রোহিঙ্গারা না গেলে বাংলাদেশিদের ভাসানচরে পাঠানো হতে পারে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রোহিঙ্গারা যেতে না চাইলে বাংলাদেশের গৃহহীনদের ভাসানচরে পাঠানোর বিষয়টি ভাবছে সরকার। শুক্রবার রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি করা নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন বেনারকে এ কথা জানান।

চরটি পরিদর্শনের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বেনারকে বলেন, “ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের থাকতে সমস্যা হওয়ার কোনো কারণ নেই। সেখানে খুবই সুন্দর বাড়িঘর তৈরি করা হয়েছে।”

রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর প্রসঙ্গে বারবার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আপত্তির সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, “চরটিতে পাঁচ তারকা হোটেল না থাকায় তাঁরা হয়তো আপত্তি জানাচ্ছে।”

এ কে আবদুল মোমেন আরও বলেন, “ভাসানচরে এত ভালো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে যে, রোহিঙ্গারা না গেলে সেখানে আমাদের নিজেদের লোকদের থাকার কথা ভাবা হচ্ছে। ব্যাপারটি নিয়ে এখন সিরিয়াসলি ভাবছি আমরা।”

“কারণ, সন্দ্বীপ থেকে যাতায়াত ব্যবস্থা এখন ভালো। চরটিতে জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে ৩০ ফুট উঁচু বাঁধ দেওয়া হয়েছে। ফণীসহ সাম্প্রতিক কোনো ঘুর্ণিঝড়ে সেখানে কোনো ক্ষতি হয়নি,” যোগ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

উল্লেখ্য, সরকার দাবি করছে ভাসানচর রোহিঙ্গাদের বসবাসের উপযোগী। এর আগে কয়েক দফা ​উদ্যোগ নেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের সেখানে স্থানান্তরে আপত্তি জানিয়ে আসছে।

‘বন্দি জীবন থেকে মুক্তি চায় রোহিঙ্গারা

নিরাপদ জীবনের কথা ভেবে মালয়েশিয়ায় থাকা রোহিঙ্গা ছেলেদের সাথে মোবাইলে বিয়ে করছেন কক্সবাজারের শিবিররগুলোতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা নারীদের অনেকেই। এরপর স্বামীর কাছে পৌঁছাতে অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথ বেছে নিচ্ছেন তাঁরা।

গত মঙ্গলবার মালয়েশিয়াগামী ট্রলার ডুবিতে বঙ্গোপসাগর থেকে উদ্ধার হওয়া একাধিক রোহিঙ্গা নারী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গারা জানান, পাচারকারীরা সেদিন দেড় শতাধিক রোহিঙ্গাকে মালয়েশিয়া পাঠানোর জন্য সাগরপারের একটি পাহাড়ে একত্রিত করেছিল, যাদের অধিকাংশই ছিলেন নারী।

“মালয়েশিয়া অবস্থানকারী এক রোহিঙ্গা যুবকের সঙ্গে প্রায় দুই বছর আগে মোবাইলে বিয়ে হয় আমার। তখন থেকেই স্বামীর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি,” বলেন ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গা কিশোরী আসমা তারা (১৭)।

শুক্রবার টেকনাফের লেদা শরণার্থী ক্যাম্পে নিজের শ্বশুর বাড়িতে বসেই বেনারনিউজের সাথে কথা বলেন তিনি।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুশিডং জেলা থেকে ২০১৭ সালের শেষভাগে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা আসমা জানান, তাঁর মতো আরও কয়েকজন মোবাইলে বিয়ে করা স্বামীর কাছে যাচ্ছিলেন।

“আসলে সবাই এই শিবিরের বন্দি জীবন থেকে মুক্তি চায়,” বলেন তিনি।

তাঁর সঙ্গে নজিবা নামেও এক নারী মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন জানিয়ে আসমা বলেন, “নজিবারও মোবাইলে বিয়ে হয়েছে। সেও স্বামীর কাছে যাচ্ছিল।”

“ট্রলার ডুবির পর তাকে আর খুঁজে পাইনি। উদ্ধার হওয়া সবগুলো মৃতদেহ দেখেছি। সেখানে তার লাশ ছিল না,” বলেন আসমা।

ট্রলার ডুবির ঘটনায় আসমা ছাড়াও এই শিবিরের আরো সাতজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের সবাই পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন জানিয়ে আসমা বলেন, “বেশিরভাই বিয়ে করে বা করার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল।”

আসমা এর আগেও দুইবার অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে বেনারকে জানান শিবিরের মাঝি (নেতা) আবু বক্কর।

