মা-বাবা হারিয়ে কাঁটাতারে আটকা পড়ল দুই শিশু

উখিয়া নিউজ ডেস্ক::

কাঁটাতার পেরিয়ে বড়রা বাংলাদেশ প্রবেশ করতে পারলেও দুই বোন আটকা পড়ে। প্রায় তিন ঘণ্টা কাঁটাতারে আটকে থাকা এই দুই শিশুকে উদ্ধার করেন মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এক যুবক -বাংলানিউজ

সোমবার বেলা ১১ টার দিকের ঘটনা। মিয়ানমারের তুমব্র লাউয়ে পাড়ায় সেনাবাহিনী জ্বালিয়ে দেয় রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি। রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে করে গুলিও চালাতে থাকে বেপরোয়াভাবে। এতে মারা পড়েন কেউ কেউ। তখন রোহিঙ্গারা দিকবিদিক ছুটতে থাকেন বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে।
কিন্তু কাঁটাতার পেরিয়ে বড়রা বাংলাদেশ প্রবেশ করতে পারলেও অনেক শিশু আটকা পড়ে।তাদেরেই দুজন রোকেয়া( ৭) ও দিলারা (৪)। সম্পর্কে তারা আপন বোন।
প্রায় তিন ঘণ্টা কাঁটাতারে আটকে থাকা এই দুই শিশুকে উদ্ধার করেন মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা দেলোয়ার হাসান নামের এক যুবক।
উদ্ধারকারি রোহিঙ্গা যুবক দেলোয়ার হাসান বাংলানিউজকে বলেন, ‘সোমবার বেলা ১১ টার দিকে মিয়ানমারের তুমব্র লাউয়ে পাড়ায় মিলিটার ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে মিলিটারিরা বেপরোয়া গুলি চালালে আমাদের অনেকেই মারা যায়। তখন আমরা দিকবিদিক ছুটোছুটি করে বাংলাদেশ সীমান্তের ঘুমধুমের দিকে চলে আসি।কাঁটাতার পার হয়ে বড়রা আসতে পারলেও অনেক শিশু আটকা পড়ে। আবার অনেক শিশু কাঁটাতার পার হতে গিয়ে আহত হয়। এদের মধ্যে অনেকেই মা বাবা হারিয়ে কাঁটাতারে এসে ভয় আর আতঙ্কে বসে থাকে।’
দেলোয়ার হোসেন আরও বলেন, উদ্ধার হওয়া শিশু দুই জন তাদের মা বাবাকে হারিয়ে ফেলে সীমান্তের কাছাকাছি এসে। তখন এই দুই শিশু ভয় আর আতঙ্কে কাঁটাতারে লুকিয়ে থাকে। প্রায় ৩ ঘন্টা তারা এভাবে লুকিয়ে থাকে। আমি পালিয়ে আসার সময় তাদের দেখতে পাই। পরে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
‘কাঁটাতারের কাছে কেউ থাকলে মিয়ানমারের সীমান্ত বাহিনী তাদের গুলি করে । তাই শিশু দুইজনের জীবন ঝুঁকি ছিল।’-বলেন দেলোয়ার।
উদ্ধার হওয়া দুই শিশুর বাবা শওকত আলী ও মা মিনুয়ারা বেগম। তারা দুজন হাল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
শিশু রোকেয়া বাংলানিউজকে জানান, তাদের ঘরে যখন আগুন ধরিয়ে দিলে তাদের মা-বাবা তাদের নিয়ে পালিয়ে আসে। এসময় মিলিটারি গুলি করলে সবাই এদিক ওদিক ছুটতে থাকি। এসময় মা-বাবা আমাদের কাছ থেকে পৃথক হয়ে যান। পরে তারা দুইবোন অন্যদের সাথে সীমান্তে চলে আসে। এসময় অন্যরা তাদের ফেলে চলে গেলে দুইবোন কাঁটাতারের ভেতর লুকিয়ে থাকে।
পরে রোহিঙ্গা যুবক দেলোয়ার হাসান তাদের নিয়ে বাংলাদেশের ঘুমধুম সীমান্তে আশ্রয় নেয়। তবে তাদের মা-বাবা কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন কিনা তা জানা যায় নি।
বাপ-মা হারানো তিন বছরের শিশু রেদোয়ান!
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কাঁটাতার সংলগ্ন ঘুমধুম জিরো পয়েন্ট। দেখা গেল কাঁটাতারের ওপাশে পাহাড় পেরিয়ে কুণ্ডলি পাকানো ধোঁয়া উঠছে। ধোঁয়া লক্ষ্য করে এগুতে এগুতে পাহাড়ের ওপর তাঁবুর সামনে ১০ বছর বয়সী ছোট্ট মেয়ের কোলে একটা শিশু চোখে পড়লো। শিশুটি অনবরত কেঁদেই চলেছে। খবর বাংলানিউজ ।
