যেকারনে পাচারকারীদের টার্গেট রোহিঙ্গা সুন্দরী!

উখিয়া নিউজ ডেস্ক::

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোয় সক্রিয় মানব পাচারকারীদের ঠেকাতে পারছে না বাংলাদেশ। যে কারণে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয় নেওয়া এই জাতিগোষ্ঠীর ‘মালয়েশিয়াগামী স্রোত’ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন।

গত দুই সপ্তাহে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ২৬০ জন রোহিঙ্গা ধরা পড়েছেন। যার অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময়ে, বাকিরা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাংলাদেশি পাসপোর্টসহ বা তা সংগ্রহকালে আটক হয়েছেন।

কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন মঙ্গলবার  বলেন, “মানব পাচার রোধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।”

এরই মধ্যে সোমবার সকালে মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলের পার্লিস রাজ্যে সুনাগাই বেলাতি সৈকতে ৩৭ রোহিঙ্গাকে আটকের পর সেদেশের পুলিশ দাবি করেছে, নতুন করে রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়ায় পাচারের চেষ্টা শুরু হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা  বলেন, “অভিবাসন প্রত্যাশী রোহিঙ্গাদের পালানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সতর্কতা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। একই সঙ্গে সতর্ক রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নসহ (র‍্যাব) দেশের সবগুলো বাহিনী।”

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও মাদক পাচারের অন্যতম রুট সেন্টমার্টিন দ্বীপে ২২ বছর পর গত ৬ এপ্রিল থেকে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের এই সর্বশেষ ভূখণ্ডে বর্ডার আউট পোস্ট (বিওপি)’সহ বিভিন্ন স্থায়ী স্থাপনা তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছে সীমান্তরক্ষী এই বাহিনী।

বিজিবির টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান  বলেন, “সেন্টমার্টিনে মোতায়েন করা বিজিবির সদস্যরা সমুদ্রপথে মানব পাচার ঠেকানোর বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দেবে।”

এর ফলে মানব পাচার অনেকটাই কমে আসবে বলে দাবি এই কর্মকর্তার।

দুই সপ্তায় আটক ২৬০

স্থানীয় পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫ এপ্রিল কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার পাহাড়ি এলাকা বাহারছড়া থেকে ১১৫ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশ, যার মধ্যে ২৬ জন শিশু, ৩৯ জন নারী ও ৫০ জন পুরুষ । মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য স্থানীয় কচ্ছপিয়া ঘাট দিয়ে ট্রলারে ওঠার কথা ছিল তাদের।

৪ এপ্রিল একই জেলার মহেশখালীর গহিন অরণ্য থেকে মালয়েশিয়াগামী আরও ১৯ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। যার মধ্যেও দুই শিশু ও ১২ জন নারী ছিলেন, যারা উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে পালাচ্ছিলেন।

একইদিন সুনামগঞ্জে পাসপোর্ট অফিসে দুই রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়, যার মধ্যে একজন নারী। তাঁরা টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে সেখানে আসেন।

৩ এপ্রিল কুড়িগ্রাম আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে এক দালালসহ চার রোহিঙ্গা নারীকে আটক করে পুলিশ।

একইদিন টেকনাফে সাগর উপকূল দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া গমনের প্রস্তুতিকালে পৃথক দুটি অভিযানে ২৭ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার করেছে বিজিবি। এদের মধ্যে মহেশখালীয়া পাড়া উপকূলে নৌকার জন্য অপেক্ষমাণ দুই শিশু, নয় মহিলাসহ ১৩ জন ও কাটাবুনিয়া খালের মুখ থেকে দুই শিশু, সাত মহিলাসহ ১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়।

গত ৩১ মার্চ সকালে ক্যাম্প পালানো নারী-পুরুষ শিশুসহ ৩১ জন রোহিঙ্গা আটক হন। উখিয়া থানা-পুলিশ কক্সবাজারমুখী যাত্রীবাহী গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তাদের আটক করে।

একইদিন মালয়েশিয়া হয়ে ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার উদ্দেশে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে আটক হন তিন নারীসহ চার রোহিঙ্গা। বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ান জানায়, তারা সবাই বাংলাদেশি পাসপোর্ট বহন করছিলেন।

৩০ মার্চ টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাত শিশু ও ১৬ নারীসহ ২৯ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড ও পুলিশ। ২৯ মার্চ সীমান্তে তিন শিশু ও দুই নারীসহ ২৩ রোহিঙ্গাকে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

২৮ মার্চ চাঁদপুর শহরের কাচাকলোনি এলাকায় আটক হন ঢাকাগামী দুই রোহিঙ্গা যুবক।

এ ছাড়া ২৬ মার্চ রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে চার রোহিঙ্গা নারীকে উদ্ধার করে র‍্যাব-৩। বিপুলসংখ্যক পাসপোর্ট ও ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের কপিসহ পাচারকারী চক্রের দুই সদস্যকেও আটক করা হয়।

সবাই ধরা পড়ছে না

একাধিক শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা জানান, যেসব অভিবাসন প্রত্যাশী রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে, তাদের সবাই ধরা পড়ছে না।

টেকনাফের শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা মোহাম্মদ আবুল কালাম বেনারকে বলেন, “সাগর পথে মালয়েশিয়া যাবার লক্ষ্যে আমার শিবির থেকে অনেক রোহিঙ্গা বের হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ধরা পড়লেও অনেকের কোনো খোজঁ-খবর নেই।”

“তবে তারা সবাই গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছেন কি’না তা আমি নিশ্চিত নই,” যোগ করেন তিনি।

ওদিকে মালয়েশিয়ার পার্লিস রাজ্যের পুলিশ প্রধান নুর মুশার মোহাম্মদ রয়টার্সকে বলেন, “আমাদের ধারণা রোহিঙ্গাদের বড় নৌকায় করে সাগর পার করে আনা হয়েছে। পরে তীরের কাছাকাছি এসে ছোট ছোট নৌকায় করে বিভিন্ন এলাকায় ভিড়ানো হয়েছে।”

“যাদের আটক করা হয়েছে তারা সবাই সুস্থ ছিল,” যোগ করেন তিনি।

এর আগে গত মাসেও একই সৈকত থেকে ৩৫ জন রোহিঙ্গোকে উদ্ধার করা হয়েছিল।

টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের ডেভেলপমেন্ট ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলম বেনারকে বলেন, “মালয়েশিয়ায় আটক রোহিঙ্গাদের মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালি ও টেকনাফের মৌচনি ক্যাম্পের বাসিন্দা রয়েছে বলে আমি শুনেছি।”

ভাসানচরের ভয়!

রোহিঙ্গা নেতাদের দাবি, উন্নত জীবনের আশায় মালয়েশিয়া যাওয়ার বা ক্যাম্প থেকে পালানোর প্রবণতা রোহিঙ্গাদের মধ্যে বরাবরই ছিল, তবে ইদানীং তা হুট করেই বেড়ে গেছে। যাদের আত্মীয়-স্বজন বিভিন্নভাবে মালয়েশিয়ায় গিয়েছে, তাদের মধ্যেই সেদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে বলেও বেনারকে জানান তারা।

“গত মাসের শুরুতেই (৩ মার্চ) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ১৫ এপ্রিল থেকে নোয়াখালীর ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর শুরু হচ্ছে। তাঁর ওই ঘোষণার পরই মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য মরিয়া উঠেছে অনেকে,” বলেন রোহিঙ্গা নেতা কামাল।

তাঁর মতে, “মানব পাচারকারীরা এই সুযোগটাকে কাজে লাগাচ্ছে।”

তবে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম বেনারকে বলেন, “ভাসানচরে যারা স্বেচ্ছায় যেতে চাইবে শুধু তাদেরই নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে কাউকে জোর করা হবে না।”

“বছরের এই সময়টায় সাগর কিছুটা শান্ত থাকে বিধায় অনেক রোহিঙ্গা যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে, এটা অপ্রত্যাশিত বা অস্বাভাবিক নয়,” যোগ করেন বাংলাদেশ সরকারের এই অতিরিক্ত সচিব।

এএসপি ইকবাল বলেন, “যেসব দালাল (পাচারকারী) জামিনে বেরিয়ে আসে, পুলিশ তাদের নজরে রাখে। আর যেসব পাচারকারী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে, পুলিশের একটি বিশেষ টিম তাদের ধরতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।”

ad