রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী নিবাসের জন্য তৈরি হচ্ছে ভাসান চর

উখিয়া নিউজ ডেস্ক::
বলপূর্বক বাস্তচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের অস্থায়ী বসবাসের জন্য উপযোগী করে তোলা হচ্ছে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার ভাসান চর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পছন্দ অনুযায়ী ‘ঠেঙ্গার চর’ এর পরিবর্তে এর নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘ভাসান চর’।

ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের ভাসান চরে স্থানান্তরের কাজ শুরু করেছে সরকার। আর এজন্য চরটি বসবাসের সম্পূর্ণ উপযোগী ও উন্নয়ন করতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে দায়িত্ব দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়।

মিয়ানমার থেকে গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে সাময়িকভাবে ভাসান চরে আশ্রয় দিলেও স্থায়ীভাবে তাদের প্রত্যাবসনের কথা ভাবছে সরকার।

সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ভয়েস অব আমেরিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, চরটি জালিয়ার চর, ঠেঙ্গার চর নামে পরিচিত হলেও তিনি ‘ভাসান চর’ নামটা পছন্দ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ অনুযায়ী এই নামেই চরটির নামকরণ করা হয় এবং সেখানেই অসহায় রোহিঙ্গাদের অস্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়ার বন্দোবস্ত চলছে।

প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী আবাসের বিষয়টি এখন অনেকটাই চূড়ান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে চরটিতে কাজ শুরু করেছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার লোকেরা। চরটি বসবাসের উপযোগী করে তোলার পর সেখানে নেয়া হতে পারে কুতুপালং ও উখিয়ায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা ইটিভি অনলাইনকে বলেন, সন্দ্বীপের ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের জায়গা দেয়ার ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বাহিরে আমার আর তেমন কিছু বলার নাই।

সন্দ্বীপ উপজেলা থেকে ৫ কি.মি মূল আর হাতিয়ার ভূখণ্ড থেকে ২০ কিলোমিটার পূর্বে মেঘনা নদীপথ পার হলে ভাসান চরের অবস্থান। বর্তমানে চরটির আয়তন প্রায় ৩৩০ বর্গকিলোমিটার। এছাড়া ভাসান চরের চারদিকে সাগর গর্ভ থেকে প্রতিবছর হারানো ভূমি জেগে উঠছে। ফলে ক্রমাগত আয়তন বাড়ছে ভাসান চরের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯০ সালের দিকে স্থানীয় জেলেরা এখানে একটি ডুবোচরের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে ডুবোচরটির আয়তন বৃদ্ধির পাশাপাশি একই সময় দক্ষিণে আরও একটি নতুন চর জেগে ওঠে। স্থানীয় জেলেদের কাছে এটি ‘গাঙ্গুরিয়ার চর’ নামে পরিচিত।

ভাসান চরের পূর্বদিকে সন্দ্বীপ উপজেলা এবং উত্তরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর (রিসার্চ সেন্টার) প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘স্বর্ণদ্বীপে’র অবস্থান। এর দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর দিকে প্রচুর ভূমি জেগে উঠেছে। বিশাল চরটিতে মহিষের কয়েকটি বাথান রয়েছে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের মৎস শিকারীরা এখানে সাময়িক বিশ্রাম নেন। সন্দ্বীপ থেকে ভাসান চরে ট্রলারযোগে যেতে সময় লাগে ২০ মিনিট। অন্যদিকে হাতিয়া মূল ভূখণ্ড থেকে ট্রলারযোগে যেতে লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা।

কয়েক বছর আগে থেকে চট্টগ্রামের বন বিভাগ এখানে বনায়ন শুরু করে। ফলে ভাসান চরের বিভিন্ন অংশ গাছ-গাছালিতে ভরে গেছে। এক সময় এই চরসহ পুরো উপকূলীয় অঞ্চল জলদস্যু ও বনদস্যু অধ্যুষিত থাকলেও এখন দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। বিশেষ করে সাগর গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া সন্দ্বীপের সাবেক ইউনিয়ন আমিরাবাদ পরবর্তীতে ‘জাহাইজ্যার চর’ এবং বর্তমান ‘স্বর্ণদ্বীপে’ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পাশাপাশি নৌ-বাহিনী ও কোস্টগার্ডের তৎপরতার সুবাদে জলদস্যুদের হাত থেকে জেলেরা রেহাই পেয়েছে।

গত কয়েক মাস আগে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, ইউএনও ও ওসিসহ সরকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভাসান চর পরিদর্শন করে গেছেন। এসময় তারা ভাসান চরের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন।

ইতোমধ্যে চরটির অভ্যন্তরে হেলিপ্যাড ও অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে এবং সেখানে নৌ-বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। এ চরে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা হিসেবে চরের চতুর্দিকে বেঁড়িবাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পরবর্তী সময়ে এখানে সড়ক ও অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