মেয়েটিও শিশু। এরপরও কান্না থামানোর চেষ্টার কমতি নেই। জঙ্গলঘেরা তাঁবুর সামনে গিয়ে বাবা-মার খবর জানতে চাইলে মেয়েটি শিশুটিকে দেখিয়ে বলে, ঈদের দিন আর্মিরা ওর বাবা-মাকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। ওর পাশে কেউ নাই।
ঘুমধুম জিরো পয়েন্টে তখন প্রখর রোদ। গায়ে রোদ পড়ে রেদোয়ান নামে তিন বছর বয়সী শিশুর ফর্সা রঙ তখন চিকচিক করে উঠল যেন। এই নিষ্পাপ শিশুটির জীবনে ঈদের দিন সকালে মিয়ানমারের তুমব্রু সীমান্তবর্তী গ্রাম উত্তরপাড়া ডেকুবেনিয়ায় নেমে আসে এক ঘোর অন্ধকার।
যখন নতুন কাপড় পরে বাবার হাত ধরে ঈদে নামাজে যাওয়ার কথা ঠিক সেই সময় তার বাবাকে গুলি করে মিয়ানমারের খুনে সেনারা। মাকে ধর্ষণ করে পরে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। পরে প্রতিবেশীরা শিশুটি ও তার বাবা জোবায়েরকে আহত অবস্থায় নিয়ে পালিয়ে আসে। পথে অতিরিক্ত রক্তক্ষণের তার মৃত্যু হয়।
এখন সস্পর্কে দাদা-দাদি হয় এমন এক দম্পতির কাছে রয়েছে রেদোয়ান। গাছপালা কেটে উজাড় করা পাহাড়ের ওপর ঘুমধুম সীমান্তবর্তী অস্থায়ী ক্যাম্পে হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে রেদোয়ানও রয়েছে।
মৃত্যু সম্পর্কে জ্ঞান-বোধ এখনও হয়নি রেদোয়ানের। ‘বাবা-মা’ শব্দটি শুনলে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে সবার দিকে। থেকে থেকে কান্না করে ‘মা মা’ বলে এই অবুঝ শিশুটি। তখন তাকে থামানো অনেক কষ্টকর হয়ে পরে।
শিশুটির সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে এসে জড়ো হয় তাঁবু টাঙিয়ে থাকা অন্য রোহিঙ্গারাও। সম্পর্কে চাচা শরিয়তুল্লাহ নামে এক রোহিঙ্গা যুবক বলেন, ঈদের সকালে রেদোয়ানের বাবাকে গুলি করা হয়। মাকে ধর্ষণ-নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়। আর আত্মীয় স্বজন যারা ছিল তাদেরও কুপিয়ে মারা হয়।
‘আমরা তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে ঘুমধুম ক্যাম্পে আসি। রেদোয়ানের বাবাকে আহত অবস্থায় নিয়ে আসি। পথে মারা গেলে ক্যাম্পে কবর দেওয়া হয়। যে দাদা-দাদির কাছে রয়েছে তারা আপন নয়, শিশুটি এখন এতিম।’
কেফায়েতুল্লাহ নামে আরেক রোহিঙ্গা যুবক এগিয়ে এসে জানান, তার কাছে রেদোয়ানের বাবার গুলিতে আহত অবস্থার ভিডিও রয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, আহত অবস্থায় পড়ে থাকা জোবায়েরকে সবাই ধরাধরি করে নিয়ে আসছেন। পেটে গুলি লেগেছে, সেখান থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
ঘুমধুম জিরো পয়েন্টের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ে শিশু রেদোয়ানের পালয়িতা দাদাদাদি আশ্রয় গেড়েছেন। স্যানিটেশনের ব্যবস্থা না থাকায় ঘুমধুম অস্থায়ী ক্যাম্পে যত্রতত্র মলমূত্র পড়ে থাকতে দেখা গেল। কাদাপানি মাড়িয়ে ষাটোর্ধ্ব দুই নরনারীর কাছে পৌঁছার পর জানা গেল তাদের দুই ছেলেকেও মেরে ফেলা হয়েছে। আর দুই মেয়ে স্বামীসহ পালিয়ে এসেছে। তাদের খবর তারা জানেন না।
দাদা নুর বাশার বলেন, ‘আমাদেরও কেউ নাই। ছেলেদের মেরে ফেলেছে। মেয়েদের খুঁজে পাচ্ছি না। ওকে (রেদোয়ান) বুকে করে এনেছি। বাপ-মা হারা পোলাটা। আর একটু হলে ওকেও মারত। আমরা আর বাঁচবো কয়দিন। ওকে কে দেখবে জানি না।’