্রবাহ কোনদিকে যাচ্ছে তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যত ।

ক্যাম্প চলাকালে আমি  উখিয়া বালুখালীর আশেপাশে পাহাড়ের কিনারে বসবাসরত ঝুপড়ি ঘর দেখতে লাগলাম। কতো মানুষের আকুতি হাহাকার আর খোদার সৃষ্টি মানুষগুলো কী ভয়ানক অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছে । বসতি গড়তে বৃক্ষ শুন্য করা জঙ্গলের ভাঁজে তাবুতে শিশু আর যুবতী মেয়ের কান্না। পাশে রাত জাগা মায়েদের স্থির চোখে অনেক অব্যক্ত প্রশ্ন। কেন এমন হলো, কেন জীবনে বার বার নেমে আসে এমন নির্যাতন। মন্ডু,আরাকান কিংবা মিয়ানমান সীমান্তে বসবাস করে তারা। একটা স্বপ্ন পুরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছার আগেই আরেকটি দুঃস্বপ্ন এসে হানা দেয় তাদের।
যেখানেই চোখ পড়ে ব্র্যাক এনজিওর ব্যানার দেখি বেশি। বৈদেশিক সাহায্য নিয়ে তারা বেশি পরিমানে সহায়তা দিচ্ছে মানুষের। ধন্যবাদ তাদের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে রহমান আবেদ স্যারকে, মূলত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। অন্যদিকে বালুখালী রোহিঙ্গাদের মাঝে কাজ করা সংস্থা হতে জানতে পারলাম,৭৩ হাজার গর্ভবতী নারীর করুন জীবন যাত্রা, ৮০হাজার শিশুর খাদ্য সংকটে হাড্ডিসার শরীর। সব মিলে ১১লাখে পৌছেগেছে শরনার্থীর কৌটা। জাতিসংঘ কর্তৃক পরিচালিত ড্রোন ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে, মিয়ানমার সীমান্তে অপেক্ষামান আরো ৩/৪ লাখ রোহিঙ্গাদের অবস্থান নদী তীর জঙ্গলে। বড় ভাবিয়ে তুলেছে সদ্য জাগ্রত বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকে। অন্যদিকে ইউএনএইচসিআর হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি, জাতিসংঘ দাতা সংস্থার প্রধান মার্ক লোকক ও আইওএম’র মহাপরিচালক উইলিয়াম লেসি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও সমাধান মিয়ানমারের কাছেই রয়েছে”। আদৌ আমরা এছাড়া কোন শান্তনা পুরস্কার পাচ্ছিনা মনেহয়।
আমরা যেদিন উখিয়ায় অবস্থান করেছি গত ১৯শে অক্টোবর বৃহস্পতিবার, সেদিনই নাকি প্রবেশ করেছে প্রায় আড়াই লাখ মতো রোহিঙ্গা। সেনাবাহিনীর ২৭৮টি শুশৃঙ্খল টিম কোন কূল-কিনারা পাচ্ছেনা ১১ লাখ মানুষের জীবন স্থির করতে। খুব আশ্চর্য্য লাগে ১১ লাখ মুসলিম শরনার্থীর ভিতরে ৭শ’র মতো হিন্দু সম্প্রদায়ের আগমণ হলো হিন্দু ক্যাম্পে। তাদের সাথে কথা বলে জেনেছি, তাদের অভিযোগ মিয়ানমারের আর্মিরা নয় বরং মুসলিমেরা তাদের নির্যাতন করছে। এটাও একটা আন্তর্জাতিক কুটকৌশল বলে ধারণা করছে বিজ্ঞরা। তবে জানিনা কোনটা সত্য।
সেদিন যেসব রোহিঙ্গারা প্রবেশ করেছে তাদের বেশির ভাগ ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, বৃদ্ধা ও নবজাতকসহ মাতা ও যুবতীদের দেখাগেছে।  জানিনা পুরুষেরা কোথায়। অনেকে অনেক ধরনের তথ্য দিচ্ছে। কেউ বলছে তারা প্রতিবাদী হচ্ছে আর কেউ বলছে পুরুষদের হত্যা করছে। নতুন প্রবেশকারীরা সবাই হঠাৎ বৃষ্টিতে সারাদিন ও সারারাত ভিজতে থাকবে। কি অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের।
একি মানুষের জীবন নাকি অন্যকিছু!! জীবন বাঁচাতে গিয়ে জীবনের সলিল সমাধি হচ্ছে রাক্ষুসে নাফ নদীতে। ইতিহাসের কলংক নাফ, রক্তাক্ত তার জল। ভাসমান মানবতায় বিশ্ববাসী আজ দর্শকশ্রোতা।

