রাত পোহালেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের শুরু

বিশেষ প্রতিনিধি, উখিয়া নিউজ ডটকম::
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আগামীকাল ১৫ নভেম্বর প্রত্যাবাসনের প্রথম দফা শুরু হচ্ছে। প্রথম ব্যাচে ৪৮৫ পরিবারের ২ হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা শিবির থেকে তাদের নিজেদের বসত-ভিটা মিয়ানমারে ফিরে যাবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য বাংলাদেশ-মিয়ানমার দুই দেশের মধ্যে গঠিত যৌথ কমিটির সবশেষ বৈঠকে আগামী ১৫ নভেম্বর প্রত্যাবাসনের প্রথম ব্যাচ শুরু করার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। প্রথম ব্যাচে ৪৮৫ পরিবারের ২ হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গা মিয়ানমার ফিরে যাবে। প্র্রথম ব্যাচের প্রত্যাবাসন শুরু হলে ধারাবাহিকভাবে বাকি রোহিঙ্গারাও ফিরে যাবে বলে প্রত্যাবাসন কমিশনার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

এর আগে ঢাকাকে নেপিডোর পক্ষ থেকে জানানো হয়, এরই মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মিয়ানমার ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গা নাগরিকদের বসবাসের জন্য ভারত সরকার ২৮৫টি বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছে। আর চীন সরকার ১ হাজার বাড়ির কাঠামো পাঠিয়েছে, যেগুলো সংযোগ করলেই পূর্ণ বাড়িতে রূপ নেবে।
অন্যদিকে, দুই দেশের সীমান্তের শূন্য রেখায় যেসব রোহিঙ্গা বসবাস করছেন তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কাজও দ্রুত শুরু হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রস (আইসিআরসি) শূন্য রেখায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারকে সঙ্গে নিয়ে এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। শূন্য রেখায় বসবাসকারীরা তাদের আগের বসত-ভিটায় সরাসরি ফেরত যাবে।
মিয়ানমার সরকার এবং সেনাবাহিনীর অত্যাচার সইতে না পেরে, জীবন বাচাতে বিগত ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঢল নামে। প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের একাধিক শিবিরে আশ্রয় নেয়। তারও আগে একই কারণে আরও প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের একাধিক শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।

বাংলাদশ ও মিয়ানমার উভয় দেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছে। সম্প্রতি দুই দেশের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়। ফলে আগামী ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের একটি দল মিয়ানমারে প্রবেশ করবে।
সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে টেকনাফের কেরুনতলী ও নাইক্ষৎছড়ি সীমান্তের ঘুমধুমের দুইটি ট্রানজিট ক্যাম্প প্রস্তুত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার এবং জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্য মো. আবুল কালাম।

ad

জানা যায়, প্রত্যাবাসনের অংশ হিসেবে প্রথম দফায় ২ হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফেরত পাঠানো হবে। এ জন্য রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে ৪৮৫টি পরিবারকে বাছাই করা হয়েছে। বাছাইকৃত পরিবারের সদস্যদের তালিকা মিয়ানমারের কাছে পাঠানো হয়েছে। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে তাদের শনাক্তকরণের কাজও শেষ। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা বাকি।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বলেন, ‘সরকার হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করতে পারে। আমরা সেভাবেই প্রস্ততি নিচ্ছি।’ প্রত্যাবাসনের বিষয়টিতে যেহেতু মিয়ানমার সম্পৃক্ত তাই সময় নির্দিষ্ট করার বিষয়টি উভয় দেশের সম্মতির উপর নির্ভর করবে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্থান নির্বাচন চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম অথবা টেকনাফ উপজেলার কেরুনতলী ট্রানজিট ক্যাম্প রয়েছে। প্রথম দফার প্রত্যাবাসনের কার্যক্রম শুরু করতে এ দুইটি ট্রানজিট ক্যাম্পের যেকোনো একটিকে বেছে নেয়া হতে পারে। তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের প্রথমে ট্রানজিট ক্যাম্পে নেয়া হবে। এরপর মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা তাদের স্বদেশে স্বাগত জানাবেন।
চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ সফরে আসেন মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন থোয়ে। ওই সময় তিনি কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে প্রেস ব্রিফিংকালে তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনের পর রোহিঙ্গাদের প্রথমে মংডু শহরে স্থাপিত আইডিপি ক্যাম্পে নেয়া হবে। সেখানে তারা পাঁচ মাস থাকবে। এরপর নিজেদের গ্রামে ফেরত যেতে পারবে। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মানবিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করারও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিন কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সাথে প্রত্যাবাসন বিষয়ে কথা হয়। রোহিঙ্গা মাঝি মোরশেদ আলম ও আলী আকবরসহ অধিকাংশ রোহিঙ্গা নেতারা জানিয়েছেন, আমরা চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছি। বিশ্ব নেতারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ মুসলিম দেশ। এখানকার মানুষজন অত্যান্ত ভালো। এর আগেও আমাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন হয়েছে। প্রত্যাবাসন হওয়ার পর কয়েক বছর যেতে না যেতেই ফের আমাদের উপর চলে চরম নির্যাতন। স্বদেশ প্রেম আমাদেরও আছে। প্রাণের মায়া বড় মায়া। আমরা কিন্তু প্রাণ বাঁচাতেই বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমাদের ভাগ্যে কী আছে তা একমাত্র আল্লাই ভালো জানেন।