মাদকের ১০০ গডফাদারের সম্পদ অনুসন্ধানে দুদক

আবুল খায়ের::
ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক বিক্রেতা, ডিলারসহ মাদকের ১০০ গডফাদারের ব্যাংক একাউন্ট এবং অর্থ-বিত্তের খোঁজে মাঠে নামছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে খতিয়ে দেখা হবে তাদের নামে-বেনামে গড়া সম্পদের পরিমান। অন্যদিকে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফের ৬০ জন মাদক গডফাদারের তিনটি দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। মালয়েশিয়া, দুবাই ও সৌদি আরবকে তারা তাদের সেকেন্ড হোম হিসেবে ব্যবহার করেন। সেখানে তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গাড়ি-বাড়িসহ বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। অন্যদিকে মাদকের টাকা জঙ্গি তত্পরতার কাজেও ব্যবহার হচ্ছে। গোয়েন্দাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এমনসব চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের করা মাদক ব্যবসায়ীদের ১৪১ জনের একটি তালিকা জানুয়ারিতে দুদকে পাঠানো হলেও এতদিন তা হিমাগারে ছিল। তালিকার কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান শুরু হলে দুদকও নড়েচড়ে বসেছে। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকের গডফাদারদের ব্যাংক একাউন্ট জব্দ ও অবৈধ সম্পদের খোঁজে জোরেশোরে অনুসন্ধান শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন।
সূত্র জানায়, দুদকের দু’জন পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন ও কাজী শফিকুল আলমের নেতৃত্বে পৃথক দুটি উচ্চপর্যায়ের টিমকে তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি নিজস্ব গোয়েন্দাদের দিয়েও গোপনে তথ্য সংগ্রহ করছে বলে জানা গেছে। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় সহায়তা করে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর সত্যতা নিরূপণ করতে তাদের বিষয়েও তথ্য জোগাড় করবে দুদক। এদিকে সরকারদলীয় একাধিক এমপির বিরদ্ধে মাদক ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া ও মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে। অনুসন্ধানের বিষয়ে একজন কর্মকর্তা জানান, মাদক ব্যবসা করে যারা অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন, যাদের কারণে সমাজে সাধারণ মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দুদকের তফসিল অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে দুদকের কাছে আসা মাদক ব্যবসা সংক্রান্ত কিছু অভিযোগের বিষয়ে এরই মধ্যে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অনুসন্ধান চলছে খুলনার এক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে। দুদকের কাছে থাকা তথ্য বলছে, ওই সংসদ সদস্য মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। অবৈধ সম্পদের অভিযোগ এনে ১৬ এপ্রিল তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করে দুদক।
জানা গেছে, শিগগিরই কোটিপতি মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পদের হিসাব চেয়ে পর্যায়ক্রমে নোটিস করবে দুদক। দুদক সূত্র আরো জানায়, এ তালিকায় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় সহায়তা করে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দুদকের এ তালিকায় কক্সবাজার ও খুলনা এলাকার দুজন সংসদ সদস্যের নাম রয়েছে। এর বাইরেও দুদকের তালিকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কয়েকজন রাজনীতিবিদের নামসহ বড় বড় ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। এসব ব্যবসায়ী ভিন্ন ব্যবসার আড়ালে মাদক ব্যবসা করেন। দুদকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মাদক ব্যবসার অভিযোগ থাকা এ ধরনের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিককে এরইমধ্যে সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিস দিয়েছে দুদক। তারা যে সম্পদের বিবরণী জমা দিয়েছেন সেটা যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে তারা সম্পদের বৈধ উত্স দেখাতে পারেননি। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা দায়েরের জন্য শিগগিরই কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিয়ে অনুমোদন চাওয়া হবে। খবর ইত্তেফাকের।
দুদকের অনুসন্ধান সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে নিজ নামে, স্ত্রীর নামে, শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের নামে জমি-ফ্ল্যাট ক্রয় এবং ব্যাংকে কোটি টাকা গচ্ছিত রাখার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বারিধারার সহিদুজ্জামান ওরফে নাভিদ, মোহাম্মদপুরের এশতিয়াক, মিরপুরের নজরুলসহ (গত রবিবার রাতে পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে নিহত) ৩২ জনের অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেয়েছে কমিশন। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের শাহীন ওরফে বন্ধক শাহী, বজলুর রহমান, কক্সবাজারের শিলাবনিয়া পাড়ার হাজি সাইফুল করিম, টেকনাফ পৌরসভার মেয়র হাজি মোহাম্মদ ইসলাম, প্যানেল মেয়র মজিবর রহমান, ওই পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার রাকিব আহমেদ, টেকনাফের লামা বাজারের মিসেস উয়ালী, আলিয়াবাদের আব্দুস শুকুর, মিরবানিয়া পাড়ার হায়দার আলী, জালিয়া পাড়ার ফরিদ আহমেদ, টেকনাফের আমিন জিয়াউর রহমান, রাশেদ, সফিক, সাহেদুর রহমান, ফেনীর পেয়ার আহমেদ, ছালাহ উদ্দিন, জিয়াউর আলম, আমজাদ হোসেন, ইসমাইল হোসেন, লক্ষীপুরের আলী হোসেন, শাহ আলম মিন্টু, ফরিদপুরের বোয়ালমারীর মিজানুর রহমানসহ রাজশাহীর ২২ জন কোটিপতি শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেয়েছেন দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তারা। শিগগিরই তাদের কাছে কমিশন থেকে সম্পদ বিবরণী চাওয়া হবে।