বিশ্বের দরবারে  বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের পক্ষে মানবতার দরজা উন্মুক্ত করেছেন। কোনো মুসলিম দেশও এতোটা জোড়ালো বক্তব্য রাখেনি , যতটা রেখেছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ।
সৌদী সরকার এবং পাকিস্তান রোহিঙ্গাদের জংগী ঘোষনা করলো। দাদার দেশ ভারত রোহিঙ্গাদের উপর মরিচের গুড়ো ছিটিয়ে প্রবেশ পথে বাঁধাগ্রস্হ করলো। মোদি সরকার সুচির সাথে একত্র হয়ে জোট বাঁধলো। সবাই জোট হয়ে অপেক্ষা করছিলো শেখ হাসিনা বুঝি এইবার ধরা খাবে..!!
সবার কথা মিথ্যে প্রমাণ করে তিনি আবারও দেখিয়েদিলেন যে , তিনিই এই দেশের একমাত্র যোগ্য নেতা , যিনি বিশ্ব নেতার কাতারে চলে গেছেন শুধু মাত্র দেশ প্রেম, সততা আর মানব প্রেমের কারনে ।
যেমনটি তার পিতা জাতির জনক করে গিয়েছিলেন বহু পূর্বে ।
যোগ্য পিতার যোগ্য কন্যা …!!
বঙ্গবন্ধু কন্যা রোহিঙ্গাদের অস্হায়ী দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে দেশে ও বহির্বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন। যতদিন রোহিঙ্গারা এদেশে থাকবে ততদিন তিনিও তাদের জননী হয়েই থাকবেন ।

তবে একথা অস্বীকারের সুযোগ নেই, ওরা বর্তমানে আমাদের জন্য বিশফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে যারা প্রবেশ করেছে তারা আমাদের দেশের সুনাম ক্ষুন্য করেছে। এদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশেও দেশের ভাবমূর্তির ক্ষতি করেছে।
কিন্তু উপায় কি? ওদেরকেতো মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া যায় না। কেউ পশু হলেও  আমরাতো মানুষ। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া ছাড়া বাংলাদেশের আর কিই বা করার ছিল। দেশের সরকার এবং দেশবাসীরা প্রতিনিয়ত  মহৎ কাজ করেই চলেছে। লক্ষ লক্ষ অসহায় শিশু-নারী-পুরুষকে আশ্রয় দিলে অসুবিধা তো হবেই, আগেও হয়েছে। তবে আশার কথা আমরা অনেক সহনশীল, মানবিক ও বুদ্ধিমান জাতি। একটু সতর্কতার সাথে এগুলে হয়তো অসুবিধার পরিমানটা তুলনামূলক ভাবে কম হবে। কিন্তু তারপরও তো ওদের আশ্রয় না দিয়ে উপায় নেই। কোথায় যাবে, কে দেখবে? বহির্বিশ্বের সবাই কিছু না কিছু ত্রান দিয়ে দায়িত্বের বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা গরীব বাংলাদেশীরাতো পারছি না। কারন সবকিছু আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। আজকে আরব বিশ্বের শেখরা স্পেন, ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সে ক্লাবের মালিক হয়ে নেইমার, এমবাপে কিংবা ওজিল, সানচেজদের পিছনে হাজার হাজার কোটি ইউরো খরচ করতে বিন্দুমাত্র কসুর করেনা। অথচ ঐ খেলোয়াড়দের এক বছরের খরচ দিয়ে রোহিঙ্গাদের একটা স্থায়ী গতি করা সম্ভব।কিন্তু তারা তা করবে না। করবে কে? করবে দরিদ্র বাংলাদেশ।
অথচ মুসলমানদের উপর কর্তৃত্ব করার জন্য সৌদি শেখ আর তুরস্কের প্রেসিডেন্টরা আদাজল খেয়ে প্রতিযোগিতায় নামে।

