উখিয়া - টেকনাফে চলছে দুদকের অনুসন্ধান

মাদকের গডফাদারদের অঢেল সম্পদ

উখিয়া নিউজ ডেস্ক;;
মাদকের গডফাদার ও তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে অঢেল সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তৈরি দেড় শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা ধরে অনুসন্ধান করছে দুদক।

এরই মধ্যে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পদের ফিরিস্তি দুদকের হাতে এসেছে। এই তালিকার বেশিরভাগই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। এমপি আবদুর রহমান বদির দুই ভাই ও টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যানসহ অন্তত ২৫ জনের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারির জন্য সুপারিশ করেছেন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা।

এমপি বদির ভাই ও টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যানসহ ২৫ জনের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারির সুপারিশ * টেকনাফে মাদক ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই জনপ্রতিনিধি * দুদক চাইলে বদির সম্পদের অনুসন্ধান করতে পারে

এদের সবার অঢেল সম্পদ আছে। এছাড়া আরও ২০ জনের অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তাদের অনুসন্ধান শেষ হলে সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারি করা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রের।

দুদকের এক পরিচালক যুগান্তরকে বলেন, বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারির বিষয়টি কমিশনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি জানান, দুদকের চট্টগ্রাম অফিস থেকে অনুসন্ধান চালিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার মাদক ব্যবসায়ীদের অঢেল সম্পদের তথ্য মিলেছে।

সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারির সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, আমাদের টিম খুব সতর্কতার সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পদের অনুসন্ধান করছে। যাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে তাদের বিষয়টি (প্রতিবেদন) কমিশনের সামনে উপস্থাপনের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

তিনি বলেন, মাদক আমাদের যুবসমাজ বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে গিলে খাচ্ছে। সরকার যেমন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, আমরাও মাদক ব্যবসায়ীদের ছাড়ছি না।

জানা গেছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকা ধরে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর সম্পদের খোঁজে অগ্রাধিকার দিয়ে অনুসন্ধান করছে দুদক। মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। মাদক ব্যবসায়ী ছাড়াও এর পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করে মাদকের আইনটি সংশোধন করছে সরকার। মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্সের বার্তাটি সব মহলেই পৌঁছে গেছে। দুদকও সেভাবে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পদের পেছনে ছুটছে। মাদকের কারবার করে সম্পদশালী হয়েছে- এমন কাউকে ছাড় দিতে নারাজ দুদক।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তৈরি ২৮১ মাদক ব্যবসায়ীর একটি তালিকা ২০১৭ সালের শুরুর দিকে দুদকে পাঠানো হয়। পরে ওই তালিকার ১৮ জনের বিরুদ্ধে তখনই অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

এতে দেখা গেছে, কিছু নিরীহ লোকও তালিকায় পড়েছে। পরে দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালককে একটি নির্ভুল তালিকা তৈরি করে দেয়ার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশনা পেয়ে ওই তালিকাটি সংশোধন ও পরিমার্জন করে ১৪১ জনের একটি তালিকা চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহে দুদকে পাঠায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।

এছাড়া পরে আরও ৭০ জনের একটি তালিকা পাঠানো হয় দুদকে। দুই দফায় তালিকার ২১১ জনের সম্পদের অনুসন্ধানে নামে দুদক। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, বান্দরবান ও কক্সবাজারেই রয়েছেন তালিকার ৭০ জন।

দুদকের চট্টগ্রাম-২ শাখার উপপরিচালক মাহবুব আলম, সহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবির ও উপসহকারী পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন টেকনাফের মাদক ব্যবসায়ীদের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান করছেন বলে জানা গেছে।

সূত্রমতে, দুদকের অনুসন্ধানে টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমেদের ৩ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে ২ কোটি টাকার সম্পদের কোনো বৈধ উৎস দেখাতে পারেননি তিনি। টেকনাফে রয়েছে তার তিনটি বাড়ি। বিশাল জমিজমা। অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে দুদকের কর্মকর্তারা জাফর আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন।

এছাড়া একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে জাফর আহমেদের দুই ছেলে শাহজাহান ও দিদার মিয়ার বিরুদ্ধে। শাহজাহান টেকনাফ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, জাফর আহমেদ ছাড়াও তার দুই ছেলের বিরুদ্ধে সম্পদের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অনুসন্ধান কর্মকর্তারা তাদের সম্পদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন।

জাফর আহমেদের বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ‘পিতা-পুত্র একত্রে রাজনীতি ও ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে তৎপর। জাফর চেয়ারম্যান বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয়।’

টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, প্রতিপক্ষরা ষড়যন্ত্র করে মাদক ব্যবসায়ীর তালিকায় আমার নাম ঢুকিয়েছে। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবেদন করে বলেছি তদন্ত করে দেখুন। যদি আমার সঙ্গে মাদকের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পান, তবে ব্যবস্থা নিন।

অবৈধ সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমার তেমন কিছুই নেই। একটি ভাড়ার ঘর আছে। এবি ব্যাংক থেকে ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এটা করেছি। আমার কোনো অবৈধ সম্পদ নেই। আমার দুই ছেলের অবৈধ সম্পদের বিষয়েও দুদক অনুসন্ধান করছে বলে জানতে পেরেছি। তারা বাবার হোটেলে খায়। কীভাবে অবৈধ সম্পদ করবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে পাওয়া তালিকায় কক্সবাজার-৪ আসনের এমপি আবদুর রহমান বদির বিষয়ে বলা হয়, ‘দেশের ইয়াবা আগ্রাসন বন্ধের জন্য তার ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট।’

তালিকায় বদি ছাড়ও তার পরিবারের বশে কয়েকজনের নাম উঠে আসে। এদের মধ্যে আছেন বদির সৎভাই মৌলভী মুজিবুর রহমান, আবদুস শুক্কুর, মো. সফিক, আবদুল আমিন ও মো. ফয়সাল, ফুফা হায়দার আলী। এ ছাড়াও তালিকায় বদির পিএস মং মং সেন ও ফরিদ আহমেদ, ভাগ্নে সাহেদুর রহমান নিপুসহ আরও বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠভাজনের নাম রয়েছে।মং মং সেন ঢাকায় একাধিকবার ইয়াবাসহ গ্রেফতারও হন।

এদের মধ্যে বদির ভাই মুজিবুর রহমান ও আ. শুক্কুরের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। অনুসন্ধানে শুক্কুরের ৮ কোটি টাকার এবং মজিবুর রহমানের ১ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। মুজিবুর রহমান ও শুক্কুর এরই মধ্যে দুদকের কাছে সম্পদের হিসাব দিয়েছেন বলেও জানা গেছে। তাদের সম্পদ বিবরণী এখন যাচাই চলছে।

তবে তালিকায় নাম থাকলেও সম্পদের মামলায় তথ্য গোপনের অভিযোগে তিন বছরের সাজা হওয়ায় বদির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অনুসন্ধান করছে না দুদক।

বদির বিরুদ্ধে ফের অনুসন্ধানে আইনগত বাধা আছে কি না- জানতে চাইলে দুদকের মহাপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন) মো. মঈদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমি তো মনে করি, অনুসন্ধানে কোনো বাধা নেই। দুদক যখন তার (বদি) বিরুদ্ধে মামলা করেছিল সে সময় যে অবৈধ সম্পদ পাওয়া যায় সেই তথ্য দিয়ে মামলা হয়েছে। এরপর যদি তার আয়বহির্ভূত সম্পদ বাড়ে তবে নতুন করে অনুসন্ধান করা যাবে বলে আমি মনে করি।

তিনি জানান, সম্পদের তথ্য গোপনের ধারায় তার তিন বছরের সাজা হয়েছিল। অবৈধ সম্পদের ২৭(১) ধারায় কোনো সাজা হয়নি। আমরা নিু আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকার আরেকটি নাম হাজী সাইফুল করিম। তার বাড়িও টেকনাফে। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে সাইফুল করিমের ১১ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য মিলেছে। সাইফুল করিম ছাড়াও তার ভাই রিয়া করিম ও ভগ্নিপতি সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান চলমান আছে।

দুদকের অনুসন্ধান রিপোর্টে দেখা গেছে, টেকনাফের মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্থানীয় হ্নীলা ইউনিয়নের মেম্বার নুরুল হুদার দৃশ্যমান সম্পদ পাওয়া গেছে সাড়ে ৩ কোটি টাকার। দুদকের অনুসন্ধানে তার আরেক ভাই নুরুল কবিরের সম্পদ পাওয়া গেছে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার। তার কোনো নির্দিষ্ট পেশা নেই। তালিকার আবদুল্লাহ নামে একজনের অবৈধ সম্পদ রয়েছে ১ কোটি টাকার। টেকনাফের সাদ্রাং ইউনিয়নের মেম্বার মাহমুদুর রহমানের নামে-বেনামে পাওয়া গেছে ২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ।

টেকনাফ পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মনিরুজ্জামানের ৩ কোটি টাকার সম্পদের মধ্যে ২ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের কোনো উৎস তিনি দুদকে দেখাতে পারেননি বলে জানা গেছে। তার এই সম্পদ আয়বহির্ভূত। তার আরেক ভাই জাফর আলমের বিরুদ্ধেও দুদকে অনুসন্ধান চলছে।

টেকনাফ পৌরসভার বাসিন্দা আবদুর রহিমের নামে-বেনামে ১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য মিলেছে। টেকনাফ পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নুরুল বশরের নামে-বেনামে পাওয়া গেছে ১ কোটি টাকার উৎসবহির্ভূত সম্পদ।

এ ছাড়া টেকনাফ পৌরসভার মহিলা কাউন্সিলর কুহিনুর বেগমের স্বামী শাহ আলমের নামে ৪০ লাখ, আলী আহমদ চেয়ারম্যানের ছেলে আবদুর রহমানের ৩০ লাখ, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার এনামুল হকের নামে ৩৫ লাখ, আরেক মেম্বার শামসুল আলমের নামে ৪০ লাখ, সাবেক মেম্বার বকতার আহমেদের নামে ৫০ লাখ, টেকনাফের নাজির পাড়ার এজাহার মিয়ার ছেলে নুরুল হক ভুট্টুর নামে ৬০ লাখ, নুরুল হোসাইনের নামে ৩০ লাখ, নাইট্যং পাড়ার মৃত আবদুল খালেকের ছেলে ইউনুসের নামে ৩০ লাখ, দক্ষিণ হ্নীলার ফকির চন্দ্র ধরের ছেলে নির্মল ধরের নামে ২০ লাখ ও টেকনাফের দক্ষিণ জালিয়াপাড়ার বোরহান উদ্দিনের নামে ২০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য এখন দুদকের হাতে।

সূত্র জানায়, দুদকের চারজন পরিচালকের তত্ত্বাবধানে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। ঢাকার মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দুদকের প্রধান কার্যালয় ও ঢাকার বিভাগীয় কার্যালয় থেকে একযোগে অনুসন্ধান চলছে।

এছাড়া ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগীয় কার্যালয় এবং জেলা কার্যালয়গুলো থেকে একযোগে অনুসন্ধান করছে দুদক। তবে অনুসন্ধান করতে গিয়ে তালিকায় কিছুটা গলদ দেখতে পাচ্ছে দুদক। রাজশাহীতে দুদক ২২ জনের একটি তালিকা ধরে কাজ করছে।

দুদকের রাজশাহী বিভাগের পরিচালক আবদুল আজিজ ভুইয়া যুগান্তরকে জানান, অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা দেখতে পাচ্ছেন অধিকাংশই মাদকের বহনকারী। তারা পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী নন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক তৌফিক উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আমরা বিভিন্ন সূত্র থকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা করেছি। এখানে বড় ধরনের ভুল থাকার কথা নয়। যাদের নামে মামলা আছে, যাদের নাম বেশ আলোচিত তাদের নামে তালিকা হয়েছে। আমি মনে করি তালিকার সবার ব্যাংক লেনদেন দেখা উচিত। হুট করে বললেই হবে না যে এরা মাদক ব্যবসায়ী নন। আমি অনুরোধ করব দুদক যেন তালিকাভুক্তদের আর্থিক বিষয় বিশেষ করে আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখে।

সুত্র’যুগান্তর