‘মা হওয়াটাই ইউএনও হোসনে আরা বেগমের অপরাধ’

নিউজ ডেস্ক::
মা হতে চান পৃথিবীর সব নারীই। মা ডাকের সঙ্গে মিশে আছে নারীর প্রগাঢ় অনুভূতি, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও পরিস্ম্ফুটিত অস্তিত্ব। গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিস তাই বলেছেন, ‘সন্তান হচ্ছে মায়ের জীবনের নোঙর।’ আর এ মা হওয়াটাই নাকি অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে সদ্য ওএসডি হওয়া নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ইউএনও হোসনে আরা বেগমের।

ইউএনও হিসেবে যোগ দেওয়ার মাত্র ৯ মাসের মাথায় গত ৪ ফেব্রুয়ারি হোসনে আরাকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সন্তানসম্ভবা ছিলেন তিনি। খবরটা পাওয়ার পরই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। অক্সিজেন সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয় অনাগত সন্তানের। ভর্তি হন হাসপাতালে। দেরি না করে ডাক্তার করেন সিজার। জন্ম নেয় ইম্‌ম্যাচিউর এক শিশু। ঠাঁই হয় এনআইসিইউতে। এখন বাঁচা-মরার লড়াইয়ে ওই শিশুটি। অনিশ্চয়তায় ঘেরা তার জীবন। ভবিষ্যতের উৎকণ্ঠায় তার পুরো পরিবার!

অথচ কোনো হিসাব মিলাতে পারছেন না হোসনে আরা বেগম- কেন ওএসডি করা হলো তাকে? মর্মবেদনায় আবেগঘন একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি নিজের ফেসবুকে। বিষয়টি নিয়ে আলাপ হয় সমকালের সঙ্গেও। হোসেন আরা জানান, ওএসডি হওয়ার মতো অভিযোগ তার বিরুদ্ধে নেই। এমনকি তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্যও কোনো আবেদন করেননি। আর দু’মাস পর তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাবেন। তাহলে এখন কেন তাকে ওএসডি করা হলো?

কোনো উত্তর পাচ্ছেন না হোসনে আরা। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘তাহলে মা হওয়াটাই কি আমার অপরাধ! এ কারণেই ওএসডি হতে হলো আমাকে! আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে, এটি যেন কোনো নারীর সঙ্গে আর করা না হয় কোনোদিন।’

বিষয়টি জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহম্মদ বলেন, ‘ফেসবুক স্ট্যাটাসটি আমি দেখেছি। তবে সিদ্ধান্তটি সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তার স্বার্থে নেওয়া হয়েছে। এ জন্য তিনি উপকৃত হয়েছেন বলে মনে করি।’ সচিব বলেন, ‘সামনে উপজেলা নির্বাচন। এ নির্বাচনে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। সন্তানসম্ভবা হওয়ায় সেই দায়িত্ব পালন করা ওই কর্মকর্তার পক্ষে অনেক কঠিন হতো। আর তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি না দিলে অন্য কাউকে নিয়োগ করা যেত না। আবার এখন বদলি না করলে নির্বাচনকালে ইসির অনুমতি নেওয়া লাগত। এ ছাড়া তাকে মাতৃত্বকালীন ছয় মাস ছুটি দিতে হবে। এর পরও যদি তিনি মনে করেন তার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, তাহলে প্রতিকার চেয়ে আবেদন করতে পারতেন তিনি। ফেসবুকে যে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, আইনগতভাবে ওই কর্মকর্তা তা পারেন কি-না পর্যালোচনা করা হবে তা।’

এদিকে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর প্রশাসনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ ফোন করে খোঁজখবর নিচ্ছেন ওই কর্মকর্তার। জনপ্রশাসনের এ ধরনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন অনেকেই। বিষয়টি নিয়ে গতকাল একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, একজন কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হতেই পারে। তবে তার কারণ থাকতে হবে। যদি শারীরিক কারণে কোনো কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়, তাকে আগে থেকে অবহিত করা উচিত। আর যদি তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে, সেক্ষেত্রেও ওএসডি করার একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। এমতাবস্থায় ওই কর্মকর্তার সন্তানের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না। সুত্র : সমকাল

ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে নারায়ণগঞ্জ প্রশাসনেও তোলপাড় শুরু হয়েছে বলে নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শুধু মাতৃত্বজনিত কারণে ওই নারী কর্মকর্তাকে ওএসডি করায় উপজেলা প্রশাসনে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে গতকাল সরকারি বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তাদের ওই আদেশের তীব্র সমালোচনা করতে দেখা যায়।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া ওএসডি হওয়া হোসনে আরার স্ট্যাটাসটি হলো-‘আমি ব্যক্তিগত বিষয়গুলো সাধারণত ফেসবুকে খুব একটা শেয়ার করি না। তবে আজ মনে হলো, এখন চুপ করে থাকাটাই অন্যায়। তাই আজ আর না, আজ আমি বলবো…। আমি হোসনে আরা বেগম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, নারায়ণগঞ্জ সদর। মাত্র ৯ মাস পূর্বে আমি এ পদে যোগদান করি। আমার দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা-চিকিৎসার পরও আমরা কোনো সন্তান লাভ করতে পারিনি। কিন্তু পাঁচ মাস পূর্বে আমি জানতে পারি, আমি দু’মাসের সন্তানসম্ভবা। এ ঘটনা আমার জীবনে সৃষ্টিকর্তার অপার রহমত ছাড়া আর কিছুই নয়, এ বিশ্বাস আমি প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ করেছি। এ বিশ্বাস ও স্বপ্ন বুকে নিয়ে অনাগত সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছিলাম।

উলেল্গখ্য, আমি আমার বাবুকে পেটে নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আমি নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আংশিক নির্বাচন অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করি। একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে অজুহাত, ফাঁকিবাজি- এই বিষয়গুলোকে কখনই পুঁজি করিনি। যখন যে পদে কাজ করেছি, চেষ্টা করেছি শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে। সন্তানসম্ভবা হয়েও এর কোনো ব্যতিক্রম আমি করিনি। অথচ আমি সন্তানসম্ভবা হয়েছি শোনার পর থেকেই একজন বিশেষ কর্মকর্তা, যার নাম বলতেও আমার রুচি হচ্ছে না, বিভিন্ন মহলে আমাকে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে আমাকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে বদলির পাঁয়তারা করে চলছিল। আমার সন্তানসম্ভবা হওয়াটাকেই সে বিভিন্ন মহলে আমার সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অথচ এই সন্তান পেটে নিয়েই আমি অত্যন্ত সফলভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি ও আমার ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অ্যাপ্রিসিয়েশনও পেয়েছি। আমার সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল এপ্রিলের ২০ তারিখ। তেমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আমি ছিলাম। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রেগুলার চেকআপ করাতে আমি হাজব্যান্ডসহ স্কয়ার হাসপাতালে আসি। চেকআপ শেষে সন্ধ্যায় হাসপাতালে অপেক্ষা করছি পরবর্তী পরীক্ষার জন্য, এমন সময় আমার একজন ব্যাচমেট ফোন করে জানায়, আমার সদাশয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ওএসডি করেছে অর্থাৎ আমাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেছে। আমার অপরাধ হলো আমি সন্তানসম্ভবা, আর তার চেয়েও বড় কারণ হলো- সেই তথাকথিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তার উপরের মহল কর্তৃক তদবির। খবরটা শোনার পর আমি প্রচণ্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে পারিনি, উল্লেখ্য আমি অ্যাজমার রোগী। প্রচণ্ড মানসিক চাপে আমার ফুসফুসে ব্লাড সার্কুলেশন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, ফলে আমার পেটের সন্তানের অক্সিজেন সাপল্গাই বন্ধ হয়ে যায় এবং হঠাৎ করেই আমার পেটের বাবু নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। তাৎক্ষণিক হসপিটালে ভর্তি করা হলে ডক্টর সেদিন রাতেই সিজার করে বাবুকে বের করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পরে আমার পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে আমার মাত্র ৩১ সপ্তাহ বয়সী প্রিম্যাচিউর বেবিকে সিজার করে বের করে ফেলা হয়। এখন সে স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিইউতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে। আমার এই নিষ্পাপ সন্তানটার কী অপরাধ ছিল? নাকি মা হতে চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল? আমি জানি না। তবে জানি, একজন সব দেখেন, তিনি আমার নিষ্পাপ মাসুম সন্তানের উপর এই জুলুমের বিচার করবেন। এই নিষ্ঠুর অমানবিকতার পৃথিবীতে কোনো কর্তাব্যক্তির কাছে আমি এ অন্যায়ের বিচার চাই না। শুধু আমার সৃষ্টিকর্তাকে বলব, তুমি এর বিচার করো। আর যারা আমাকে একটুও ভালোবাসেন, আমার নিষ্পাপ সন্তানটার জন্য দোয়া করবেন। ও সুস্থ হয়ে গেলে কোনো কষ্টের কথাই আমার মনে থাকবে না।’

ad