আরেকটি মর্মান্তিক জরুরি বিষয়ও আমার লেখনীতে টানতে চাই।
মিয়ানমার-রোহিঙ্গা ইস্যুতে বেশিভাগ সময়ই আমাদের শুনতে হয়- বৌদ্ধরা মুসলিমদের মারছে!!

রোহিঙ্গারা হচ্ছে একটা জাতিগোষ্ঠী। যেখানে মুসলিম, হিন্দু উভয় ধর্মের মানুষ আছে। সংঘাতটা সৃষ্টি জাতি নিয়ে। ধর্ম নিয়ে না। কারণ মিয়ানমারের ১৩৯ টা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যান্য জাতির মানুষদের নিয়ে মিয়ানমারের সমস্যা হচ্ছে না। তাদের তারা বের করে দিচ্ছে না!
ব্যক্তিগতভাবে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধন কাজটা মনে হয় নিজের ঘর পরিষ্কার রাখতে, নিজের ঘরের ময়লা জোর করে অন্যের ঘরে ফেলে আসার মত!
মানবিকতার প্রশ্নে এই সমস্যা সমাধানে প্রধান ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সকল মানুষ এক হয়ে কাজ করলে হয়তো দ্রুত ও সফলভাবে আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারতাম।
কিন্তু দেশের মধ্যেই সম্প্রদায়িক বিভেদ তৈরী করে, বৌদ্ধধর্মের মানুষদের জন্য অনিরাপদ ও ভীতিকর অবস্হা তৈরী করে, ধর্মীয় সংঘাত সৃষ্টিকরে এই সমস্যা সমাধান কতটুকু হবে তা ভাববার বিষয়।
আমরা যখন নিজের ঘরেই সমস্যা তৈরী করি, তখন বাইরের সমস্যা সমাধানে তা কতটুকু বাধা সৃষ্টি করে, তা আমরা সবাই জানি।
একটা দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য আমরা একটা ধর্মকেই খুব সহজেই ছোট করে কথা বলতে শুনি। বাজে ভাবে আমার পাশের ঐ ধর্মালম্বী মানুষকে খোঁচা মারি!
বিশেষ করে আধুনিক পড়াশোনায় শিক্ষিত, নেতৃস্থানীয় কেউ যখন এমন সাম্প্রদায়িক বিভেদমূলক ধারণা পোষণ করে, তখন আশাহত হতেই হয়।
জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ,  বুদ্ধি সেখানে অাড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।
রোহিঙ্গাদের সাথে যারা মিশেছে তারা মাত্রই জানেন তারা শিক্ষাদীক্ষাই কতটা পিছিয়ে যদিও তাদের মূর্খ্য করে রাখার পরিকল্পনাটা যে মায়ানমার সরকারের তা সহজেই অনুমেয়। রোহিঙ্গাদের মুক্তি ততদিন সম্ভব না যতদিননা তারা প্রকৃত শিক্ষার সুযোগ পাবেনা। তাই বস্তা বস্তা খাবার আর কাপড়ের পাশাপাশি ওদের শিক্ষার বিষয়টাও মাথায় রাখা জরুরি সাথে পরিবার পরিকল্পনার ধারণা দেয়াটাও অনাবশ্যকীয়। এটা শুধু তাদের মুক্তির জন্য নয়, বাংলাদেশের বিশেষ করে কক্সবাজারের পরিবেশ ঠিক রাখার জন্যও সমান জরুরি। আর একটা কথা না বললেই নয় অনেক ত্রানের গাড়ির সামনে দেখা যায় “মুসলিম/হিন্দু শরণার্থীদের জন্য ত্রান” এর মানে কি???
হিন্দু কিংবা মুসলিম হিসেবে না দেখে প্লিজ অসহায় মানুষ হিসেবে দেখুন তাতে অন্তত জাতি ভেদাভেদ  দ্বন্দটা হয়না। শুনেছি হিন্দুদের জোড় করে ধর্মান্তরিত করার চাপ সৃষ্টির অপপ্রয়াসও চলছে। কিছু সার্থন্বেষীমহল এ ইস্যুকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে নিজেদের সার্থসিদ্ধির পায়তারা করছে। বাংলাদেশের বৌদ্ধ, হিন্দুদের উপর অত্যাচার করলে এর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে তা ভুলে গেলে চলবেনা চীন বা ভারতে লক্ষ লক্ষ মুসলিম রয়েছে।
তাছাড়া বিজিবিকে এড়িয়ে বর্ডার দালালদের দাপট চরম আকার রুপ নিয়েছে। এদের লাগাম যেকোন উপায়ে টানতে হবে। নতুবা মানবিকতার পাশাপাশি আমাদের অমানবিকতার উপাধী বা খেতাবও পেতে হবে কতিপয় কোলাঙ্গারদের কারনে। এসব বিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করি।
খুব মনেপড়ে কবি নজরুলের একটি গানের নির্মম কয়েকটি লাইন, ” আজকে যে রাজাধীরাজ, কালকে সে ভিক্ষা চায়, চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়।”