চরটির নিরাপত্তা বিধান, বসবাসের উপযোগী পরিবেশ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বনায়নের লক্ষ্যে মাস্টারপ্লান প্রণয়নের জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দুটি সাইক্লোন শেল্টার স্থাপন, পানি নিষ্কাশন ও পুকুর খনন, জেনারেটর ও সোলার প্যানেল স্থাপন, ভাঙন প্রতিরোধক ব্যবস্থাসহ বেড়িবাঁধ নির্মাণ, শরণার্থী শিবির স্থাপন, পশুপালন ও পর্যটন বিকাশ, কাজের জন্য ডিপিপি প্রণয়ন প্রক্রিয়াধীন আছে এবং নৌ ফরওয়ার্ড বেইস স্থাপনসহ দুটি হেলিপ্যাড নির্মাণের রেস্টহাউজ, খেলার মাঠ, স্কুল, প্রশিক্ষণ মাঠ, জলাশয় ইত্যাদি নির্মাণ করা হবে। চরটি বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলার পর সেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে বলে পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো.শাহরিয়ার আলম গগণমাধ্যমে বলেছিলেন, ভাসানচরটি বসবাস উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য কাজ চলছে। এজন্য বৈদেশিক সহায়তাও চাওয়া হবে। এই চরটি বসবাস উপযোগী হলে সেখানে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করা হবে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীরও সম্মতি রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের এক স্থানে না রাখলে তারা সারাদেশে ছড়িয়ে যেতে পারে। এরপর তারা নানা ধরনের অপরাধ নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে। এতে দেশের অনেক ক্ষতি হবে। তাই দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের এক স্থানে রাখা হবে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে চরটি বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ চরটি বসবাস উপযোগী ও সার্বিকভাবে উন্নয়নের পর নৌবাহিনীর নৌ ফরওয়ার্ড বেইস স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি বরাদ্দ প্রদান করা হবে।

ভাসান চরে কোনো স্থায়ী জনবসতি নেই। সেখানে প্রায় ৮ হাজার মহিষ প্রতিপালিত হচ্ছে। প্রায় ২৫ জন রাখাল অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। অনেক সময় জেলেরা সেখানে বিশ্রাম বা যাত্রাবিরতি করেন। নৌবাহিনী ৮০০ ফুট গভীর নলকূপ স্থাপন করে সেখানে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছে। রাখালরা স্যালোর পাম্প দিয়ে মহিষের খাবার পানির ব্যবস্থা করেন।

চারদিকে পানিবেষ্টিত ডিম্বাকৃতি দ্বীপটিতে বহুসংখ্যক ছোট ছোট খাল রয়েছে। ট্রলারের মাধ্যমে দ্বীপটিতে যাতায়াত করা যায়। চরটি নরম পলিমাটি দিয়ে গঠিত। লবণাক্ত বেশি হওয়ায় সেখানে লবণাক্ত সহনীয় বিশেষ ধান, নারকেল গাছ ইত্যাদি চাষ করা সম্ভব। বনবিভাগের রোপণ করা প্রায় ১ হাজার ৬০০ কেওড়া গাছ ছাড়াও দ্বীপে প্রচুর ঘাস রয়েছে।

পন্টুন হতে যাতায়াতের জন্য ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। চরের পশ্চিম পার্শ্ব ভাঙনপ্রবণ এলাকা বিধায় ড্রামসিট, বাঁশ ও বালুর বস্তা দিয়ে ১০০ মিটার দীর্ঘ একটি পরীক্ষামূলক বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

গত কয়েক দিনে নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে এসেছে প্রায় সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গা। এর আগেও প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে ঢুকে পরে এখন তারা কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থান করছে।

তবে ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী নিবাস তৈরির বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি বলে মনে করছেন সন্দ্বীপবাসী।

ভাসান চরকে সন্দ্বীপের সীমানায় অন্তভুক্তির দাবি প্রসঙ্গে সন্দ্বীপ সীমানা রক্ষা কমিটি (ঢাকা) আহবায়ক সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোশাররফ হোসেন খাদেম বলেন-“ঠেঙ্গার চর বা ভাসান চর সন্দ্বীপের ভেঙ্গে যাওয়া নেমস্তি ইউনিয়ন। এখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ এলাকার অর্থনৈতিক বিষয়াবলীর উপর নজর দেওয়া জরুরি।

গত ২৪ আগস্ট রাতে কয়েকটি তল্লাশি চৌকিতে হামলার জেরে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী দমনের নামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ব্যাপক তাণ্ডব শুরু করে। সেনাবিহনীর নৃসংশতার মুখে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয় প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে থেকে বাংলাদেশে বসবাস করছে প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা। তারা কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থান করছে।

রোহিঙ্গাদের সন্দ্বীপের ভাসান চরে পুনর্বাসন করা হলে সন্দ্বীপের আর্থ সামাজিক পরিবেশ বিনষ্ট হবে বলে মনে করেন সন্দ্বীপের বিশিষ্টজনেরা। একইসঙ্গে সন্দ্বীপের সীমানায় জেগে উঠা চরগুলিকে সন্দ্বীপের সীমানায় অর্ন্তভুক্ত করার জোড় দাবি জানিয়েছে সন্দ্বীপ সীমানা রক্ষা কমিটি।

বর্তমানে ভাসান চরের অবস্থা এবং কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সন্দ্বীপ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল হুদা ইটিভি অনলাইনকে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু কিংবা ভাসান চরের বিষয়ে আমার কাছে সরকারি ভাবে কোনো কাগজ আসে নাই। এই ব্যাপারে কোনো তথ্য বলতে পারছি না।

উপজেলা চেয়ারম্যান মাস্টার শাহজাহান বিএ ইটিভি অনলাইনকে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বাহিরে আমার নিজস্ব কোনো বক্তব্য নাই। এছাড়া সন্দ্বীপের অমীমাংসিত সীমানা নিয়ে যে বিরোধ বিদ্যমান রয়েছে সেটি জরিপের মাধ্যমে নিষ্পন্ন হোক এটা আমি চাই।