ব্যারিকেড….

তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি, ঘরে সাদাকালো টেলিভিশন। বিটিভিতে রাজ্জাক-শাবান, ফারুক-ববিতার বাংলা ফিল্ম চলতো। কখনো-সখনো ওমর সানি, সালমান-শাহ, নাইমদের মুভিও দিতো। কি-যে তুমুল আগ্রহভরে দেখতাম! আলিফ-লায়লা, ইত্যাদির কথা নাইবা বললাম আজ। মাঝে মাঝে ঘরের বড়রা টাকা জমিয়ে রঙিন টেলিভিশন আর ভিসিআর ভাড়া এনে সালমান, শহরুখ, আর আমিরখানের ফিল্মও চালাতো ঘরে। আহারে নি:খাদ বিনোদন! ধীরে ধীরে প্রেম শিখছিলাম। প্রেম পুরোপুরি বুঝেছিলাম শাহরুখ-কাজলের ‘কুচ-কুচ হোতা-হ্যায়’ মুভি দিয়েই সম্ভবত।

তো আমাদের পাশেই ভাড়া ঘরে টিএনটি’র দেলোয়ার সাহেব ভাড়া থাকতো। দেলোয়ার সাহেবের দুই কন্যা। একটা সুমি ও অন্যটি আমার বন্ধু চুমকি। সুমি আপু তখন মেট্রিক পরীক্ষার্থী। আমার আপুর বান্ধবি। চুমকির প্রতি ফিল্মে দেখা প্রেমের মতো আমার মনেও দরদ সৃষ্টি হয়ে গেলো অজান্তেই! বুঝতেই পারিনি দিলমে ‘কুচ কুচ হোনে চলা’ কিচলিয়ে!

টিভিতে তখন বিংগো চকলেটের বিজ্ঞাপন চলতো। বিংগো চকলেটের কদর আমাদের কাছে এন্ড্রয়েড ফোনের চেয়েও ঢের বেশি ছিলো বোধয়! তাই রোজ রোজ স্কুলে যাওয়ার জন্য যে কয়টাকা পণ পাইতাম, সব কটা টাকা নিয়ে বিংগো চকলেট এনে লুকিয়ে চুমকিকে খাওয়াতম! ইত্যাবসরে খেলার চলে তুমুল আবেগী প্রেম চলতে থাকলো আমাদের! বউ-জামায় খেলার চলে কত চুমু যে খেয়েছি চুমকিকে; ক্যালকুলেটরে সে হিসেব করা যাবেনা!

একদিন চুমকির মা আমাদের প্রেম আবিস্কার করে ফেললো ঐ-চুমো দেখেই! মাঝ-চুমুতেই আকস্মিক ‘ব্যারিকেড’ দিয়ে আমাদের থামিয়েছিলো আন্টি! সেই সময়-ই বুঝেছিলাম ‘ব্যারিকেড’ কত হৃদয়-বিদারক! তারপর আর কোনদিন চুমকির সাথে খেলা হয়নি আমার। ভয় আর লজ্জায় চুমকিদের বাসায়ও যায়নি আর! অথচ কবির সুমনের মতো হৃদয় হয়তো হাহাকার করে বলছিলো-
‘টোঠে টোঠ রেখে ব্যারিকেড করো প্রেমের পদ্মটাই।
বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি শুধু তোমাকে চাই!”
কিন্তু আর হয়নি, ভেস্তে গিয়েছিলো আমার অবুঝ মনের প্রথম সবুজ প্রেম! শুনেছি চুমকির মেয়েও এখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। আহারে ‘ব্যারিকেড!’

তারপর জীবনে কত ‘ব্যারিকেড’ দেখেছি চলতে চলতে। এই যে রোজ অফিসের কাজ সেরে বাসায় লাইটহাউজ টু কালুর দোকানে বাইক চালিয়ে যেতে যেতে দুই কিলোমিটারে ‘স্পিড-ব্রেকার’ নামক আটারোটি ‘ব্যারিকেড’ পার হতে হয়; তার জন্যে মনে মনে আটারো হাজার অভিশাপ দেই ‘ব্যারিকেড’ দাতাদের উদ্দেশ্যে! কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া লাখো পথচারিকে এভাবে তাদের খাম-খেয়ালে কষ্ট দেওয়ার অধিকার যদিও তাদের নেই, তবুও হেড়ামের জোরে চলছে তাদের অনধিকার চর্চা! চলুক, সমস্যা কি……

একটি দেশে যখন কোটি কোটি মানুষকে স্রেফ বন্দুকের নলে ‘ব্যারিকেড’ দিয়ে জিম্মি করে ক্ষমতা ভোগ করা যায়! তখন এই সামান্য ব্যারিকেড নিয়ে মাথা ঘামায় কে? ভোটারবিহিন ভোটে বন্দুকের নলে ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে বেগম জিয়া গণতন্ত্র ফেরাতে যখন ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসী’ করতে যাচ্ছিলো, বালুর ট্রাকের আদলে সেদিন বুলেট ভরা বন্দুকের নলে ‘ব্যারিকেড’ দিলো এই সরকার! সবাই ভোগ করেছে দারুণ যাতনা, মুখ ফুটে কেউ বলতে পারলোনা। ৫৭-দ্বারার মতো বুলেট বিহিন অস্ত্রও মজুদ তখন! আমার মতো আমপাব্লিকেরা কেবল অভিশাপ-ই দিলো অন্তর থেকে। সেই যে অভিশপ্ত রাজ্যে কোটি কোটি অভিশাপময় পাপের বোঝা নিয়ে পথ চলছে সোনার বাংলা, তার নির্মম প্রতীক শুণ্যে ঝুলে থাকা ‘ফেলানী’ হয়ে এবং মাঝে ‘তনু’ ও শেষে ধর্ষিত ‘বিউটির’ লাশ সাক্ষী….

‘ব্যারিকেড’ তবুও শেষ হলোনা, স্বাধীনতার ঘোষক রনাঙ্গনের যোদ্ধা, বীর-উত্তমের বীরাঙ্গনা বধু, সাবেক সেনা প্রধানের স্ত্রী, সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রী, সাবেক তিন-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী; ৭৩-বছরের বায়োবৃদ্ধ বেগম জিয়া’কে শেষ পর্যন্ত নির্জন কারাগারে ধুকে ধুকে মারছে তারা! এমনই ‘ব্যারিকেড’ চলছে এই জাতির কপালে! হৃদয়ের বিধানসভায় তাদের ‘ইচ্ছে-সংবিধানে’ জ্যামিতিক হারে অভিশাপ দিচ্ছে মানুষ, কিন্তু প্রবল ক্ষমতার কাছে দাড়াতে পারছেনা অসহায় জাতি!

কবি প্রকৃতির ধ্বংসযজ্ঞ দেখে লিখেছিলেন-
“যেদিন শেষ নদীটি শুকিয়ে যাবে, শেষ গাছটিও কাটা হবে, সেদিন মানুষ বুঝবে; কাগজের টাকা খাওয়া যায়না!”
এই সোনার দেশের অবস্থা দেখে আমারও মনে হয়- যেদিন শেষ দেশ প্রেমিকটি মারা যাবে, শেষ ফেলানী ঝুলে থাকবে, শেষ বিউটিরাও ধর্ষিত হয়ে লাশ পড়ে রবে, সেদিন এই সরকার বুঝবে, অমানুষ নিয়ে দেশে ক্ষমতা ভোগ করা যায়না!

লেখক::
আক্তার নুর
সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক
কক্সবাজার জেলা ছাত্রদল।


* প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব উখিয়া নিউজ- এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য উখিয়া নিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।