বেশকিছুদিন আগে আমার একটি কলামে লিখেছিলাম, মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি গনতন্ত্রের  রং করা একটি কাঠের পুতুল। ওর সাধ্য নেই সরকার প্রধান হিসাবে সেনাশাসিত নেতৃত্বের বাহিরে মন্তব্য করতে। কারন তিনিও গৃহবন্দি থেকে সেনা মোড়লে বন্দি।
তাই দরকার জাতিসংঘ নামক সংঘঠন আর বিশ্বের সব দেশের চাপ প্রয়োগ। নাহয় কোন সমাধা হবেনা বা হবার গ্যারান্টিও নেই। নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের অনেকে আমাদের বুকে জড়িয়ে বলে, তাদের সহায় সম্পদ টাকা পয়সা, স্বর্ন, রুপা সব ছিনিয়ে নিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে পুরুষদের চোখমুখ বন্ধ করে, পিছনে হাত মুড়িয়ে বেধে আর্মিরা গুলি করে মেরে ফেলে দিচ্ছে। পরে গর্ত করে নিচে ফেলে পেট্রোল ও পাউডার ছিটিয়ে পুড়িয়ে মারছে ।
আর যুবতী বা সুন্দরী মেয়েদের ধরে হাত বেধে নিয়ে যায় আর্মি ক্যাম্পে। তারপর নির্মম নির্যাতন করে ধর্ষণের পরে হত্যা করে। কি আজব দুনিয়া। আজকের পৃথিবী নাকি আধুনিকতায় সভ্য তবে এখনো মিয়ানমারে দেখি আদিম- মানুষ খেকো আর্মি জানোয়ারে ভরপুর।

ওরা রোহিঙ্গা নয় ওরা মানুষ, ওরা মুসলিম। ওরা প্রতিবাদী হতে পারেনি তবে প্রতিহিংসা আর নির্যাতনের শিকার। তবে জয় হোক মুসলিম জনতার। মানুষ হিসাবে বিবেকের তাড়নায় পাশে দাঁড়িয়েছি সহানুভূতির দৃষ্টিতে। আসুন আমরা মানবিক হই, অন্তরকে বিশুদ্ধ করে দুহাত প্রসারিত করি।
বিশ্ব মানবতা জাগ্রত হোক। আমার আপনার চেষ্টায় স্বজাতি কর্তৃক বিতাড়িত কিছু মানুষ অস্থায়ীভাবে নিরাপদে থাকুক কিছুদিন। ১৯৭১ সালে আমাদের ১ কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো। সারা পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ তখন আমাদের প্রতি মানবিকতায় হাত বাড়িয়েছিলো তাই আজ আমরাও স্বনির্ভর হয়েছি মানবিকতার কারনেই। ভুলেগেলে চলবেনা,” সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”।

লেখক: মাহ্বুবা সুলতানা শিউলি,
সদস্য, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি।