রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে না যেতে উস্কানি দিচ্ছে কারা

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ::
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করছে একটি বিশেষ মহল। প্রবল বর্ষণ, ভূমিধস, ঘনবসতি ও বন্যার হাত থেকে সুরক্ষিত করতে সরকার রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে ওই চরকে বসবাস উপযোগী করে তোলা হয়েছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সুরক্ষিত করতে সরকার ইতোমধ্যে বহু টাকা ব্যয় করেছে। কিন্তু স্বার্থের ব্যঘাত ঘটছে দেখে একটি মহল ভাসানচরে না যেতে রোহিঙ্গাদের উস্কানি দিয়ে চলেছে। আশ্রয় শিবিরে দায়িত্ব পালনকারী সংস্থা ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
সূত্রে জানা যায়, প্রবল বর্ষণ, ভূমিধস ও বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন, বনবিভাগ ও আরআরআরসি ৩৫হাজার রোহিঙ্গাকে গত মাসে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিয়মিত ত্রাণ সামগ্রী প্রদান, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবায় বিরামহীন পরিশ্রম করে যাচ্ছে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসন দায়িত্ব পালন করতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের জায়গা দিতে সরকার বরাদ্দ করেছে অন্তত ৬ হাজার একর বনভূমি। ইতোমধ্যে ওসব সবুজ বন ধবংস হয়ে গেছে। তবে আশ্রয় শিবিরগুলো মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় রোহিঙ্গারা ওপারে গিয়ে ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্য নিয়ে আসছে এদেশে। ক্যাম্প এলাকায় দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে মাদক সেবী যুবকদের সংখ্যা। মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি ক্যাম্প স্থাপনকে সচেতন মহল মোটেও নিরাপদ মনে করছেননা। সন্ত্রাসী রোহিঙ্গারা স্বদেশে গিয়ে সশস্ত্র গ্রুপের কাছ থেকে অস্ত্র এনে ক্যাম্পে ঢুকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
এদিকে উখিয়া টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কাঁটা তারের ঘেরা নেই। চারদিকে রয়েছে বহু মেঠোপথ। ওসব পথ ব্যবহার করে রোহিঙ্গা জঙ্গীরা ক্যাম্পে অবস্থানরত কিছু সংখ্যক সন্ত্রাসী রোহিঙ্গার সঙ্গে যোগাযোগ করে ভবিষ্যতে অনাকাঙ্খিত ঘটনাও সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। এছাড়াও স্থানীয়দের সঙ্গে নানান বিষয়ে রোহিঙ্গাদের মনোমালিন্য সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। রাতের বেলায় গ্রামে ঢুকে রোহিঙ্গারা গৃহস্থলী পরিবারের গোয়ালঘর খালি করে ফেলেছে। কোরবানি উপলক্ষে যত্ন করে মোটা তাজা করা গরুগুলো চুরি করে নিয়ে গেছে রোহিঙ্গারা। উখিয়ার পালংখালী, থাইংখালী ও বালুখালী এলাকার অনেকে বসতঘরে না ঘুমিয়ে সারারাত গোয়ালঘর পাহারা দিয়ে রাতযাপন করছে।
রোহিঙ্গারা রাতে স্থানীয়দের গরু চুরি করে ক্যাম্প অভ্যন্তরে নিয়ে ভাগবাটোয়ারা করে খাচ্ছে। তারা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহারের জন্য তুলে নিয়ে যাচ্ছে স্থানীয়দের ঘেরাবেড়া। বিভিন্ন এনজিও সংস্থার কাজসহ বিভিন্ন স্থানে স্বল্প দামে মজুরি খাটছে রোহিঙ্গারা। এসব কারণে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। যে কোন সময় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘাত লেগে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন সচেতন মহল। তাই কালবিলম্ব না করে ভাসানচর-ঠেঙ্গারচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করার দাবী উঠেছে স্থানীয়দের তরফ থেকে।
সূত্র জানিয়েছে, দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে ইতোপূর্বে একাধিকবার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছে একটি রাজনৈতিকদল। সম্প্রতি রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে কোমমতি ছাত্রদের ভেতরে ঢুকে নাশকতা চালিয়েছে ছাত্রদল ও শিবির ক্যাডাররা। ইতোপূর্বেও কক্সবাজার শহর এবং টেকনাফ সড়কে নাশকতা চালাতে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করেছে বিশেষ মহলটি। যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী মুক্তি আন্দোলনের ব্যানারে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল রোহিঙ্গাদের। ওইসময় শহরের হাশেমিয়া মাদ্রাসা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়েছিল সশস্ত্র ক্যাডারদের সঙ্গে সন্ত্রাসী রোহিঙ্গা যুবকরা। উখিয়া টেকনাফ এলাকায় অরক্ষিত ক্যাম্পগুলোতে এভাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ে রাখা মোটেও নিরাপদ মনে করছেননা অভিজ্ঞ মহল।
সূত্র মতে, স্থানীয়দের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জনরোষ সৃষ্টি হওয়ার আগে এবং বিভিন্ন নাশকতায় ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা শ্রেয় বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন অভিজ্ঞ মহল। তারা বলেন, রোহিঙ্গারা নগদ টাকা পেতে মরিয়া। টাকার লোভে রোহিঙ্গারা করতে পারেনা এমন কোন কাজ নেই। নগদ টাকার চুক্তি করে ভাড়া যায় রোহিঙ্গারা। ওই রাজনৈতিক দলটি দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে থাকে এমন নজির রয়েছে কক্সবাজারে। তাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করলে স্বার্থ হাসিলে ব্যাঘাত ঘটতে পারে একটি রাজনৈতিক দল, কতিপয় এনজিও, রোহিঙ্গা জঙ্গী গ্রুপ আরএসও এবং রোহিঙ্গাদের নিয়ে রমরমা ব্যবসাকারী কতিপয় ব্যক্তির। তাই তারা ভাসানচরে স্থানান্তরে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধীতার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে না যেতে বিভিন্ন উস্কানি দিয়ে চলেছে।
অভিজ্ঞজনরা বলেন, এ বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে যে উখিয়া টেকনাফে সুশৃঙ্খলভাবে আশ্রয় শিবির তৈরী করে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে, এটা অবশ্যই সরকারের প্রশংসনীয় এবং অনেক বড় বিষয়। যা দেশ বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে সরকার ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা বলেন, উখিয়া টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রিত ১১লক্ষাধিক রোহিঙ্গার মধ্য থেকে অন্তত ১০লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা জরুরী। কেননা রোহিঙ্গারা অরক্ষিত ক্যাম্পে অবস্থান করে আরাকান বিদ্রোহী রোহিঙ্গা জঙ্গী গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছে। স্বদেশে গিয়ে মাদক নিয়ে ফিরে আসছে ক্যাম্পে।
সূত্র জানিয়েছে, ভাসানচরে স্থানান্তর করা হলে তারা আর ওই সুযোগ পাবেনা। ওই দ্বীপ থেকে বের হয়ে নাশকতায়ও অংশ নিতে সাহস করবেনা। আশ্রিত সন্ত্রাসী গোচরের রোহিঙ্গা যুবকদের সঙ্গে তখন রোহিঙ্গা জঙ্গী গ্রুপের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। উখিয়া টেকনাফে তথা পর্যটন শহরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা প্রশাসনের জন্য সহজ হবে বলে মত প্রকাশ করেছেন তারা। স্বদেশে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ওই দ্বীপে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে রাখা সম্ভব হবে জানিয়ে তারা আরও বলেন, সাহায্য সংস্থাগুলোর জন্যও এক জায়গায় ত্রাণ সামগ্রী পৌছানো সহজ হবে।
একাধিক সূত্রে জানানো হয়েছে, সকল রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরে আরও একটি সুফল বয়ে আনতে পারে। মিয়ানমারের সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক অটুট রয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকল্পে বাংলাদেশ নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। মিয়ানমার অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা বিদ্রোহীরা সেদেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটালে যাতে দেশটির সরকার বলতে না পারে, আশ্রিত ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা ওই ঘটনায় অংশ নিয়েছে। এ জন্য কালবিলম্ব না করে রোহিঙ্গাদের সীমান্ত অ ল থেকে দ্রুত সরিয়ে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া জরুরী হয়ে দাড়িয়েছে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।
এদিকে স্বার্থান্বেষীরা এবং বিশেষ মহল রোহিঙ্গাদের ধোকা দিচ্ছে যে ভাসানচরটি ডুবে যায় জোয়ারের পানিতে। সেখানে গেলে মারা যাবে রোহিঙ্গারা। তবে ভাসানচরকে যে সরকার বহু টাকা ব্যয় করে বসবাস উপযোগী করে তোলেছে, সেটা তারা স¤পূর্ণ গোপন রেখে সেখানে না যেতে উস্কানি ছড়ানো হচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। গুজব ছড়ানো হচ্ছে ভাসানচরে অসংখ্য বিশাক্ত সাপের বসবাস। চতুর্দিকে সাগর। জলোচ্ছ্বাস হলে ওই দ্বীপ ডুবে যাবে। উখিয়া টেকনাফের মত স্বাধীন ভাবে সেখানে চলাচল করা যাবেনা। বন্দি জীবন কাটাতে হবে সেখানে। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের বাড়তি আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে যাবে। যদি কোন সংস্থা রোহিঙ্গাদের গোপনে নগদ টাকা সাহায্য করতে চাইলেও ভাসানচরে যেতে পারবেনা ইত্যাদি। এসব উস্কানি শুনে উখিয়া টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গারা ভাসানচরে স্থানান্তর না যাওয়ার জন্য সংগঠিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে নজরদারী বৃদ্ধি করে উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে আইনানূগ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং রোহিঙ্গাদের দ্রুত ভাসানচরে স্থানান্তর করার দাবী জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সূত্র: জনকণ্ঠ