টেকনাফের জাদিমুরা রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা মোহাম্মদ একরামুল হক বেনারকে বলেন, “অনেক বছর ধরেই বিদেশে থাকা রোহিঙ্গা পাত্রের সাথে মোবাইলে বিয়ে হচ্ছে ক্যাম্পের নারীদের। বিয়ের পর স্বামীরা তাদের নেওয়ার চেষ্টা করে।”

“শুধু বিয়েই নয়, উন্নত জীবনের আশায়ও মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা করছেন অনেকে। তবে এমন মৃত্যু খুবই দুঃখজনক,” বেনারকে বলেন টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলম।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রির্সাস ইউনিটের (রামরু) সাবেক গবেষক মির্জা তাসলিমা সুলতানা বেনারকে বলেন, “কতটা খারাপ আছে বলে রোহিঙ্গারা এভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যাচ্ছিল তা সারা বিশ্বের, বিশেষ করে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর আরো গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। তা না হলে রোহিঙ্গা গোষ্ঠী যে ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের শিকার, তাতে এমনটা হতেই থাকবে।”

“এখানে তারা আশ্রিত হয়ে যেভাবে আছে তাতে অন্ন-বস্ত্রের নিশ্চয়তা থাকলেও জীবনে কোনো আনন্দ বা নিরাপত্তা নেই,” বলেন তিনি।

নিখোঁজদের খুঁজছে না কেউ

গত ১১ ফেব্রুয়ারি সাগরপথে মালয়েশিয়া যাত্রাকালে সেন্টমার্টিনের কাছে বঙ্গোপসাগরে একটি ট্রলার ডুবে যায়। ওই ঘটনায় মঙ্গলবার ১৫ জন ও শুক্রবার একজনের মৃতদেহ উদ্ধার করার কথা জানান টেকনাফ কোস্টগার্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট রাহাত ইমতিয়াজ।

মর্মান্তিক এই ঘটনায় ৭৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। রোহিঙ্গাদের তথ্যানুযায়ী এখনো ৪৯ জনের খোঁজ মেলেনি।

নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে লেফটেন্যান্ট রাহাত বেনারকে বলেন, “কোস্টগার্ডের পাশাপাশি নৌবাহিনীও এই উদ্ধার অভিযান অভিযানে সক্রিয় রয়েছে।”

তবে এখন জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে জানান উদ্ধার কাজে জড়িতরা।

কর্মকর্তারা জানান, ট্রলার ডুবিতে হারিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের পরিবারের কেউই উদ্ধারকারীদের সাথে যোগাযোগ করেনি। এর আগে ১৫টি লাশের মধ্যেও চারটি বেওয়ারিশভাবে দাফন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মাহবুব আলম তালুকদার বেনারকে জানান, নিখোঁজের একটি তালিকা তৈরির চেষ্টা করছেন তাঁরা। তবে সেটা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

“যাদের স্বজন নিখোঁজ হয়েছে তাঁরা যদি নিখোঁজ ব্যক্তির নাম, ঠিকানা ক্যাম্প ইনচার্জকে জানাতেন তাহলে তাদের চিহ্নিত করা সহজ হতো। কিন্তু অনেকেই ভয়ে আসছেন না,” বলেন তিনি।

মানবপাচার থেমে নেই

সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতিকালে বৃহস্পতিবার টেকনাফের সাবরাংয়ের উপকূল থেকে তিন পাচারকারীসহ ১৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ, যার মধ্যে ১০ জনই রোহিঙ্গা নারী ও শিশু।

আটককৃতদের মধ্যে ইউনুচ ওরফে ইউনুচ মাঝি (৪০) মঙ্গলবারের ট্রলার ডুবির ঘটনায় দায়ের হওয়া মানবপাচার মামলার পলাতক আসামি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা ও টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির পরির্দশক মোহাম্মদ লিয়াকত আলী।
টেকনাফ মডেল থানায় ১৯ পাচারকারীকে অভিযুক্ত করে বুধবার সকালে মামলাটি দায়ের করে কোস্টগার্ড। এখন পর্যন্ত তাঁদের নয়জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে বেনারকে জানান লিয়াকত।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আগস্ট থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সাগর তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকে। তাই সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচার করার জন্য এ সময়টাকেই বেছে নেয় পাচারকারীরা।

মানবপাচারের বিরুদ্ধে মসজিদে প্রচারণা

কক্সবাজারের লেদা, জাদিমুরা ও শালবনসহ বিভিন্ন ক্যাম্পের মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজের আগে ও পরে মানবপাচার বিরোধী প্রচারণা চালিয়েছেন রোহিঙ্গা নেতারা।

লেদার রোহিঙ্গা নেতা আলম বলেন, “জুমার নামাজ শেষে মানবপাচার রোধে সবাইকে সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নামাজের আগে মসজিদের ইমামরাও এ ব্যাপারে কথা বলেছেন।”

 

সুত্র: বেনারনিউজ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন