যৌনাঙ্গে আঘাত মানেই নারীর সব শেষ!

শাহাজাদী বেগম।।

প্রতিদিন সকালে ফেবুতে ঢুকলেই অসংখ্য সুন্দর সুন্দর ছবি আর প্রভাতী শুভেচ্ছায় মেসেঞ্জার আর নিউজফিড ভরা থাকে। আজও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ভাবলাম কীভাবে সম্ভব?

ঘটনাটি প্রথম জেনেছি গত রাতে সাড়ে নয়টার দিকে, ইনবক্সে একটা অনলাইন নিউজ লিঙ্ক থেকে। এরপর গুটিকয়েক পোস্ট, ভিডিও লিঙ্ক। ভিডিওটি দেখার মত আমার হার্টের ক্ষমতা নাই। খবর পড়েই হার্টবিটের বেগ বেড়ে গেছে। তাড়াতাড়ি নেট বন্ধ করে ঘুমাতে গেলাম। আসলেই কি ঘুমালাম? সারারাত নির্যাতিতা নারীর কষ্টগুলো অনুভবে নিয়ে মেয়ে দুটিকে বুকে জড়িয়ে অস্থির নির্ঘুম রাত পার করার পর সকালে যখন একই প্রভাতী শুভেচ্ছার বন্যা দেখি, ভাবি সত্যিই বুঝি সব শুভ হয়ে গেছে। নইলে কেমন করে শিক্ষিত, বিবেকবান মানুষেরা আজকের সকালেও হাসি মুখে “শুভ সকাল” পোস্ট দিতে পারে? পারে, বেশিরভাগ মানুষই পারে জন্য এখনো এইসব ঘটে। আবার অনেক পোস্ট দেখলাম ঘটনাটির চুলচেরা বিশ্লেষন, প্রতিবাদ ও প্রতিকার চেয়ে। এই মুখগুলো পরিচিত, নিজেদের পা রক্তাক্ত করে গায়ে অসংখ্য গালি মেখে এই মানুষগুলোকেই সব সময় প্রতিবাদ করতে দেখি।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের নির্যাতিতা নারীর প্রসঙ্গে বলছিলাম। এই নারকীয় ঘটনায় অনেকগুলো বিষয় আছে

স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গনধর্ষণ বা চেষ্টা
নারীটিকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন
সেই নির্যাতনের ভিডিও ধারন
সেই ভিডিও ফেইসবুকে ভাইরাল করা
পরিবারটিকে ৩২ দিন অব্রুদ্ধ করে রাখা
প্রশাসন জানতে না পারা/ জানতে না দেওয়া
ভিকটিম নিরুদ্দেশ
এর যেকোন একটা বিষয় যদি আমলে নেওয়া হয় বা ঘটে তাহলেই সেটি একটি কেইস হতে পারে। কিন্তু এতগুলো বিষয় এবং ৩২ দিন কিছুই হল না এটাই ভাবনার বিষয়। এতগুলো ঘটনা ঘটার প্রেক্ষিত কী ছিল, বিভিন্ন নিউজ লিঙ্ক থেকে যা জেনেছি সেগুলোই বিশ্লেষন করার চেষ্টা করছি।

স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করায় নারীটি বাবার বাড়িতে থাকত। সম্প্রতি তার স্বামী মাঝে মাঝে স্ত্রীর কাছে আসতো এবং থাকতো। বিষয়টি নির্যাতনকারী ছেলেগুলোর কাছে অনৈতিক। সমাজই যেহেতু ঠিক করে দেয় একজন নারী কার সাথে যৌন সম্পর্ক করবে, সেহেতু এমন অনৈতিক কাজের জন্য নারীটিকে শায়েস্তা করা সমাজের সচেতন ও ক্ষমতাধর প্রতিনিধি ছেলেগুলোরই দায়িত্ব। যেহেতু নারী দুর্বল, তার উপর খবরদারি করার দায়িত্ব তো পুরুষেরই। ঠিক একইভাবে সমাজই ঠিক করে দেয় পুরুষ কাকে ধর্ষণ করবে। সেই একই সূত্র, সমাজের পুরুষরাই নারীদের ধর্ষণ করবে। কাজেই সমাজের চোখে এটি কোন অপরাধ নয়। একটি ধর্ষণের বিচার করতে গিয়ে ধর্ষকের বোনকে ধর্ষণ করেছে এমন অসংখ্য সামাজিক বিচারের উদাহরন আমাদের জানা। কারণ সমাজ মনে করে নারীর জন্ম হয় পুরুষের যৌনসম্ভোগে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য, সেটা “হুর” কিংবা “হোর” যে অবস্থাতেই হোক না কেন।

নির্যাতনকারীরা শুধু ধর্ষণ করেই চলে যেতে পারতো কিংবা চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে পারতো। কিন্তু সেটি তারা করেনি। তারা নারীটিকে বিবস্ত্র করেছে, তার যৌনাঙ্গে বীভৎসভাবে আঘাত করেছে, ভিডিও করেছে এবং ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছে। নারীটি যতবার কাকুতি মিনতি করেছে “ওরে আব্বারে- তোগো আল্লাহর দোহায় রে- আমারে ছাইড়া দে,” তাতে তারা আরো উত্তেজিত হয়েছে এবং অধিক মাত্রায় নির্যাতন করেছে। কাজেই পুরুষের চুড়ান্ত যৌন আনন্দের মাত্রা কোন পর্যন্ত সেই মনস্তত্ত্বটি বিশ্লেষনের প্রয়োজনীয়তা আছে।

একটি পরিবারের, একটি গোষ্ঠির কিংবা একটি সমাজের সকল মান সম্মান সুকৌশলে নারীর যৌনাঙ্গেই প্রোথিত করে দিয়েছে এই সমাজ। কাজেই কোনো নারীর যৌনাঙ্গে আঘাত মানে তার সব শেষ। আবার অন্যভাবে কাউকে কখনো অসন্মান করতে হলে সেই পরিবারের কোন নারীর যৌনাঙ্গে আঘাত কর, সেই পরিবার আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। বিষয়টি বহুমাত্রিক। নারীর ক্ষমতা নাই, নারী সিদ্ধান্ত নিতে বা দিতে পারবে না, নারী একা একা কিছু করতে পারে/পারবে না, নারী শুধুই পুরুষের নিচে শোবে। কিন্তু যেই নারীর যৌনাঙ্গে আঘাত হলো অমনি পুরো পরিবার বা সমাজের জাত গেল। কাজেই সকল সন্মান বা জাতের কেন্দ্রবিন্দু এক জায়গায়। নারীকে দাবিয়ে রাখার যত চেষ্টা তার সব কিছুই সামাজিক সিস্টেমে করা হয়েছে।

রাজনৈতিক পরিচয়ে অপরাধ করার সবচেয়ে করার বড় সুবিধা হল তাতে ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয় পাওয়া যায়, জবাবদিহীতার প্রয়োজন হয় না, বিচারের আওতায় পড়তে হয় না। আর এই ধরনের রাজনৈতিক পরিচিতির অপব্যবহারের সংস্কৃতি দিন দিন বাড়ছে বলে আপরাধীদের সাহস ও সংখ্যা বাড়ছে। নির্যাতনকারীরা একদিনে এতবড় অপরাধ করার সাহস পায়নি। অনুমান করা যায় যে এর আগে তারা আরো অনেক ধরনের অপরাধ করে পার পেয়ে গেছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতিও স্থায়ী হয়ে গেছে। ফলে পুরুষের লিঙ্গ কর্তন কিংবা ক্রসফায়ার স্থায়ী কোন সমাধান আনতে পারবে না।
সুত্র: ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন